ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৬ : ৪২ মিনিট

Asad-sorkar
যে দিনটি ভুলতে বসেছি! ইতিহাস তৈরি করা যায় কিন্তু ভেঙে ফেলা যায় না! ইতিহাস লিখা যায় কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাস ধামাচাপা দেয়া যায় কিন্তু নিঃচিহ্ন করা যায় না!তেমনি ভাবে ১৯৮৩ তে ছাত্রদের উপর চালানো বর্বরতা ঢাকার জন্য ইতিহাস ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাটা হয়তো সফল হয়েছে কিন্তু নিঃচিহ্ন করা সম্ভব হয় নি।

১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ : কলা ভবন থেকে শিক্ষা ভবন অভিমুখে ছাত্রদের মিছিল। স্লোগানে মিছিলে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয়। সামরিক শাসন মানি না… মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল কর… করতে হবে… হঠাৎ করেই গুলিতে প্রকম্পিত চারদিক… মিছিলে পুলিশে ট্রাক তুলে দিয়ে শুরু হয় বর্বরতার এক ভয়াল নিদর্শন।

স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের হিংস্র পুলিশ বাহিনির উন্মত্ততায় একে এক লুটিয়ে পরে জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা। আহতদের আহাজারিতে হাসপাতালগুলোতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের… কলাভবনেও গুলি টিয়ার সেলের আঘাতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর নৃশংস হামলা। গ্রেফতার হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা.. কারফিউ জারি।

১৫ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে হরতাল। ওইদিন পুলিশের গুলতে জবি ছাত্র আইয়ুব ও কাঞ্চন। বছর দুই পর এই মধ্য ফেব্রুয়ারিতেই হত্যা করা হয় রাউফুন বসুনিয়াকে! ১৪ ফেব্রুয়ারি, স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে পালিত হয় স্বৈারাচার প্রতিরোধ দিবস।

১৯৮২ সালের ১৪ মার্চ, সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন স্বৈরাচার এরশাদ সরকার। সামরিক আইন জারি করে মৌলিক অধিকারের ভূ-লুণ্ঠন এবং বিরোধী দলীয় কর্মী ধরপাকড়, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এরশাদ আমল। প্রথম থেকেই তিনি ইসলাম ধর্মকে অত্যাচারের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। এরশাদের শাসনামলে ২১ ফেব্রুয়ারির বিভিন্ন অনুষ্ঠান ইসলাম পরিপণ্থী বলে ঘোষণা করা হয় এবং আল্পনা অংকনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তিনি! সেই সময় ছাত্র আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগায় তৎকালীন আমলে প্রণিত “মজিদ খান শিক্ষানীতি”। সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা সংকোচন-কে ভিত্তি ধরে প্রণিত এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও শিক্ষার ব্যয়ভার যারা ৫০% বহন করতে পারবে তাদের রেজাল্ট খারাপ হলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়- এই শিক্ষানীতিতে। মোদ্দাকথা, শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরিত করার হীন প্রয়াস থাকে এই শিক্ষানীতিতে! গণবিরোধী এই শিক্ষানীতির প্রতিবাদে, তিলে তিলে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন ফুঁসে ওঠে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। মধুর ক্যান্টিনে সকল ছাত্র সংগঠনের সম্মিলিত রূপ, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ -এর উত্থান ঘটে। একই ধারার অবৈতনিক বৈষম্যহীন সেক্যুলার শিক্ষানীতির দাবিতে ‘৮৩ এর ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশাল মিছিলে শামিল হয় শত শত ছাত্র। মিছিলের অগ্রভাগে ছিল ছাত্রীবৃন্দ।

হাইকোর্টের গেইট এবং কার্জন হল সংলগ্ন এলাকায় কাঁটাতারের সামনে এসে ছাত্রীরা বসে পড়ে; নেতৃবৃন্দ কাঁটাতারের উপর দাঁড়িয়ে জানাতে থাকে বিক্ষোভ। অতর্কিত পুলিশী হামলার শিকার হয় ছাত্র জনতা। শিক্ষার্থীদের উপর গরম পানি ছিঁটিয়ে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। নিহত হয় জয়নাল, দিপালীসহ অনেকে। শিশু একাডেমীর অনুষ্ঠানে যোগদান দিতে গিয়ে নিহত হয় শিশু দিপালী, তাঁর লাশ গুম করে ফেলে পুলিশ। জয়নালের গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে তবে শান্ত হয় পশুরা। ১৫ তারিখ আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়লে নির্যাতনের পাল্লা বাড়তে থাকে।

চট্টগ্রামে প্রতিবাদী কাঞ্চন নিহত হয় ১৫ তারিখ! শত শত ছাত্রকে নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয়, অত্যাচার চালানো হয়। তবু সেই মহান আন্দোলনের ফল আসে, পতন ঘটে স্বৈরাচার সরকারের। জয় হয় গণতন্ত্রের। কিন্তু আজ? আজ এই ইতিহাস আমরা ভুলতে বসেছি। অপমানিত করছি এই দিনটিকে। নানান অপকর্মের স্বাক্ষী করছি এই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে! আর ঢাকছি “স্বৈরশাসক এরশাদ” আর “মজিদ খান শিক্ষা নীতি” এর কুকৃর্তি গুলোকে! চলো আজ ভালবাসাকে পথে পথে অপমান না করে, ভালবাসি সেই অধিকার আদায়ে জীবন দানকারি মহান শহীদদের!

 

Comments

comments