ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ০৩ : ০১ মিনিট

March 24th, 2017

Ahamed-Rafek-01
বাঙালি মুসলমানের আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায় প্রধানত দুই চরিত্রের মতাদর্শিক পথ ধরে। আদর্শিক বিচারে এর প্রকাশ স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনানির্ভর সাম্প্রদায়িক তত্পরতায়। নেপথ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রবল ইচ্ছা। এই টানের প্রবলতায় বঙ্গদেশে সাধারণ নির্বাচনে (১৯৪৬) মুসলিম লীগের ভোটবাক্স উপচে পড়ে। তুলনায় মিশ্র ফলাফল কার্যত পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে কোথাও লীগবিরোধীদের জয়।

পাকিস্তান অর্জিত হলো—বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নের পাকিস্তান। কিন্তু শুরুতেই তাদের বাড়াভাতে ছাই পড়তে শুরু করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকশ্রেণির কল্যাণে বৈষম্যমূলক আচরণের সূচনা রাষ্ট্রভাষাকে কেন্দ্র করে। বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা তাদের বিচারে বিজাতীয় ও ব্রাত্য চরিত্রের। উর্দু-বাংলা দ্বন্দ্বে এ সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রকাশ, যা ক্রমে অর্থনৈতিক অঙ্গনে সর্বাধিক গুরুত্ব অর্জন করে।

তাই পাকিস্তানে  বাঙালির সংস্কৃতিচর্চার সূচনা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী ধারায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি হয়ে পরবর্তী সময়ের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে। নেপথ্যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের  লক্ষ্য। পূর্ববঙ্গে সংস্কৃতি ও রাজনীতি পরস্পর নির্ভরতায় পথ চলেছে। এবং অগ্রজদের তত্পরতায় তা বিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকেই, কখনো সফলতায়, কখনো ব্যর্থতায়। প্রসঙ্গত, স্মরণ করা যেতে পারে তিরিশে প্রগতি লেখক সংঘ এবং চল্লিশে গণনাট্য সংঘের তত্পরতার কথা। শেষোক্ত দশকটি ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় মেধাবীদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জনমুক্তির আদর্শ বাস্তবায়নে শ্রমনিষ্ঠার ফসল—কবিতায়, গানে, নাটকে, কথাসাহিত্যে, এমনকি মঞ্চনাট্য ও লোকসংস্কৃতির পরিশীলিত রূপায়ণে। কিন্তু স্বতন্ত্রবাদী-সম্প্রদায়বাদী রাজনীতির প্রবল টানে সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার সুফল-সম্ভাবনা ভেসে যায়। গণসংগীত মাঠে-ময়দানে জনচিত্তে ততটা প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। তেভাগার গান, লোকগীতি ও গণসংগীত সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে পিছু হটে, যেমন বিদেশি শাসনের অন্তিমকালে, তেমনি স্বদেশি শাসনের সময়েও।

গণতন্ত্রের নামে দমননীতির শাসন দ্বিখণ্ডিত বঙ্গের উভয় ভূখণ্ডেই গণতন্ত্র-প্রগতিবাদী সংস্কৃতিচর্চাকে চাপে রাখে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ফ্যাসিস্ট শাসন বেশি চণ্ডনীতি গ্রহণ করায় প্রগতিবাদী রাজনীতিতে ধস নামে। এর প্রভাব পড়ে সংস্কৃতিচর্চায়, অংশত পাকিস্তানি স্বপ্নের মুগ্ধতায় শিক্ষিত শ্রেণির বৃহত্তর অংশে বিরাজ করে প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের প্রভাব। ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য।

এমন এক বৈপরীত্যের মধ্যেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন—ভাষার মতো এক সর্বজনীন স্বার্থের বিষয় হওয়ায় সংস্কৃতিচর্চার অবাঞ্ছিত ধারায় অনুকূল স্রোতের জোয়ারি প্রকাশ ঘটায় এবং তা সচেতন ছাত্রসমাজের বিচ্ছিন্ন চেষ্টায়, যা সংস্কৃতি ও রাজনীতি ক্ষেত্রে ইতিবাচক চরিত্রের প্রকাশ ঘটায়। সে প্রকাশ যেমন গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী, তেমনি প্রগতিবাদী। ‘বিচ্ছিন্ন’ কথাটির অর্থ হলো এ ক্ষেত্রে সংগঠনগত ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছিল খুবই সীমিত ধরনের।

