ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৬ : ১৭ মিনিট

বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরে ঘটনাগুলো নিয়ে ধারাবাহিক লেখা ‘পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা’। লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম বাবলু। আজ ​থাকছে শরণার্থী অধ্যায়ের পঞ্চম পর্ব।

16472820_1451501031561631_6848022955974656258_nঅজানা–অচেনা লাল্পুর চরে তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল লঞ্চটি ।
আজব এক সময়। কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়,কেউ আবার পরম স্নেহে,ভালবাসায় কাছে টেনে নেয়।
এগিয়ে এলো সেই চরের অচেনা যুবকেরা ।
মানুষের সৃষ্ঠ দুঃসময়ে এগিয়ে এলো মানুষ।
যুবকদের একজন আশ্বস্ত করে বলেন–‘ভাববেন না ,আমরা নৌকা করে আপনাগো নবীনগরে পৌছামু। আপনারা দেরি না কইরা কিছু খাইয়া লন ।’

কী খেয়েছিল সেদিন মনে নেই পদ্মার। বললেন–‘এতদিন পর তা কি মনে আছে ভাই।’

ছেচল্লিশ বছর পর তা সত্যি মনে করাও কঠিন। সাভারের ব্যাংক টাউনের পদ্মার বাসায় আমরা মুখোমুখি বসে।আমার রেকর্ডার চলছে। বাসার ড্রয়িং রুমের সর্বত্র কাঁঠালচাপার গন্ধের মতো মউ মউ করছে ১৯৭১। দেয়ালের চারপাশে টাঙানো সাদেক রহমান,পদ্মা রহমানের সাথে বীর উত্তম খালেদ মোশারফ এর বিশ্রামগঞ্জের হাসপাতালের ছবি, অনেকগুলি ছবি জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে, অনেক সংগঠন এই মুক্তিযোদ্ধা দম্পত্তিকে দেওয়া সংবর্ধনা ছবিগুলি দৃশ্যমান।

এছাড়া ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর এই মুক্তিযোদ্ধা দম্পতিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইষ্টার্ণ কমাণ্ড তাদের ২০১৬ এর বিজয় দিবসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কলিকাতার বিজয় দিবসের অনুষ্টানে ।তাদের দে্ওয়া উপহারগুলো এখানে আছে।

কলিকাতার এই অনুষ্টানে এই দম্পতির সাথে পরিচয় হয় আমার।

অনেক রাত, সুনসান চারদিক ।
বারান্দায় তাদের পাখিগুলিও যেন নিশ্চুপ। হয়ত তারাও শুনছে তাদের মালকিন এর দুঃখের দিবস ও রজনীর কথা। ডাইনিং এ বসে অবাক বিস্ময়ে শুনছে বড় কন্যা শ্রাবস্তী। হয়ত ভাবছে কি কষ্টের সময় পার করেছে তার মা।
পদ্মা বললেন, ‘এই যুবকেরাই আমাগো একটা বড় নৌকা থামাইয়া তুইলা দিল।’ নৌকা চলল কুমিল্লার নীবনগরের পথে।
পদ্মারাণী সরকার তার পরিবার নিয়ে যখন নবীনগরের পথে তখন ঢাকাসহ সারাদেশে চলছে পাকিস্তানি হানাদারদের পৈশাচিক নির্যাতন।

হুমায়ুন আহমেদের জোছনা এবং জননীর গল্প ” উপন্যাসে আমরা পাই এর এক সঠিক ছবি। ‘লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাফের তরুণ এক রিপোর্টার হানাদারদের চক্ষু ফাঁকি দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে এলেন শেরাটন থেকে। ভারত ছাড়া প্রথম একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বের হল তার রিপোর্ট। তার দীর্ঘ প্রতিবেদনের এক অংশে তিনি লিখলেন, ‘নগর নীরব। সকাল হবার কিছুক্ষণ আগে গোলাবর্ষণ থেমে গেল। সূর্য উঠল। এক ভৌতিক নীরবতা নগরীকে গ্রাস করে,পরিত্যাক্ত ও মৃত এই নগরীতে শুধু শোনা যাচ্ছে কাকের ডাক,মিলিটারি কনভয় ও চলমান ট্যাংকের ঘর্ঘর শব্দ।’
দুপুরে আচমকা সৈন্যদলের গাড়ি পুরনো ঢাকায় ঢূকে পড়ল,যার গোলকধাঁধাঁর মতো গলিঘুঁজিতে দশ লাখ মানুষ। পরের এগার ঘণ্টা ধরে চলে ধ্বংসযজ্ঞ।
অগ্রবর্তি দলের পেছনে পেছনে সৈন্যরা পেট্রোলের টিন হাতে করে যাচ্ছিল।যারা পালাতে চেষ্টা করছিল তাদের গুলি করা হলো। আর যারা পালিয়ে গেলেন না তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হলো।’

সাইমন ড্রিং এর এই রিপোর্টে চমকে উঠল সারা বিশ্ব ।
এর মধ্যে ৩১ মার্চ পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রামকে সর্বাত্মক সহযোগীতা দেয়ার লক্ষ্যে এক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ভারতের পার্লামেন্ট। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে। তার আদর্শকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ৩ এপ্রিল দিল্লীতে সাক্ষাত করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নতুন গতি নিয়ে যাত্রা শুরু করল। ইপি আর ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর সৈন্যদের নিয়ে সীমান্ত এলাকায় জনতা গড়ে তুলতে থাকল প্রথম প্রতিরোধ ।
যুবকেরা কথা রেখেছিল ।একটা বড় নৌকা এনে তাদেরসহ অন্যান্য পরিবার গুলিকে তুলে দিল নৌকায়।

বিকেলের মধ্যে তারা পৌছালেন নবীনগরের নারায়ণপুরে তার এক মাসীর বাড়িতে। মাসীর বাসায় পৌঁছেতে পৌঁছতে সন্ধ্যা প্রায়। সেদিন সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন পদ্মা।

 

পা​কিস্তান হায়েনাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে আনতে পেরেছেন পরিবারকে এই সান্তনা। মাসীর দেওয়া খাবার খেয়ে ঘরের মেঝোতে ঘুমিয়ে পড়েন পদ্মা।
কাল আবার বেরুতে হবে।
লক্ষ্য মুরাদ নগরের কামাল্লা গ্রাম ।

{চলবে}

আর পড়ুন:
বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরের কথা..প্রথম পর্ব
পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা..দ্বিতীয় পর্ব
পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা..তৃতীয় পর্ব
পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা..চতুর্থ পর্ব

 

Comments

comments