ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৬ : ৫২ মিনিট

1
আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে নবগঠিত সংগঠন ‘ক্রান্তি : সেন্টার ফর বাংলাদেশ ডায়ালগ, ইউএসএ’ বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ শুরু করছে । বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ‘২৫শে মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস’ অনুমোদিত হওয়ার পরপরই ‘ক্রান্তি’ অভিবাসি প্রজন্মদের সেই সময়ে ভয়াবহ দুঃসহ ঘটনাটি জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় ।
3
গত ২৫ মার্চ ২০১৭, শনিবার ‘ক্রান্তি : সেন্টার ফর বাংলাদেশ ডায়ালগ, ইউএসএ’  লস এঞ্জেলেসের একটি রেস্তোরাঁয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে পালিত করে জাতীয় গণহত্যা দিবস । অনুষ্ঠানটি সহযোগিতা করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এতে নেতৃত্ব দেন ক্রান্তি’র যুগ্ম-নির্বাহী পরিচালক জনাব শওকত চৌধুরী ।
4
অনুষ্ঠানে ঢাকার খ্যাতনামা প্রকাশনী সংস্থা ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশত বই প্রদর্শিত হয়। সেখানে  মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৫০টি স্থিরচিত্র অনুষ্ঠানস্থলের ভেতরে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। ক্রান্তি’র নির্বাহী পরিচালক শিলা মোস্তফার সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ৭টায় আবৃত্তিকার মাহিদুল ইসলামের কণ্ঠে ধারণকৃত কবি শামসুর রাহমানের ‘অভিশাপ দিচ্ছি’ কবিতাটি বাজিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয় ।
শিশুশিল্পী ফারিয়ান আলম জামী ভায়োলিনে বাংলাদেশের ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বাজায় ।  ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয় ।
মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য চিত্রের সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ক্রান্তি’র পরিচালক আল-আমিন বাবু এবং রিয়া আনহার ।
5
স্বাগত বক্তব্যে ক্রান্তি’র সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছিল তা এখানকার বাঙালী প্রজন্মদের অনেকে জানে না । বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস’ অনুমোদিত হওয়ায় আমরা প্রথমবারের মতো লস এঞ্জেলেসে শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনুষ্ঠানটি করছি । এখানকার শিশুরা বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে না । কিন্তু তাদেরকে বোঝাতে হবে, তাদের পূর্বপুরুষদের আবাসস্থল বাংলাদেশে । সেটি তাদের শিকড় । তাকে অস্বীকার করা যায় না । আমেরিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো তাদের হৃদয়ে ধারণ করা উচিত । ক্রান্তি সে লক্ষ্যে কাজ করে যাবে । উপস্থিত অভিভাবকদের তিনি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানান ।
6
যুদ্ধকালীন গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন লুনা রহমান এবং শেলী আলম । স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন  আমিনুল হক, আহমেদ বশীর, ক্রান্তি’র পরিচালক শামীম রেজা এবং ক্রান্তি’র গণসংযোগ পরিচালক জনাব হানিফ সিদ্দিকী।

ক্রান্তি আয়োজিত গণহত্যা দিবস পালনের এই অনুষ্ঠানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ফাউন্ডার ট্রাস্টি জনাব মফিদুল হকের প্রেরিত ‘Recognition of Bangladesh Genocide’ লেখাটি পড়ে শোনায়, তরুণ প্রজন্মের জিসান মাহমুদ ও তাঞ্জিনা হক ।

7
লস এঞ্জেলেসের অভিবাসী লেখক কাজী রহমানের একাত্তরের ভীতিকর অভিজ্ঞতা ‘সেই কিশোর চোখে পঁচিশে মার্চ’ পড়ে শোনান, ক্রান্তি’র সাহিত্য-বিষয়ক পরিচালক জনাব হাসিনা বানু ।

ক্রান্তি’র সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জাহেদুল মাহমুদ জামি এবং ক্রান্তি’র সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা পাকিস্তানি-বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন ।

বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় লিখিত বই ‘১৯৭১ : ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’, ‘1971 : Dreadful Experience’ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে আহরিত অংশ তরুণ প্রজন্মদের মধ্যে যারা পাঠ করে শোনায় : তাহশিয়ান খান, তারিনা খান, তাপসি নিলা, ফাতিমা দিনা, তাবরিজ খান, তন্বী নন্দী, সুধা নন্দী এবং আলভী আহমেদ ।
বিশেষ অতিথির  ড. কাজী নাসির উদ্দীন বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তির পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে গণহত্যার কথা তুলে ধরেন । তিনি বলেন, গণহত্যা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে নিরুপণ করা হয় না । বিশ্বে ১৭টি গণহত্যার কথা উল্লেখ করেন।  তিনি আরও বলেন, গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে পাঁচটি দেশে ভয়াবহ গণহত্যা সংঘঠিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে ।
2

অনুষ্ঠানের মূল বক্তা হিসেবে ছিলেন নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক-সাংবাদিক-নাট্যকার, ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র প্রকাশনা সম্পাদক এবং ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থের সম্পৃক্ত সদস্য  আহমেদ মূসা । তিনি বলেন, একাত্তরে এত অল্প সময়ে এত মানুষ গণহত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল । একাত্তরের ২৫শে মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালীর উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাপুরুষচিত গণহত্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘটিত অন্য যে কোনো গণহত্যার চেয়ে ভয়াবহ ছিল। সে রাতে হানাদার বাহিনী ১০ হাজার বাঙালীকে হত্যা করেছিল । হিটলারের হাতে ৬০ লাখ ইহুদি গণহত্যার শিকার হয়েছিল ৫ বছরে । আর আমাদের দেশে ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে । ১৯৮০-৮১ সালে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যার ভয়াবহতা দেশে-বিদেশে তুলে ধরা ও রাজাকার-আলবদরদের বিচারের দীর্ঘদিনের দাবী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়ের মতো অটল থেকে পূরণ করেছেন । এ কারণে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পর লস এঞ্জেলেসে কনস্যুলেট জেনারেল অব বাংলাদেশ এর কনসাল জেনারেল প্রিয়তোষ সাহা বলেন, আমি তখন ছোট । আমরা নেত্রকোনায় ছিলাম । আমরা দেখেছি, কি বিভৎস নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীরা । আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না, ‘৭১ এর শেষ দিকে পাকিস্তানের পরাজয়ের আগ মুহূর্তে জাতিসংঘে রাশিয়া আমাদের পক্ষে ভেটো প্রয়োগ এবং পোলান্ডের সমর্থনের পর পাকিস্তানের প্রতিনিধি জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিল, পূর্ব পাকিস্তান চলে যায় যাক, পাকিস্তান হেরে যায় যাক কিন্তু আমরা হাজার বছর ধরে বাঙালীকে শায়েস্তা করে যাবো । আজ বাংলাদেশে যে জঙ্গী উথ্থান হয়েছে তার মদদদাতা কে তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না ।

ধন্যবাদ জ্ঞাপনে ক্রান্তি’র সাংগঠানিক পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে সব বাবা-মায়েদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি । তবে ভবিষ্যতে আমাদের অনুষ্ঠানে শতাধিক শিশু-কিশোর উপস্থিত থাকবে ।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে, বিদ্যাপ্রকাশের সৌজন্যে অংশগ্রহণকারী এবং উপস্থিত শিশু-কিশোরদের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা সম্বলিত টি-শার্ট বিতরণ করেন,  কনসাল জেনারেলের সহধর্মিনী জনাব স্নিদ্ধা সাহা ।

রাত ১১টায় নৈশ ভোজের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।

Comments

comments