ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ১১ মিনিট

বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরে ঘটনাগুলো নিয়ে ধারাবাহিক লেখা ‘পদ্মারাণীর একাত্তরের কথা’। লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম বাবলু। আজ ​থাকছে শরণার্থী অধ্যায়ের দ্বিতীয পর্ব।

ছবি : রঘু রায়

ছবি : রঘু রায়

তখন ঢাকা মিছিলের শহর । সকালে মিছিল, বিকেলে খন্ড খন্ড জনসভা আর সন্ধ্যার পর মশাল মিছিল। শুরু জয় বাংলা দিয়ে শেষ জয় বাংলা দিয়ে।
আর এই মিছিলের কেন্দ্র যে মিনার সেই শহীদ মিনার থেকে অল্প দুরত্বেই নার্সিং হোষ্টেলে পদ্মার বসবাস। রোগী দেখতে, রুমে থাকার সময় মিছিলের, স্লোগানের আওয়াজ ভৈরবের মেঘনা পাড়ের পদ্মাকে আর এক পদ্মায় রূপান্তরিত করছিল । বদলে যাচ্ছিলেন পদ্মা। ঢাকায় আসবার সময়কালের কিশোরী দুরন্ত পদ্মা রাজনীতি সচেতন তরুণী পদ্মায় রুপান্তরিত হচ্ছিলেন। হাসপাতালে আসা রাজনৈতিক রোগীরা তাঁর চেতনাকে আরও শানিত করে তুলতে লাগলেন ।
এখানে স্নেহময় বাবা মা নেই। ভাই বোন নেই, নেই আদারে বাদারে ঘোরার ভৈরব। তাই হাসপাতালে রোগী,নার্সিং এর পড়াশুনাতেই ডূবে থাকতে চাইলেন। তবে নার্সিং হোষ্টেলের ভয়াবহ অনুশাসন তাকে ক্রমঃশই ক্ষুব্ধ করে তুলতে লাগে । এভাবে চলে যায় ১৯৭০।
আগমণ ঘটে মহাকাব্যিক ১৯৭১।
৭ মার্চ। কয়েকজন নার্স বান্ধবীকে নিয়ে চললেন রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) শেখ সাহেবের ভাষণ শুনতে । 
হ‌ুমায়ূন আহমেদের অসাধারণ উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্পে  সাত মার্চ নিয়ে লিখলেন,‘রেসকোর্স ময়দানে মানুষের স্রোত নেমেছে । তারা চুপচাপ চলে আসছে তা না। স্লোগান দিতে দিতে এগুচ্ছে -‘বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো/বাংলাদেশ স্বাধীন করো ।’ ‘ভূট্টোর মুখে লাথি মারো ,বাংলাদেশ স্বাধীন করো’‘পরিষদ না রাজপথ/রাজপথ রাজপথ ।’ ‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা -যমুনা ।’
ঢাকায় যত মানুষ ছিল সবাই মনে হয় সেদিন চলে এসেছিল ।
সেই ‍উপন্যাসে পাই,‘মানুষের সমদ্রের এক অসাধারণ দৃশ্য ।এই দৃশ্য দেখাও এক পরম সৌভাগ্য।পৃথিবীর কোথাও কি এত মানুষ কখনো একত্রিত হয়েছে ?’
সেই জনসমুদ্রে অবগাহন করলেন পদ্মারাণী ।
হিন্দু ধর্মে পুণ্য তিথিতে পুণ্যধামে স্নানের বিধান আছে। এতে পুণ্যি হয়। পদ্মার কথা শুনে মনে হয়েছে-পদ্মা যেন এলাহাবাদের ত্রিবেণী সংগমে পুণ্য কুম্ভের তিথিতে স্নান করে উঠলেন,পার্থ্যক্য এ কুম্ভের নদী মানুষে ভরা।
পদ্মা আমাকে বললেন, ‘বাবলু ভাই আমার কি যেন একটা হইয়া গেল ।’
রেসকোর্স থেকে হোষ্টেলে আসতে আসতে সিদ্ধান্ত নিলেন, নিয়মের গিট্টুতে বাধা নার্সিং আর না । সমস্ত চেতনায় ছেঁয়ে যাচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর কাব্যিক বক্তায়। বারবার কানের কাছে বাজতেছিল তার বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো। ‘২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল,- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষের দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।’
সেই ভাষণে পাল্টে গেল পদ্মার জীবনগতি। সিদ্ধান্ত নিলেন দেশমাতৃকার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবার। তখন তার বয়স বোধ করি আঠার। (আহা এমন সু্যোগ মানব জন্মে কবার আসে।)
সাত মার্চের ভাষণের চারদিনের মাথায় একবস্ত্রে ঢাকা ছাড়লেন পদ্মা । চললেন প্রাণের ভৈরবে ।
{চলবে}
আর পড়ুন: 
বীরনারী পদ্মারাণী সরকারের একাত্তরের কথা..প্রথম পর্ব

 

Comments

comments