ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৭ : ৪৮ মিনিট

hqdefaultবিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি কবে-কখন-কোথায় রচনা করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না । তবে, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় কলকাতায় এ গানটি প্রথম গাওয়া হয় । এ ব্যাপারে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা একমত ।
দখলদার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গভর্ণর লর্ড কার্জন শাসন ব্যবস্থার সুবিধার্থে বাংলা থেকে বিহার এবং উড়িষ্যাকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল । বাঙালীর প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ইংরেজ সরকার বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে । কিন্তু ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করা হয় । পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে, পশ্চিম বাংলা ভারতের সাথে যুক্ত করা হয় । কবিগুরুর সৌভাগ্য, যে তাঁকে এই বঙ্গভঙ্গ দেখে যেতে হয়নি ।
‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বরাবর বাঙালীর কাছে রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গান হিসাবে প্রচলিত ছিল । ১৯৭০ সালে জহির রায়হান তাঁর চিত্রকাহিনী ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে গানটি সংযোজন পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে । কারণ, তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে প্রবল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলছিল । এ গানটি তাঁদেরকে দেশমাতৃকা এবং নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে । তাঁরা অনুপ্রাণিত হয় ।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ আসন লাভ করার ৩ মাস পরও যখন পাকিস্তানি সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করছিল তখন তাদের হীন উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ছাত্র-জনতা ‘স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে । ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল সমাবেশে স্বাধীনতা ইশতেহারে এই গানটি তখন স্বাধীন বাংলার ‘জাতীয় সঙ্গীত’ হিসাবে ঘোষিত হয় । জানা যায় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারও বহু আগে থেকে এ গানটির অনুরক্ত ছিলেন ।
আমিও ৭০ সালে গানটি শিখে অসংখ্যবার মঞ্চ-অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেছি । কিন্তু গানের সঞ্চারিতে এসে আমার চোখ ভিজে যেতো, ” মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,/মরি হায়, হায় রে—/মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ॥” কেন দেশমাতৃকার বদন মলিন হবে ? কারা মলিন করবে ? আমাদের জানা ছিল। 
 ১৯৭১ সালে আসামের লোহারবনে ট্রেনিং সেন্টারে আমাদের কোম্পানীর দুই তিনজন শুদ্ধস্বরে ও সুরে পুরো গানটি গাইতে পারতাম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফলোইনে আমাদেরকে গানটি গাইতে হতো। 
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পাওয়ায় গানটি এখনও গাই, গাইতে হয়। এখনও সঞ্চারীতে এসে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।
স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর গানের সঞ্চারীর এই কথাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, দেশমাতৃকার বদন এখন সত্যিই মলিন। মৌলবাদের উত্তরোত্তর উথ্থানে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি হুমকীর মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব অতিমাত্রায় মুসলমানরা বাঙালির ঘরে জন্ম নিয়ে, বাংলা ভাষায় কথা বলা শিখে, বাংলার আলো-বাতাস-জলে বেড়ে উঠে এখন নিজস্ব সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে আরবীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে । তারা নিজেকে বাঙালির বদলে মুসলমান হিসাবে পরিচিত পেতে চায়। তারা ৩০ লক্ষ বাঙালির জীবন এবং ২ লক্ষ মা-বোন কি কারণে সম্ভ্রম হারিয়েছে তা শুনতে বা জানতে চায় না। তারা শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায়। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করতে চায়। জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকার পরিবর্তন চায়। বাংলাবর্ষের পরিবর্তে হিজরী সনের প্রচলন চায়। সকল শিক্ষা ব্যবস্থা ইসলামীকরণ চায়। নারী-শিক্ষা বন্ধ করে তাদেরকে গৃহান্তরালে পাঠাতে চায়। শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ সহ সকল ভাস্কর্যের ধ্বংস চায়। সর্ব ধর্মের সহঅবস্থানের বিলুপ্তি চায়। হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধদের দেশ থেকে উচ্ছেদ চায়। অত:পর, অনতিবিলম্বে তারা দেশের নামটিও পরিবর্তন করতে চাইবে।
ওরা সশস্র । আমরা মুক্তিযোদ্ধা হয়েও নিরস্ত্র।
ওরা বেহেস্তের লাভ-লোভ দেখিয়ে সমাজের অর্ধেক মানুষের কাছে গ্রহণীয়। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, শৌর্য-বীর্য তাদের কাছে বর্জনীয়।
আমাদের দেশমাতৃকার বদন এখন সত্যিই মলিন। আমরা কি করে নীরব দর্শকের ভূমিকায় হাসি-ঠাট্টা করছি ?
বাংলার যুব ও তরুণ সমাজ। নয়নের জল মুছে জেগে উঠো। তোমার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন।

Comments

comments