ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ | ০২ : ১৭ মিনিট

August 2nd, 2017

Untitled-1নাম: আব্দুল মজিদ
জন্ম তারিখ : ৮ ডিসেম্বর ১৯৪৮
বাবার নাম: পিয়ার আলী সরকার
মা: নামিজান খাতুন
স্ত্রী: মমিনা খাতুন
গ্রাম: সুখ্যাতি
ডাকঘর: তোড়েয়া
থানা: আটোয়ারী
জেলা: সেই সময়ের বৃহত্তম দিনাজপুর জেলার অন্তগর্ত পঞ্চগড়।
সন্তান: দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।
পেশা: কৃষক
গেজেট নম্বার: ৬৮৭
সেক্টর: ৬ নং

…………………………………………

১৯৬৫ সাল। তখন আমার বয়স ১৭ বছর। কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। পরিবারের বাধা সত্ত্বেও যুদ্ধে অংশ নিই। তারপর দেখলাম, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ভালো চোখে দেখছে না। প্রতিদিন নানা রকমের অত্যাচার-জুলুম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের পর প্রস্তুত হয়ে যাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য।
‘দেশটাকে স্বাধীন করতে হবে। চুপ করে বসে থাকলে চলবে না।’ এই প্রত্যয় নিয়ে চাচাতো ভাই আনোয়ার, জহিরুলসহ গ্রামের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতের আসামে যাই। তখন আমি চাকরি করতাম কৃষি ব্যাংকে আর্মস গার্ড হিসেবে। সেখানে দেখা হয় মেজর শেরখী ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ারের সঙ্গে। আমরা সবাইকে ট্রাকে করে ৭ দিন পর শিলংয়ে পৌঁছাই। সেখানে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার পর শুরু হয় যাচাই-বাছাই। এই যাচাই-বাছাই করে দার্জিলিংয়ের মুজিব ক্যাম্পে অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধের মাঠে অবতীর্ণ হই। প্রথম আক্রমণ করি আটোয়ারী থানায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়। এরপর পঞ্চগড়ের বেশ কয়েকটি জায়গায় আক্রমণে অংশ নিই। এগুলোর মধ্যে ডাঙ্গী ক্যাম্প, মির্জাপুর, জগদ্দল, আমতলা, মীরগড়, হাঁড়িভাসা উল্লেখযোগ্য। সেই মুহূর্তগুলো যেন এখন দৃশ্যপটে ভেসে বেড়াচ্ছে।
আটোয়ারি থানাতে আক্রমণ চালাব। তখন সন্ধ্যা সাতটা কিংবা সাড়ে সাতটা। আমরা ৩০-৪০ জন মিলে একটা মিটিং করার জন্য বসলাম। মিটিং চলাকালীন সময়ে একজন বলল, ঐ জায়গায় পাকিস্তানি সেনারা এসেছে। তারা ওখানে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এটা শুনে আমরাও পজিশন নিয়ে নিলাম। চারপাশটা অন্ধকারে ছেঁয়ে গেল। রাত আনুমানিক আটটা। শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। ঐ ক্যাম্পে আমাদের কমান্ডার আনোয়ার হোসেনের নির্দেশনায় প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধের রেশ ছাপড়া ঝাড় হয়ে মির্জাপুর পর্যন্ত চলতে থাকে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ১৬ জন মানুষ নিহত হন। সেখানে আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচে যাই।

বর্ষাকাল। পার্শিরীহাটের কাছে ছিল অসংখ্য ধানখেত, ঝাড়-জঙ্গল। তবে একটা বড় জঙ্গল ছিল সেখানে। আমরা প্রায় ২৫ জন জঙ্গলের পাশে পজিশন নিই। ধানখেতের মধ্যে ১০ জন। পিছনের রাস্তার ধারে ৪ জন ও রাস্তার উপরে তিনজন। কমান্ডার নিদেশ দেওয়া মাত্র আমরা গুলি ছাড়া শুরু করি। কম সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য থাকার কারণে আমাদের সুবিধা হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা অপ্রস্তুত ছিল। আমরা যে পজিশন নিয়ে আছি তারা তা বুঝতে পারেনি। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ে আমরা বুঝে-দেখে-শুনে সুযোগ মতো পাকিস্তানিদের গুলি ছাড়তে শুরু করি। এতে একজন নিহত হয়। আর বাকিরা আহত অবস্থায় পালিয়ে যায়। আমরা সেইদিন অনেক আনন্দ করি এবং সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়-পরিকল্পনা মাফিক, ধীরে ধীরে কৌশলে পাকিস্তানিদের আক্রমণ করব। তাহলে আমরা সফল হব।
আর একটা আক্রমণের কথা বলতে হয়। সুখ্যাতি মসজিদের কথা। মসজিদের পাশে একটা বড় গাছের বাগান ছিল। আমরা দশজন গাছের উপর চড়ে পরিস্থিতি দেখছি। মসজিদের পাশে কয়েকজন পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছে। আমরা দেখলাম যে তাদের উপর আক্রমণ করা যেতে পারে। ঠিক পজিশন নিয়ে গাছের উপর থেকে তাদের উপর আক্রমণ শুরুকরি। এতে যেক’জন সেনা ছিল সবাই নিহত হন।
কৃষকেরা জমিতে ধানের চারা রোপণ করছেন। শরীরে কাদা-মাটি মেখে। এমন সময় আমিসহ ১২ মুক্তিযোদ্ধা যাই জমির মালিকের কাছে। বলি, আমরা কাজ করতে চাই। ব্যাগের ভেতরে রাইফেল, মেশিনগান লুকিয়ে রাখি। জমির মালিক আমাদের স্বচ্ছন্দে কাজ করতে দেন। তারপর জমির মালিক চলে যান আমাদের জন্য খাবার আনতে। আগে থেকে আমরা জানতাম যে এদিক দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা আসবে। কাজের একসময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫-৩০ জন সেনা ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের কাজ দেখে কিছুক্ষণ অবস্থান নেয়। চলে যাওয়ার সময় সবাই প্রস্তুত হয়ে যাই। জমির খেতটা ছিল রাস্তার পাশে, নিচুতে। পাকিস্তানিরা কিছুটা পথ সামনে দিকে গেলে আমরা ‘জয় বাংলা’ বলে একসঙ্গে ব্রাশফায়ার করতে শুরু করি। পাকিস্তানি সেনারা সবাই নিহত হয়। এই দৃশ্য জমির মালিক দূর থেকে দেখার পর ভয়ে পালিয়ে যান। সেই জয় বাংলা ধ্বনি আজও আমার কণ্ঠে বেসে বেড়ায়। যেন আমি এখনও সেই চিত্কার শুনতে পাই।

অনুলিখন : আবু সাঈদ

মুক্ত আসর এর ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা ২০১৭ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। 

Comments

comments