কিন্তু একুশের আন্দোলন পূর্ব বাংলায় যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সূচনা ঘটায়, তার ইতিবাচক ফলাফল হলো উভয় ক্ষেত্রেই, বিশেষ করে সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক বিকাশ ঘটায়। প্রগতিবাদী সংস্কৃতির প্রকাশ ছিল অনেকটা চল্লিশের জনসংস্কৃতির ধারায়। অন্তত তেমন চেষ্টা তো ছিল। তাই পঞ্চাশের দশকে যেমন রাজধানী শহর ঢাকায়, তেমনি শহর ও গ্রাম-গঞ্জের বিশেষ বিশেষ কেন্দ্রে প্রগতিশীল গণসংস্কৃতিচর্চার বিকাশ ঘটে, ঘটে বিস্তারও। ক্ষেত্র বিশেষে সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখের গণসংগীত ও গণনাট্য সংঘের সংস্কৃতিচর্চার পুনর্বাসন ও প্রভাব লক্ষ করা গেছে। একুশে পরবর্তী সংস্কৃতি সম্মেলনগুলো তেমন বাস্তবতাই তুলে ধরে।

প্রগতিবাদী সংস্কৃতিচর্চার প্রভাবে সমাজে সুস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও কিছুটা বিকাশ ঘটে। দু-একটি সাদামাটা ছোট্ট উদাহরণ একুশে-উত্তর পঞ্চাশের সামাজিক পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করবে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলনে লায়লা সামাদের উচ্চকণ্ঠের আহ্বান—‘ঘোমটা ছেড়ে বেরিয়ে এসো নারী’ (অর্থাৎ যোগ দাও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে) বিপুল করতালিতে অভিনন্দিত হয়।

আর কার্জন হলের অনুষ্ঠান শেষে রাত ১০টার দিকে দর্শক-শ্রোতা তরুণী ও মধ্যবয়সী গৃহিণীদের কার্জন হল থেকে আজিমপুর কলোনিতে নির্বিবাদে হাস্য-কলরবে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। সমাজে সংস্কৃতির এমন প্রভাবের বিকাশ শুরু হয়েছিল। নতুন সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্ভবও দেখা গেছে সে সময়।

রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সহায়ক শক্তি হিসেবে সুষ্ঠু সংস্কৃতিচর্চার সাংগঠনিক বিকাশ শুরু হয় উল্লিখিত দুই ধারায়। জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের পথ ধরে সংস্কৃতিচর্চার বলিষ্ঠ প্রকাশ পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকে। সামরিক শাসন ও স্বৈরশাসন ওই আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে তরুণদের ছিল অগ্রচারীর ভূমিকা।

সে ভূমিকা যেমন জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী অপসংস্কৃতির বলিষ্ঠ বিরোধিতার। বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা সংস্কৃতি ও রাজনীতি ক্ষেত্রে সমান শক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। ক্বচিৎ ঘটনা বিশেষের প্রভাবে সে বিরোধিতার উগ্র প্রকাশ ঘটতে দেখা গেছে। তবে তা রক্তক্ষয়ী চরিত্রের ছিল না। বরং তা সংগ্রামী চেতনা বিকাশের সহায়ক হয়েছে।

সে বিকাশ দুই সমান্তরাল ধারায় হলেও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ছিল প্রগতিশীলতার প্রাধান্য, ক্রমশ বিকাশমান গণসংস্কৃতি তথা গণসংগীতচর্চার প্রাধান্য। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে ‘উদীচী’, ‘ক্রান্তি’ ইত্যাদি গণসংস্কৃতি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশ এবং জনপ্রিয়তা তেমন প্রমাণ তুলে ধরে। সেই সঙ্গে গুটিকয়েক সংস্কৃতি পরিষদের সক্রিয় উপস্থিতি।

এ ক্ষেত্রে হাতে গোনা কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা ও দৈনিকের সাপ্তাহিক সাহিত্য ক্রোড়পত্র সংস্কৃতিচর্চার দুই ধারাকে উল্লিখিত চরিত্রে বিকশিত হতে সাহায্য করেছে। ভাষিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি গণসংস্কৃতিচর্চার বিকাশ যেমন ভূখণ্ড স্বার্থের লক্ষ্যে, তেমনি জনস্বার্থবিষয়ক মুক্তির লক্ষ্যে। দুই ধারাতেই সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ এক লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার কারণে প্রথমোক্ত ধারার রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ প্রধান হয়ে ওঠে।

এ পর্যায়ে রাজনীতি শক্তির বিচারে সংস্কৃতি থেকে কয়েক পা এগিয়ে এবং তা সংগত কারণে। দুই পাকিস্তান তত্ত্ব এবং দুই পাকিস্তানের বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ জাতীয় রাজনীতিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। উনসত্তরের প্রগতিবাদী সংস্কৃতির বিস্ফোরণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়েছে। এটা ইতিহাসের নির্মম পরিহাস যে প্রগতি-সংস্কৃতির শক্তিমান প্রকাশ স্বাধীনতাবাদী চেতনার ব্যাপক শক্তি বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। যে চেতনা সংহত হয়েছে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায়ের লড়াইয়ে। সে লড়াইয়ের রক্তাক্ত পরিণাম স্বাধীন বাংলাদেশ। লড়াইটা সর্বজনীন চরিত্রের হলেও এর ফল সর্বজনের ভোগে লাগেনি।

দুই.

