ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ১০ : ৪৩ মিনিট

18156863_1753016651382428_2248791336429267043_nখালাতো বোন জুঁইকে ভালোবাসতেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। জুঁইও তাঁকে ভালোবাসতেন। তাঁরা বিয়ে করবেন—নানা জটিলতা বিশেষত, সেনাচাকরির কারণে আফতাবুল কাদের সময় ও সুযোগ করে উঠতে পারছিলেন না। চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। কর্মরত ছিলেন পাকিস্তানের (তখন পশ্চিম পাকিস্তান) হায়দরাবাদে, ফিল্ড রেজিমেন্টে। অবশেষে তাঁর সেই সুযোগ হলো ১৯৭১ সালে। সে সময় ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন। ২০ মার্চ চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রি বিয়ে হয় তাঁদের। কয়েক দিন পর আনুষ্ঠানিক জীবন শুরু করবেন তাঁরা, এমন সময় দেশে নেমে এল চরম দুর্যোগ—২৫ মার্চের কালরাত। সেদিন তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। ফরিদাবাদে ছিল তাঁর মা-বাবার বাসা।

একদিকে নতুন বিবাহিত জীবনের হাতছানি, অন্যদিকে দেশমাতৃকা। দেশের সন্ধিক্ষণে আফতাবুল কাদের বেছে নিলেন দেশমাতৃকাকেই। ২৮ মার্চ ফরিদাবাদের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সেখানে অবরুদ্ধ থাকার সময় চট্টগ্রাম বেতারের ২৭ মার্চের ঘোষণা তিনি শুনেছিলেন। বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি যান চট্টগ্রামে। রামগড়ে তাঁর দেখা হয় জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) সঙ্গে। তিনি তাঁকে মহালছড়ি এলাকায় অবস্থানরত প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিতে বলেন। এরপর তিনি সেখানে যান।

২৭ এপ্রিল সকাল থেকে মহালছড়ির চারদিকে থমথমে অবস্থা। প্রতিরোধযোদ্ধারা খবর পেয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একটি কোম্পানি তাঁদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রতিরোধযোদ্ধাদের একটি দলের নেতৃত্বে আছেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল সেনা তাঁর অধীনে। সকাল নয়টার দিকে ঝোড়োগতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল তাঁদের অবস্থানে আক্রমণ শুরু করে। এই আক্রমণ এত শক্তিশালী যে তাঁরা তা কল্পনাও করেননি। দেখা গেল, পাকিস্তানিদের সঙ্গে বিদ্রোহী মিজোরাও আছে। ১৯৭১ সালে মিজোরা পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করে। তারাও সংখ্যায় কয়েক শ। এদিকে এক কোম্পানি পাকিস্তানি কমান্ডো আগেই ছদ্মবেশে মিজোদের সঙ্গে মিশে ছিল। এসব প্রতিরোধযোদ্ধাদের ধারণার বাইরে ছিল।

দুই কোম্পানি পাকিস্তানি কমান্ডো ও শত শত প্রশিক্ষিত বিদ্রোহী মিজো প্রতিরোধযোদ্ধাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। প্রতিরোধযোদ্ধারা অসীম সাহসের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ও মিজোদের মোকাবিলা করতে থাকেন। প্রায় তিন ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর তাঁদের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে আসে। এ অবস্থায় তাঁরা বেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। তখন তাঁরা কৌশলগত কারণে পাকিস্তানি ও মিজোদের বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সবচেয়ে কার্যকর মেশিনগান অবস্থান থেকে কভারিং ফায়ার দেওয়া হচ্ছিল, যাতে তাঁরা নিরাপদে পশ্চাদপসরণ করতে পারেন। হঠাৎ সেই মেশিনগান অকেজো হয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা তখন তাঁদের দেড়-দুই শ মিটারের মধ্যে চলে এসেছে।

নতুন এই বিপর্যয়ে ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের এককভাবে সাহসী ও অনন্য ভূমিকা পালন করেন। নিজের জীবনের মায়া উপেক্ষা করে তিনি গোলাগুলির মধ্যেই দৌড়ে উঁচু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটা এলএমজি নিয়ে অবস্থান নেন। তিনি এলএমজি দিয়ে একনাগাড়ে কভারিং গুলি করতে থাকেন। তাঁর এই দুঃসাহসিক ভূমিকা ও এলএমজির কার্যকর ফায়ারের কারণে প্রতিরোধযোদ্ধাদের বেশির ভাগই নিরাপদে পশ্চাদপসরণে সক্ষম হন। এমন সময় তিন-চারটি গুলি এসে লাগে আফতাবুল কাদেরের বুকে। গুলি তাঁর হূৎপিণ্ড ভেদ করে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। এর পরও তিনি বেঁচে ছিলেন। মুমূর্ষু অবস্থাতেও গুলি করার চেষ্টা করেন। অস্ত্র থেকে হাত সরাননি।

তাঁর কাছেই ছিলেন শওকত (ছাত্র) ও ফারুক নামের দুজন স্বেচ্ছাসেবী। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আফতাবুল কাদেরকে উঁচু স্থান থেকে নামিয়ে গোলাগুলির মধ্যেই একটি জিপে করে রওনা হন ফিল্ড হাসপাতালে। কিন্তু পথে তিনি মারা যান। সেদিন আফতাবুল কাদেরের সাহসিকতা বীরত্বের জন্য প্রায় ৫০০ প্রতিরোধযোদ্ধা ও স্বেচ্ছাসেবী বেঁচে যান। পরে তাঁকে সমাহিত করা হয় রামগড় শহরেই। মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই প্রথম শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষত মহালছড়ির যুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ আফতাবুল কাদেরকে মরণোত্তর বীর উত্তম খেতাব প্রদান করা হয়েছে। শহীদ আফতাবুল কাদেরের পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভোলাকোট ইউনিয়নের পিউরি গ্রামে। তাঁর ডাকনাম ইকবাল। তাঁরা আট ভাই। বোন নেই। তিনি ভাইদের মধ্যে পঞ্চম। তাঁর বাবার নাম আবদুল কাদের, মা রওশন আরা বেগম।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ১, মোজাম্মেল হক ও প্রথম আলো

Comments

comments