ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ০৯ মিনিট

বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরে ঘটনাগুলো নিয়ে ধারাবাহিক লেখা ‘পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা’। লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম বাবলু। আজ ​থাকছে শরণার্থী অধ্যায়ের চতুর্থ  পর্ব।

16472812_1450044348373966_116936307790325749_nএপ্রিল মাস। পদ্মারা সবাই মিলে যাবে দাদা ও নানার বাড়ি মুরাদনগরের কামাল্লায়। মাসের শুরুর সপ্তাহে বেরিয়ে পড়েন তারা। লঞ্চে করে নবীনগরে নেমে তার সেখানে যাবে। লঞ্চে তিল পরিমাণ জায়গা নেই। ভিতরে কিংবা বাইরে।মানুষ আর মানুষ। তাদের টোপলাটুপলিতে ভরা লঞ্চেটি।
সবার চোখে–মুখে উদবেগ। অজানা,অচেনা এক সময়ের মুখোমুখি সবাই ।এরমধ্যে শুরু হয়ে গেছে দেশত্যাগ করে ভারতে যাওয়ার।  ‘The endless refujee exodus got underway’ পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত ডিফেনস জার্নাল সুত্রে থেকে জানা যায়–তাদের সেই সময়ের মুল্যায়ন–”By april 10 ,when according to original estimate of the forces commander Gen.Tikka Khan the entire province would have been fully normalised,,a warlike situation had actually come into evidence .The province had turned into a theater of war and its various districts into so many battle zones.The army in hot pursuit of EBR and EPR deserters,spread all over the province .The moment the bulk of the deserters (miscreants!)were chased out of east pakistan the commanders appeared to have been led into dangerous belief that the battle has already been won…The CGS General Gul hasan after his visit to east pakistan in second week praised the boys”for wonderful performence ‘and appraised that everything ‘under full controll and going according to the plan .Brigadier (Rtd)A.R.Siddique,পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত Defence Journal,Vol iii,no 12,1977,page 3
পাকিস্তানি সমর অধিনায়কেরা ছিল কল্পনার এক ভিন্ন জগতে। বাস্তবের কঠিন মাটিতে আসতে সময় লেগেছে তাদের অনেক।
সময়টা ছিল গুজবের আতংকের ।সঠিক খবর পাওয়া যাচ্ছিল না সহসা। সে সময় দুটি সংবাদ মাধ্যম দাঁড়ায় আমাদের পাশে।
বিবিসি ও আকাশবাণী ।
যতদ্দুর মনে পড়ে প্রণবেশ সেনের লেখা সমীক্ষা পড়ে শোনাতেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সংবাদ সমীক্ষা শুনে সেই সময়ে কাঁদেনি এমন লোক কাউকে পাওয়া যেতো না। আর বিবিসির সন্ধ্যার খবরের আসর ধরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বাজার। যা আজও বিদ্যমান। উল্লেখ্য করা যেতে পারে,পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক বাজার যারা নাম সেই সময়ে রাখা হয় বিবিসি বাজার।  {পাবনার পাকশী পেপার মিল ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায়। পেপার মিল থেকে দক্ষিণ দিকে সামান্য পথ গেলেই গ্রামটি। গ্রামের বাসিন্দা কাশেম মোল্লা। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে পাকশী রেলবাজারে দেন একটি মুদি দোকান। ‘৭১-এর ২৫ মার্চের পরে পাকিস্তানি আর্মি বাজারটি পুড়িয়ে দিলে তিনি চলে যান নিজ গ্রাম পাকশীর রূপপুরে। নিজের হাতে লাগান একটি কড়ই গাছ। গাছের পাশেই দেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই তখন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। হানাদার বাহিনীর পিস্তলের বাঁটের আঘাতে জখম হওয়া পা নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা কাশেম মোল্লা স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ইচ্ছায় থ্রি ব্যান্ডের একটি রেডিও কেনেন। সে সময় পাঁচ গ্রাম খুঁজেও একটি রেডিও পাওয়া যেত না। চায়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় জমানোর জন্যই দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে রেডিওটি দোকানে নিয়ে যেতেন। দেশে যুদ্ধ লাগার পর দেশের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে বিবিসি বাংলায় খবর প্রচারিত হতো। মুক্তিযোদ্ধারা খবর শোনার জন্য তার চায়ের দোকানে অবস্থান নিতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর শোনাতেন। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও আকাশবাণীর খবর শোনার জন্য আশপাশের মানুষ দু’বেলা নিয়মিত ভিড় জমাত তার চায়ের দোকানে। চা খেতে আসা লোকজনের নানা তথ্য থাকত কাশেম মোল্লার কাছে। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশীয় দোসর, রাজাকার ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সম্পর্কে তথ্য দিতেন তিনি। ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকল তার দোকানে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গড়ে উঠল সম্পর্ক। সূত্র : সমকাল, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৬}

লঞ্চ চলছে আর উদবেগ বাড়ছে পদ্মার।সময়মত নবীনগর পৌঁছা যাবে তো । সাথে টাকা পয়সা বেশি ছিল না।
সুরেন বাবুর আয় ছিল প্রচুর। কিন্তু টাকা জমে রাখার মতো মানুষ ছিলেন না তিনি। ভালো খেতে এবং অতিথিদের খাওয়াতে ভালো বাসতেন । শোনা যায়, আশপাশের অনেক গ্রাম এবং ভৈরবের অনেকের নাম ছিল বাকীর খাতায়। পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য চাপ দিতেন না কখনই। তার ধারণা ছিল,‘চইলা তো যাইতেছে, ভগবান তো খারাপ রাখেন নাই।’

তাই যখন অগস্ত যাত্রা শুরু করলেন সুরেন বাবু। তখন নগদের ভাণ্ডার তেমন একটা নেই। ছিল শুধু গয়না।
তা আবার সেই সময়ে কে কিনবে? লুঠ করো নেয়াটা যখন সহজ তখন হিন্দুদের গয়না কেনে কে! তবু গয়নার চেয়ে চিন্তা ছিল তার। পদ্মা নিজেও বিচলিত হয়ে পড়েন । চর্যাপদের পদকর্তা যা লিখে গেছেন–
‘অপনা মাংসে হরিনী বৈরী ।
তিনি তরুনী এবং হিন্দু তরুণী।
ধর্মান্ধদের ভাষায় মালাউনগো মাইয়া।’
লঞ্চ যাবে নবীনগর।
কিন্তু হঠাৎ​ করে, সারেং লাল্পুর নামের এক চরে গিয়ে লঞ্চ থেমে ঘোষণা দেয়– ‘লঞ্চ নবীনগরের দিকে যাইব না ।
যারা ওদিক যাইবেন তারা নাইমা নৌকা নিয়া যান গিয়া।’
শুরু হয়ে গেল সোরগোল। বিশেষ করে যারা নবীনগরের দিকে যাবেন। তাদের মধ্যে দেখা গেল আতংক।সবাই বলাবলি করে লাগল ‘এই চর তো ডাকাইতগোর’।

তখন দুপুর।
কারোই পেটে পড়েনি দানাপানি।
প্রতিবন্ধী ভাইটি ক্ষিদে পেলে উচ্ছৃংখল হয়ে উঠে।
এর মধ্যেই নেমে পড়তে হলো লাল্পুর চরে ।

{চলবে}

আর পড়ুন:
বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরের কথা..প্রথম পর্ব
পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা..দ্বিতীয় পর্ব
পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা..তৃতীয় পর্ব

Comments

comments