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম কয়েক বছরের সংস্কৃতিচর্চা পূর্বোক্ত ভাষিক জাতীয়তাবাদী আবেগের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। তখন ভাষিক জাত্যাভিমানের পালে সাময়িক জোয়ারি হাওয়ার শক্তি যুক্ত হয়েছিল এবং তা সংস্কৃতিচর্চাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতিচর্চার বৃহৎ অংশ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রভাববলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। শাসকশ্রেণির মতে, পেশাজীবী শ্রেণিরও দ্রুত স্বার্থপর বিকাশ। সংস্কৃতিচর্চা এভাবে বিভাজিত হয়ে পড়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত ও বিযুক্ত হয়ে। প্রথমোক্তের সংখ্যা ও শক্তি দুই-ই বেশি। অন্যদিকে প্রগতিবাদী শক্তির কথিত মতাদর্শিক বিভাজন এবং বিভাজন তাদের শক্তিহীন হতে সাহায্য করে। পিছিয়ে পড়ে তাদের সংস্কৃতিচর্চার উদ্যম ও শক্তি। সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব ও আন্তর্জাতিক প্রভাব এ ক্ষেত্রে ছায়া ফেলে। এটা যদিও ষাটের দশকে শুরু, তবুও এর প্রবলতা স্বাধীন বাংলায় অনেক বেশি মাত্রায় দৃশ্যমান। সর্বোপরি প্রগতি সংস্কৃতির রাজনৈতিক সংগঠন-শক্তি পর্যাপ্ত মাত্রায় বিকশিত হতে না পারার কারণে শিক্ষিত শ্রেণির শক্তিমান বড়সড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলাই সঠিক বিবেচনা করেছে এবং করছে। এতে স্বার্থবুদ্ধি ও প্রাপ্তিযোগের সায়ও রয়েছে। স্বাধীন বাংলায় সংস্কৃতিচর্চার বেশির ভাগই তাই সুবিধাবাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত। সে পরিস্থিতির কারণে স্বাধীন চিন্তার, যুক্তিবাদী চিন্তার ও মুক্ত মননের মেধাবীর সংখ্যা কমে আসছে। সেখানে রয়েছে নানা কারণের প্রভাব।

প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় সুবিধাভোগী হতে মেধার সামান্যই প্রয়োজন পড়ে। দরকার শুধু নির্বিচার আনুগত্যের। এর একটি অশুভ দিক হচ্ছে সমাজে মেধা ও মেধাবীর সংখ্যা হ্রাস, আর প্রতিযোগিতার অভাব তাতে জ্বালানি যোগ করে থাকে। রাজনৈতিক আনুগত্যে ভর করেই যদি জীবন ও জীবিকার আকাশ বাড়িয়ে তোলা যায়, তাহলে কী দরকার শ্রমনির্ভর মেধার উদ্ভাবনচর্চা ও তা অনুশীলনের? কী দরকার আদর্শনিষ্ঠ, শ্রমসাপেক্ষ সর্বজন স্বার্থের সংস্কৃতিচর্চার? কথাটি সত্য যে অতিমাত্রায় আনুষ্ঠানিকতার প্রভাব উদ্ভাবন শক্তিকে পিছে টানে।

স্বভাবতই শ্রমসাধ্য ও অনুশীলনিষ্ঠ মেধা ও মননের সার্বক্ষণিক চর্চা অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার পথ ছেড়ে কষ্টকর বিকল্প পথ ধরতে কার মন চায়? প্রয়োজনও বা কী? তাই প্রকৃত মেধাবীর সংখ্যা বাংলাদেশি সমাজে ক্রমেই কমে আসছে। তদুপরি সাম্রাজ্যবাদের ভোগবাদী আদর্শের প্রবল টানে মেধাবীদের বড় একটি অংশ সাগর পাড়ি দিচ্ছে। এখানেও লক্ষ্য একটাই। জীবন-জীবিকা মধ্যাহ্ন সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল করে তোলা। স্বদেশ-সংস্কৃতি তাদের আকর্ষণ করে না। এগুলো নিছক আবেগ ঝরানো শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কী সংখ্যক তরুণ ও যুবশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠেছে তার একটি জরিপ ও পরিসংখ্যান আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কেন আমাদের সংস্কৃতিচর্চায় ও সংস্কৃতি অঙ্গনে মেধাবী প্রতিভার অভাব? এটা মেধার সত্যিকার অভাব নয়, অভাব স্বদেশি সমাজের ক্ষেত্রে।

