ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ০৭ মিনিট

বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরে ঘটনাগুলো নিয়ে ধারাবাহিক লেখা ‘পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা’। লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম বাবলু। আজ ​থাকছে শরণার্থী অধ্যায়ের তৃতীয় পর্ব।

16507932_1449401121771622_6104932181285194255_nবড় একটা সময় ঢাকায় কাটিয়ে পদ্মা যখন বাড়ি ফিরলেন তখন তাঁর সাথে সাথে, চিরচেনা ভৈরব ও বদলে গেছে । এ যে জয় বাংলার ভৈরব । শীতের সকালে খেজুর গাছ থেকে পেড়ে আনা খেজুরের রসে যে ঝাঁঝাঁলো গন্ধ, তেমনি দ্রহের গন্ধে, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় টৈটুম্বুর বাঙালি জনগোষ্টী ।

এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন এক ঐতিহাসিক ভুমিকা।  গ্রামে গঞ্জে তারা অসংখ্য সভার মাধ্যমে জাগিয়ে তুললেন দেশপ্রমিক তরুণ যুবাদের ।
এই উত্তাপ অনুভবে সিক্ত হলেন পদ্মা । যদিও এই আন্দোলনে তিনি ব্রাম্মণ ছিলেন না,ছিলেন শুদ্র ।

তখনকার সময়ে মানুষর দৃষ্টিভঙ্গি এমন ছিল-‘তুমি তো মাইয়া মানুষ, এইসবে তুমার কি কাজ ।’ পদ্মা এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে ভাঙতে শুরু করেন। তিনি হাটঁতে লাগলেন ঠিক উল্টোপথে। সেখানে তিনি একজন লড়াকু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্ঠায় মেতে উঠলেন।
১৭ মার্চ এলো চুড়ান্ত নির্দেশনা।  ঢাকা বাদে পুর্বপাকিস্তানের দায়িত্ব ছিল পিশাচ মেজর জেনারেল (অব;)খাদিম হোসেন রাজা।  তার স্মৃতি কথা, A STRANGER IN MY OWN COUNTRY east pakistan ,1969-1971 এ আমরা এক বর্ণনা পাই ,’At about 10 p.m. on 17 march ,I received a call from lieutenant General Tikka khan asking Major General Farman and me to go over the Command House to see him .Some days earlier ,Farman and his wife left the Governor house and were living with us in the cantonment .We both went and found that General Abdul Hamid Khan was also present.Tikka khan informed us that the negotiations with sheikh Mujib were not procceding well and the President ,therefore ,wanted us to be ready for military action and to prepare accordingly .No further verbal or written directions werw issued .We were told to plan together and discuss the plan with the two dignitaries on the evening of 18 March .”(খাদিম এর এই লেখার আগে আমরা এই ম্যাসাকারের আদেশের নির্দিষ্ট তারিখ পাইনি এবং এই অপারেশনের কোন টাইপ কপি না করবার নির্দেশ ছিল জল্লাদ ইয়াহিয়ার)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সময়ে সবচেয়ে নৃসংশ হত্যাকান্ডের যে ফরমান ইয়াহিয়া জারি করে তা তছনচ করে দেয় একজন পদ্মা ,তার পরিবার এবং লক্ষ কোটি পদ্মার সংসার ।
২৫ মার্চের বর্বরতম হত্যাকান্ডের পর আপনজনেরা তাগিদ দিতে থাকলেন ভৈরব ছাড়তে। কিন্তু সুরেন বাবু (সেদিনের পদ্মা রাণী সরকার এবং যুদ্ধকালীন ভালবাসার বিয়ের সুবাদে আজকের মুক্তিযোদ্ধা দম্পতি পদ্মা রহমান সাদেক রহমানের মিষ্টি মেয়ে স্রাবস্তি আমাকে জানিয়েছেন তার নানার পুরা নামটা যেন আমি উল্লেখ করি ,তার পুরা নাম ,সুরেন্দ্র চন্দ্র সরকার ) এবার অবুঝের ভুমিকায়। তাকে রাজী করানো যাচ্ছিল না ।

আমি ধারণা করি তিনি বিশ্বাস করতে চাছিলেন না,পাকিস্তানি হানাদার বাহিনিরা তার মত নিরীহ মানুষকে কেন মারবে ?
তিনি তখন জানতেন না ইয়াহিয়ার ঘাড়ে এ যুগের হিটলার নিক্সন কিসিঙ্গার সওয়ার হয়েছে ,ইহুদি নিধনের মত তারা শুরু করেছে হিন্দু নিধন। তোমাকে কলেমা পড়তে হবে,লুঙ্গি খুলে দেখাতে হবে তা না হলে গুলি।
শুরু হয় দীর্ঘ অন্ধকার-রাত্রীর। সেই সময়ে কোনো মতই বুঝতে চাছিলেন সুরেন বাবু।  আহারে কি ভাবে কেটেছে সে সময়টা পদ্মার,তা ভেবে এখন ও চুপ হয়ে যান তিনি । পদ্মা বলেন,‘বাবা রাজি হইলেন। যহন পাকিস্তানি হানাদার গোর শেল আইসা পড়তে থাকলো ভৈরবে ।’
সে গোলা কাউকেই চেনে না ।ধংস করে মাঠ ঘাট জনপদ এবং মানুষ । এপ্রিলের শুরুর এক সকালে বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা মা ,প্রতিবন্ধি ছোট ভাইকে নিয়ে ভৈরব থেকে কুমিল্লার দিকে ছেড়ে যাওয়া শেষ লঞ্চে উঠলেন পদ্মা । ছিন্নমুল এই পরিবারটির দায়িত্ব তখন একান্ত ভাবেই তার । বনে বাদারে ঘোরা সেই দুরন্ত পদ্মা তখন এই পরিবারটির অভিভাবক ।
লঞ্চ ছেড়ে দিল। পড়ে থাকল শিশুকাল ,ছেলেবেলা ,পড়ে রইল তুলসীতলা ।
[চলবে ]।

আর পড়ুন: বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরের কথা..প্রথম পর্ব
পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা..দ্বিতীয় পর্ব

ছবি : রিফিউজি ক্যাম্পের দেয়ালের ছোট্ট ফুটা দিয়ে আসা আলোয় তোলা অসাধারণ ছবিটি war phtographer ম্যারিলিনসিল্ভারষ্টোনের,।

Comments

comments