ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৭ মিনিট

February 16th, 2017

ভাবতেই অবাক লাগে, ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ শহর ঢাকায় রীতিমতো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। শুধু সমাজেই নয়, নীলক্ষেত ব্যারাকের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও ভাষার অধিকার নিয়ে বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে, মিছিলে স্লোগান রমনার রাজপথে: ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই’।

বস্তুত, ভাষাসংগ্রামীরা বিরোধ না চাইলে কী হবে, বিরোধ যথেষ্টই ছিল পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির মধ্যে, এমনকি আমলাদের মধ্যেও। এর প্রমাণ মিলেছে পদে পদে। সেই বিরোধিতা যেমন তাদের মনে, তেমনি প্রকাশ্য উচ্চারণে। আর এ কারণেই পাকিস্তানের প্রতি বাঙালি মুসলমান সমাজের ব্যাপক সমর্থন সত্ত্বেও ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদ প্রকাশ পেতে থাকে সভা-সমাবেশে, মিছিলে-স্লোগানে। মিছিলে নিয়মিত স্লোগান: ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।

বাংলার শহরে-নগরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদী-বিক্ষোভের হঠাৎ-ঘটনা আগুনের ফুলকির মতো উত্তাপ জোগান দিল ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে। পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসেছে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮-এ। এই অধিবেশনে কোনো প্রকার পূর্বপ্রস্তুতি বা দলীয় আলোচনা ছাড়াই গণপরিষদের কংগ্রেস-দলীয় সদস্য কুমিল্লার বিখ্যাত আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ব্যক্তিগত ভাবনার জেরে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

প্রস্তাবটি খুবই সাধারণ, কিন্তু রাজনৈতিক বিচারে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রস্তাবের মূল কথা: গণপরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। এই প্রস্তাব যে ভাবনা থেকে উত্থাপন করা হোক না কেন, এর গুরুত্ব এমন এক বাস্তবতায় যে গণপরিষদের বাঙালি সদস্য, অন্তত কেউ কেউ ইংরেজিতে অনর্গল বক্তৃতায় অভ্যস্ত ছিলেন না। তা ছাড়া এটা অধিকারেরও প্রশ্ন।

এই সহজ বিষয়টি সহজভাবে নেননি গণপরিষদের অবাঙালি সদস্যরা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। সত্যি বলতে কি, ক্রুদ্ধ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্য ছিল রীতিমতো আপত্তিকর এবং সংসদীয় রাজনীতির রীতিনীতিবিরোধী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় এমন কথাও বলেন যে প্রস্তাবটি রীতিমতো উদ্দেশ্যমূলক এবং পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক। বিস্ময়কর যে পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রতিনিধি সবাই, বিশেষ করে তমিজুদ্দিন খান থেকে খাজা নাজিমুদ্দীন প্রস্তাবের বিরোধিতাই করেননি, প্রস্তাবকের নিন্দাও করেন। একমাত্র কংগ্রেস-দলীয় সদস্যরা প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করে কথা বলেন। বলা বাহুল্য, প্রস্তাবটি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বাতিল হয়ে যায়।

দুই.

এ ঘটনা সংবাদপত্রমহল সাগ্রহে লুফে নেয়, নিজ নিজ ভাষ্যে পত্রিকাগুলোতে তা প্রকাশ পায়। আজাদ, ইত্তেহাদ, আনন্দবাজার, অমৃতবাজারসহ অধিকাংশ পত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে চলে তোলপাড়; প্রকাশিত হয় সংবাদ ও প্রতিবেদন। দামামা বাজানো না হলেও জোরেশোরে ঘণ্টা বাজল পূর্ববঙ্গের ছাত্রমহলে, মাতৃভাষা-সচেতন শিক্ষিত শ্রেণিতে। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার ছাত্রসমাজ তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রমনার বাতাস স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং স্থানীয় স্কুলের ছাত্ররা ক্লাসরুম ছেড়ে বেরিয়ে আসে। এরপর চলে সভা-সমাবেশ-মিছিল আর উত্তেজিত স্লোগান: ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এবার বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ সুসংগঠিত আন্দোলনে পরিণত করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয় গণপরিষদের বিজাতীয় ও সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ায়।

এ ঘটনা ভাষা আন্দোলন তৈরিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ১১ মার্চের আন্দোলনের মাধ্যমে সারা দেশে ভাষাসচেতনতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ঢাকায় গঠিত হয় বৃহত্তর পরিধিতে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ (যে কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে)। এই পরিষদে বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব সত্ত্বেও তমদ্দুন মজলিশের প্রাধান্য থাকায় এতে আদর্শিক দ্বন্দ্ব যথেষ্টই ছিল। ছোট্ট একটি ঘটনায় তার প্রমাণ মিলবে। বহুদলীয় এই পরিষদে অধ্যাপক অজিত গুহকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি তমদ্দুন মজলিশ-প্রধান অধ্যাপক আবুল কাসেমের প্রবল আপত্তিতে। কারণটা স্পষ্ট।

তা সত্ত্বেও সাধারণ ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাষাবিষয়ক আবেগের কারণে ঢাকাসহ প্রদেশের একাধিক শহরে প্রশাসনিক বিরোধিতা সত্ত্বেও ১১ মার্চের ভাষা আন্দোলন ব্যাপক উদ্দীপনায় পালিত হয়। জনমনে এর প্রভাব পড়ে। তৈরি হয় ভাষা আন্দোলনের শিকড়ঘেঁষা বিস্ফোরক সম্ভাবনা। নানামুখী বিরোধিতার মুখে ভবিষ্যৎ সময় ও ঘটনাবলি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছে।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব এবং তা বাতিলের ঘটনাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সে সময় কলকাতায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী পূর্ববঙ্গীয় প্রতিনিধিরা কলকাতা থেকেই ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি বিবৃতি মারফত ধীরেন্দ্রনাথকে ধন্যবাদ এবং সরকারি ভূমিকার নিন্দা জানান।

Comments

comments