‘উজ্জ্বল সোনালি ক্যারিয়ার’ এমন একটি জাদুকরী বাক্যবন্ধ যে এর টানে মেধাবীদের হয় বিদেশযাত্রা, না হয় স্বদেশে এস্টাবলিশমেন্টের আরামদায়ক ছত্রচ্ছায়ায় নিরাপদ অবস্থানে থাকা। তাই মেধার অপচয়, মেধাবীর অভাব দুই-ই বাংলাদেশের সমাজজীবনে সত্য হয়ে উঠেছে। তাই কেউ যদি বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে মেধাবী প্রতিভার অভাব নিয়ে অভিযোগ তোলেন, আপেক্ষিক শূন্যতার কথা বলেন, তবে তাঁর বা তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের অবকাশ থাকে না।

এ অবস্থার কারণগুলো স্পষ্ট, দায়ও একই রকম স্পষ্ট। বিত্তবৈভবের স্বাদ, ক্ষমতার স্বাদ বড় আকর্ষণীয় শক্তি। সেখান থেকে দূরে থাকার শক্তি সহজলভ্য নয়। তাই মেহনতি মানুষের মুক্তির সাধনায় দীর্ঘ শ্রমসাধ্য সময় ব্যয় করেও কাউকে কাউকে জীবনের সোনালি আকর্ষণে ছিটকে পড়তে দেখা যাচ্ছে। সেখানে আদর্শগত চিন্তা বা আত্মগ্লানি কাজ করে না। উদাহরণ খুব একটা কম নয়।

এমন সব কারণে বাংলাদেশি সমাজে মেধাবী কম না হলেও আদর্শনিষ্ঠ এবং সৎ ও নীতিপরায়ণ মেধাবী প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা কমে আসছে। হ্রাস পাচ্ছে গতানুগতিক, অনুকূল স্রোতের ব্যতিক্রমী ধারার জনস্বার্থবাদী চিন্তকের সংখ্যা। স্বভাবত হ্রাস পাচ্ছে বা শক্তিহীন হচ্ছে অনুরূপ গুণের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনস্বার্থবান্ধব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অনুরূপ রাজনৈতিক শক্তির অভাবও এ সাংস্কৃতিক শূন্যতার অন্যতম কারণ। অভাব সংস্কৃতি-রাজনীতির পরস্পর নির্ভরতার।

পূর্বোক্ত সাংস্কৃতিক শূন্যতার আপেক্ষিক বিচারে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, কেউ কেউ করেও থাকেন, যুক্তিবাদী-প্রগতিবাদী সংস্কৃতিচর্চা মানেই কি এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধিতা? এ প্রশ্নের জবাব একটাই—সর্বজনীন স্বার্থের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থনির্ভর সুবিধাভোগী শ্রেণির অনুকূল শাসক শক্তির সুবিধাবাদবিরোধী শক্তির শাসন কায়েম না হওয়া পর্যন্ত সংস্কৃতি অঙ্গনের বুদ্ধিদীপ্ত, আদর্শনিষ্ঠ প্রতিবাদের কোনো বিকল্প নেই। মুক্তবুদ্ধির যুক্তিবাদী মানুষ সে ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করবেই এবং তা ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে।

বৃহত্তর জনশ্রেণির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে, তাদের শতভাগ মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার দাবি নিয়ে যে রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চা, তা যত কঠিনই হোক রাজনৈতিক বিচারেও তার বিকল্প নেই। এ চর্চার আরেক লক্ষ্য জনস্বার্থের রাজনীতিকে শক্তিমান হয়ে উঠতে সাহায্য করা। প্রকৃত জনসংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে এ লক্ষ্যে অগ্রগতি সম্ভব। শিক্ষার শতভাগ বিস্তারের ফলে সমাজে মেধাবীর সংখ্যাও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই একটি বিষয়ে প্রগতিবাদীদের কিছু বলতে শুনি না, এটা বিস্ময়কর। কারণ এটা তো ব্যক্তির অন্যতম প্রধান মৌলিক দাবি।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

Comments

comments