ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৯ : ০০ মিনিট

IMG_2822১৯৭১ সালের শেষ দিক। রাতে গোপন শিবির থেকে বেরিয়ে পড়ি একদল মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে। তাঁরা বেশি ভাগেই ছিল স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। জলপথে নৌকায় করে পৌঁছাই লক্ষ্যস্থলে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পুবাইল-আড়িখোলা রেলস্টেশনের মাঝামাঝি এক স্থানে। সেখানে আছে ছোট একটি রেলসেতু। রেলপথের দুই পাশের বেশির ভাগ স্থান জলমগ্ন। সেতুর দক্ষিণে একটি বটগাছ ও বিরাট পাটখেত। বেশ দূরে একটি গ্রাম। রেলপথের আশপাশ জনমানবহীন। দু-তিন ঘণ্টা পরপর ট্রেন চলাচলের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের জন্য উপযুক্ত স্থান। একটু আগে গেছে একটি রেলগাড়ি। দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে আর রেলগাড়ি আসার সম্ভাবনা নেই। পরিকল্পনা অনুসারে দ্রুত শুরু করি অপারেশনস্থলে। বাকিরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিলেন কাট অব পার্টি হিসেবে। বিস্ফোরকের প্রশিক্ষণ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধারা রেল স্লিপারের নিচের পাথর সরিয়ে বসালেন নিয়ন্ত্রিত মাইন। এক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হলো তাঁদের কাজ। মাইনের সঙ্গে তার লাগিয়ে তা টেনে নিলেন কাছাকাছি নিরাপদ স্থান পর্যন্ত। মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিলেন সেখানে। এবার রেলগাড়ির জন্য অপেক্ষার পালা। এদিকে রাত শেষে ভোর হয়। কিন্তু ট্রেনের আর দেখা নেই। আমরা সবাই চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কারণ যত বেলা হবে, তাঁদের সেখানে অবস্থান করা বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। এমন সময় ট্রেনের হুইসেলের শব্দ। তখন আনুমানিক সকাল ছয়টা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রেলগাড়ি দৃষ্টিগোচর হলাম।  ইঞ্জিনের সামনে বালুভর্তি ওয়াগন। বালুভর্তি ওয়াগন চিহ্নিত স্থান অতিক্রম করা মাত্র বিস্ফোরক দল মাইনের বিস্ফোরণ ঘটালেন। বিকট শব্দে গোটা এলাকা প্রকম্পিত। কালো ধোঁয়া ও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডু ওপরের দিকে উঠতে থাকল। ইঞ্জিন ও পেছনের কয়েকটি বগি মাইনের বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। ইঞ্জিন ও দুটি বগি সম্পূর্ণ ধ্বংস। সেগুলো রেলপথ থেকে ছিটকে নিচে পড়ে। ইঞ্জিনের পরের বগিতে ছিল পাকিস্তানি সেনা। তারা বেশির ভাগ হতাহত। অপারেশন শেষ করে আমরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যাই।

এমন বীরত্বকথাগুলো বলছিলেন বীর প্রতীক একেএম জয়নুল আবেদীন খান ।

IMG_2792মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংগঠন মুক্ত আসর ‘শুনি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব কথা’ শিরোনামে সারাদেশে বছরব্যাপী স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি পালনের করছে। এর অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার বেলা ১টায় রাজধানীর বংশাল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনান মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক একেএম জয়নুল আবেদীন খান ।

জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় এই অনুষ্ঠান। একাত্তরের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। স্কুলের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক একেএম জয়নুল আবেদীন খানকে  ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। বংশাল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হাজী মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, ইতিহাস চর্চা না করা হয় তাহলে সেই ইতিহাস একদিন হারিয়ে যাবে।’

IMG_20170328_135549স্কুলের প্রধাণ শিক্ষক সেতার বেগম বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তাম। সেই সময়ের স্মৃতিগুলো আজ মনে পড়ে। তখন এমন অনেকদিন গেছে ঠিক মতো খেতে পারিনি। এখন এই মুক্তিযোদ্ধাদের আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে একদিন তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের আর পাবো না। তাই আমাদের তাদের কথাগুলো শুনতে হবে।’

এ ছাড়া বক্তব্য দেন মুক্ত আসরের সভাপতি আবু সাঈদ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুক্ত আসরের সদস্য প্রতীক চাকমা, শাহিন মাহফুজ, মাহেরা বিন রফিক ও স্কুলের শিক্ষকেরা।

‘শুনি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব কথা’র পর শিশু-কিশোরদের প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। এই পর্বের পর আয়োজন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের ওপর কুইজের। কুইজে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন’ ৭১ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বই পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়।

1.1স্কুলের শিক্ষার্থীদের সমবেত কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ গানটি পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্ত আসরের যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক আয়শা জাহান নূপুর।

উল্লেখ্য, এবছরের শুনি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব কথা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় রাজধানী হাজারীবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুরের গঙ্গাচড়া উচ্চবিদ্যালয়ে। আগামী মাসে চট্টগ্রাম ও ঢাকার দু্টি স্কুলে অনুষ্ঠিত হবে।

 

Comments

comments