ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ০২ মিনিট

August 24th, 2017

Abu-Zafar-Shamsuddinবিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ভাষা সংগ্রামী আবু জাফর শামসুদ্দীন।তিনি ১৯১১ সালের ১২ মার্চ ঢাকা জেলার গাজীপুরের দক্ষিণবাগ গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা মোহাম্মদ আক্কাছ আলী ভুঁইয়া। পিতামহ নাদিরুজ্জামান ভুঁইয়া ছিলেন মওলানা কেরামত আলী জৌনপুরীর শিষ্য ও স্থানীয় প্রতিনিধি। তিনি উপন্যাস, ছোট গল্প ও মননশীল প্রবন্ধ লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত ১১৫৫ পৃষ্টার উপন্যাস পদ্মা মেঘনা যমুনা বাংলার সাহিত্যের একটি অনন্য গ্রন্থ। এছাড়াও তাঁর রচিত বেশ কিছু গ্রন্থ ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, জাপানি ভাষায় অনুদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

ছেলেবেলা  ও পড়াশোনা
নিজ গ্রামের প্রভাত পন্ডিতের পাঠশালায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯২৪ সালে তিনি জুনিয়র মাদ্রাসা ও ১৯২৯ সালে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা না দিয়েই পড়াশোনা ছেড়ে দেন।

জীবনসংগ্রাম

দৈনিক সোলতান পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু। পরে আজাদ, ইত্তেফাক, পূর্বদেশ ও  সংবাদ পত্রিকায় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। খুলনা, কলকাতা ও কটকে কিছুকাল সরকারি চাকরিও করেছেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমিতে সহকারী অনুবাদকের পদে নিযুক্ত ছিলেন। ‘অল্পদর্শী’ ছদ্মনামে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত তাঁর ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ শীর্ষক সাপ্তাহিক কলাম ছিল খুবই জনপ্রিয়। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত কাগমারীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট সোসাইটি, বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ আফ্রো-এশীয় লেখক ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। অনেক উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। তাঁর রচনায় গণমানুষের সংগ্রাম ও উদার মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়।

ভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন

প্রথম জীবনে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের (এম এন রায়) র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ গঠিত হলে তিনি প্রাদেশিক সাংগঠনিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে  ন্যাপ (১৯৫৭) গঠিত হলে তার প্রাদেশিক সাংগঠনিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ঐতিহাসিক  কাগমারি সম্মেলন প্রস্ত্ততি কমিটির কেন্দ্রীয় আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

প্রকাশনা
উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে আবু জাফরের সাহিত্যিক জীবন শুরু হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস পরিত্যক্ত স্বামী প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি গল্প এবং প্রবন্ধও রচনা করেন। তাঁর রচনায় গণমানুষের সংগ্রাম ও উদার মানবতাবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো-

  • উপন্যাস: ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান (১৯৬৩), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৭৪), সংকর সংকীর্তন (১৯৮০), দেয়াল (১৯৮৫);
  • গল্পগ্রন্থ: জীবন (১৯৪৮), রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা (১৯৭৮), ল্যাংড়ী (১৯৮৪);
  • প্রবন্ধ: চিন্তার বিবর্তন ও পূর্ব পাকিস্তানী সাহিত্য (১৯৬৪), Sociology of Bengal Politics (১৯৭৩), সোচ্চার উচ্চারণ (১৯৭৭), লোকায়ত সমাজ ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি (১৯৮৮) ইত্যাদি। এ ছাড়া তিনি বেশ কয়েকটি জীবনী, আত্মজীবনী, নাটক, ভ্রমণকাহিনী এবং স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। শিল্পীর সাধনা (১৯৬৭) ও পার্ল বাকের সেরা গল্প (১৯৬৮) তাঁর দুটি অনুবাদগ্রন্থ।

পুরস্কার
সমাজ ও সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবু জাফর বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), সমকাল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), একুশে পদক (১৯৮৩), শহীদ নূতনচন্দ্র সিংহ স্মৃতিপদক (১৯৮৬), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬) এবং মৃত্যুর পর ফিলিপস পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেন।

মৃত্যু 

১৯৮৮ সালের ২৪ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র
* আত্মস্মৃতি, আবু জাফর শামসুদ্দীন
* বাংলাপিডিয়া

 

Comments

comments