ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১২ : ০৫ মিনিট

February 14th, 2017

যেকোনো দেশের সমাজ ও রাজনীতির যাত্রাপথে সম্মুখযাত্রার পাশাপাশি কখনো পিছুটানের ঘটনাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। ভাষা আন্দোলনেও এ ঘটনা দেখা গেছে। এগুলো আন্দোলনকে বিলম্বিত করেছে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠালগ্নেই ১৯৪৭-এর শেষ দিকে বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদী বিক্ষোভ যখন নিজেকে সংহত ও শক্তিমান করতে চেষ্টা করছে, তখন সংগঠিতভাবে বিক্ষোভ-আন্দোলন পরিচালনার উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এই উদ্যোগ সদ্য গঠিত ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসে’র। তমদ্দুন মজলিসের লক্ষ্য ছিল ইসলামি মতাদর্শে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন। জনসাধারণে তাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মতবাদ প্রচারের জন্য তত্ত্বগত দিক থেকে বাংলা রাষ্ট্রভাষা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় দাবি হয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়ায় প্রধানত সরকারপক্ষে উর্দু রাষ্ট্রভাষার প্রচারের বিপরীতে।

তাদের আরেকটি লক্ষ্য ছিল ভাষা আন্দোলনের সুফল তাদের আদর্শিক প্রয়োজনে এককভাবে ব্যবহার করা এবং সেই খাতে প্রবাহিত করা। ভাষা আন্দোলনে একাধিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন যুক্ত থাকার কারণে তমদ্দুন মজলিস প্রথম রাষ্ট্রভাষা কমিটি গঠন করলেও এর সর্বদলীয় চরিত্রে তারা বড় একটা আগ্রহী ছিল না। অনেকটা যেন বাধ্য হয়েই দু–চারজন ভিন্ন রাজনৈতিক মতের ব্যক্তিকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশেষ করে বামপন্থীদের ব্যাপারে মজলিসের ছিল বিষম বিরূপতা।

প্রথম সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বিশিষ্ট তমদ্দুন নেতা অধ্যাপক নুরুল হক ভুঁইয়া। ভাষা আন্দোলনকে শক্তিমান করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকীর্ণতা ইতিবাচক ফলের সহায়ক ছিল না। তাই নামে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি হলেও এই সংগঠন তৎকালীন ভাষাবিষয়ক বিক্ষোভগুলোকে ঐক্যবদ্ধ, সংহত ও শক্তিমান ধারায় বিকশিত করে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

সংগ্রাম কমিটির এই অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, রুটিন তৎপরতার বাইরে আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে শক্তিমান ভূমিকা রাখায় ব্যর্থতা পরবর্তী সময়ে আহ্বায়কের স্মৃতিচারণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিষয়টি নিয়ে আগে-পরে বিশদ আলোচনা করেছেন আবদুল মতিন। তাঁর মতে, ‘নেতৃত্ব তমদ্দুন মজলিসের প্রাধান্য আন্দোলন বিকাশের অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়।…ভাষার মতো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টিকে এরা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণার বাইরে নিয়ে যেতে পারেননি।’

এ সম্পর্কে অনুরূপ মতামত ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ তোয়াহা এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থ রচয়িতা বদরুদ্দীন উমর ও বশীর আলহেলালের। বাস্তবে এমনটাই ঘটেছিল। সংগ্রাম পরিষদে বিরাজমান আদর্শিক অন্তর্দ্বন্দ্ব এর অন্যতম প্রধান কারণ।

অথচ প্রতাপশালী মুসলিম লিগ সরকার কেন্দ্রে ও প্রদেশে (যেমন পূর্ববঙ্গে) ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও তাদের ভাষাবিষয়ক ভূমিকা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কিন্তু সে পরিস্থিতিকে সাংগঠনিক রূপ দিতে খুব একটা শক্তিমান ভূমিকা পালন করতে পারেনি প্রথম সংগ্রাম কমিটি।

তাই উল্লিখিত সম্ভাবনা ফলপ্রসূ করে তুলতে অচিরেই (২ মার্চ ১৯৪৮) কিছুটা বৃহত্তর পরিসরে বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও দলের প্রতিনিধি নিয়ে দ্বিতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এবারও আহ্বায়ক মনোনীত হন তমদ্দুন মজলিসের সদস্য শামসুল আলম। কিন্তু এবার এতে নানা রাজনৈতিক মতের সদস্য এবং দু–একজন বামপন্থীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ছিলেন মধ্যপন্থী রাজনৈতিক নেতা।

এ কমিটির পক্ষেও সম্ভব হয়নি ১১ মার্চের ভাষা আন্দোলনের চরিত্র ও শক্তি যথাযথ মূল্যে ধারণ করা এবং তা বাস্তবে প্রতিফলিত করা। সে জন্য প্রধানত তমদ্দুনপন্থী সদস্য ও মধ্যপন্থীদের চাপে সাধারণ ছাত্রদের মতের বিরুদ্ধে মার্চের আন্দোলন মাঝপথে স্থগিত করা হয়। তবে এ সংগ্রাম পরিষদের নেতিবাচক ভূমিকার কারণে ‘আন্দোলন-শেষে’ দ্বিতীয় সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়কও পদত্যাগ করেন।

আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক

Comments

comments