ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৮ : ৫০ মিনিট

আর্ন্তজাতিক নারী দিবস উপলক্ষে  কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসির শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হুমায়রা পরী  লিখেছেন নারী দিবস নিয়ে..
kobid_983304842531aafe296e501আজ আর্ন্তজাতিক নারী দিবস। এই দিবসকে ঘিরে অনেকেই ফেসবুক বা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অনেক ভালো ভালো লেখা লিখেছেন যা  দেখে ভালোই লাগছে।
নারী, এই একটি শব্দের মধ্যে আছে হাজারও রূপ। কখনো মমতাময়ী, কখনো সংসারি, কখনো রহস্যময়ী, আবার কখনো জীবন সংগ্রামে ছুটে চলা একজন কর্মজীবী নারীর রূপ। তাহলে প্রশ্ন আসে নারীদের জন্য একটি বিশেষ দিবস কেন?
কারণ হাজারও। ব্যাখ্যা আর প্রকাশও হাজার রকমের।
তার থেকে বরং একটা গল্পই বলা যাক-
ওই মেয়েটার কথা কী মনে আছে?
এই তো কয়েক দিন আগের কথা। বয়স মাত্র ১৮ বছর। নতুন বিয়ে হয়েছিল। মেহেদির রং তখনো ওঠে নাই,যখন সে লাশ হয়ে ঘরে ফিরেছে। হাসিমাখা মুখে, পরীর মতো মেয়েটা বউ সেজে কত পোজ দিয়েই না ছবিগুলো তুলেছিল। শরীর ভর্তি গহনা, দামী কমিউনিটি সেন্টারের আলোর ঝলকানিতে কত স্বপ্ন । মাত্র কদিন পরই যখন নতুন জীবনের স্বপ্নকে চিরতরে শেষ করা হচ্ছিল তখন নিশ্চয়ই সে মিনতি করছিল-‘আমাকে মারবেন না, ছেড়ে দিন প্লিস প্লিস.. । পরে হয়তো তার বিস্ফোরিত চোখ, আর্তনাদ উপেক্ষা করেই সব শেষ।
কেন?
নিশ্চয় মনে আছে- যৌতুকের বলির জন্য। বাকিটা নিজেরাই বুঝুন। এরকম তো হাজারও ঘটনা নিজেরাই দেখেন পত্রিকা খুললে । নতুন করে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই।
যৌতুকের বলি- কেন?
মেয়েটার বয়স কী কম?
নিজে কী প্রতিষ্ঠিত নয়?
যাওয়ার জায়গা কী ছিল না?
দাবি আর নির্যাতন তো একদিনে শুরু হয় না। প্রথমে তো মানসিকভাবে শুরু হয়। তাহলে ওই যে ডক্টর মেয়েটি, সে তো প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাকে মেরে তো গোপনে পুতেও দেয়া হয়েছিল। তার কি সমস্যা ছিল?
সমস্যা আমাদের সমাজের। আমাদের পরিবারের । আমরা নিজেদের। আমরা নিজেরাই অন্যদের লোভী হওয়ার সুযোগ দেই। কখনো প্রথার নাম দিয়ে, কখনো মেয়ের সুখের নামে। মেয়ের সুখের জন্য বিয়ে হওয়াটা জরুরি?
তার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা যৌতুক না হোক,উপহার হিসাবে তো দিলে সমস্যা নাই,তাই না?
মেয়েকে মানুষ করা,যোগ্য করা এবং তার যোগ্য হওয়াটাই যথেস্ট নয় । তাকে পণের দরে বিচার করাটা এবং হতে দেয়াটাও অনেকে প্রথা বানান, সেই সঙ্গে অন্য যাদের সামর্থ্য নেই তাদের জন্য প্রথাটা বোঝা বানিয়েও ফেলেন। তাই তো?
দোষটা আসলে কার? যে চায় তার চাওয়া যে দিনে দিনে বাড়বে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? তার থেকে না হয় নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের কথাটা যদি ভাবতেই হয়, অন্যভাবে ভাবা হোক আজ থেকে।
আর মেয়ে আপনি?
সমাজ,পরিবার,সন্তানের কথা ভেবে প্রায় অধিকাংশ নারী সব অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে যান।। যার শেষ পরিণতি নিজের প্রাণকে বিসর্জন দেওয়া। কখনো যৌতুক, কখনো পরকীয়া অথবা কখনো শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে। সবাই আপনাকে বলবে সংসারে এসব হয়ই, মানিয়ে নাও। মানিয়ে নিতে নিতে এক সময় সে নিজেও ভুলে যায় সে কে?
আর নিজের প্রাণ দেয়াটাই একমাত্র মহানুভবতা, ভালো হওয়ার প্রমাণ। কি বলেন?
প্রাণ যায় যাবে, সমাজের চোখে মহান হলেই হলো! কিন্তু অত্যাচার করা, অত্যাচারিত হতে দেয়া  দুটাই কী সমান নয়? একজন মানুষ হিসাবে কারো মু্ল্য কখনোই কমে যায় না, যতক্ষণ না সে নিজেকে মূল্যহীন ভাবে। মরে যাওয়ার আগে নিজের জন্য কী কিছুই করার নেই?
বাসন মাজতে পারেন? ঘর ঝাড়ু দিতে? বা অন্য কিছু? যাওয়ার জায়গা নেই?
তো অন্যের বাড়ির কাজের লোকই না হয় হয়ে যান, আর যদি কিছু নাই করার থাকে! তাতে অন্তত আপনি বুঝতে পারবেন,সংসারে আপনার যে ভূমিকা, কাজ সেটা কোনো অর্থেই মূল্যহীন নয়। আপনি মূল্যহীন নন। আপনার ধরে রাখা সম্পর্কগুলাতেও আপনি মূল্যহীন নন, বরং অপরিহার্য। হোক আপনি গৃহিণী অথবা কর্মজীবী নারী। আর যদি কেউ যথাযথ মুল্যায়ন নাই করে, কিছুটা বাঁচা না হয় নিজের জন্যই অন্তত বাঁচুন।
আজও আলট্রাসনোগ্রামে প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে, প্রথম প্রশ্ন থাকে? ছেলে না মেয়ে ?
এই প্রশ্নটার জন্য দায়ী কে? কেন এই প্রশ্ন?এর উত্তর আছে সমাজ আর নিজেদের কাছেই। আমরাই এই প্রশ্নের জন্য দায়ী।
নারী দিবস নয় শুধু, প্রতিটা দিবসেই নারী হিসাবে নিজেকে চেনা, জানা, নিজের অধিকার আর মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শেখা এটাই নারী দিবসের মূলকথা। পৃথিবীর সকল নারীকে শুভেচ্ছা  ভালোবাসা।
জয়তু নারী।

Comments

comments