ঢাকা, বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৮ : ৪৪ মিনিট

February 9th, 2017

পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার ভাষিক ভুবনে ছোট ছোট ঘটনা অগ্নিকণার মতো জ্বলেছে, প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। সর্বোপরি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতবর্ষ ভেঙে পাকিস্তানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। প্রধানত পাঞ্জাব ও সিন্ধুর উচ্চশিক্ষিত এলিট শ্রেণি এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে পাকিস্তানে আগত বিশিষ্ট মুসলমান, বিশেষ করে সামন্ত-ভূস্বামী-বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবী ও ধনিক শ্রেণি নবগঠিত পাকিস্তানের শাসনভার হাতে তুলে নেয়। যেমন বোম্বাই থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আই আই চুন্দ্রিগড়, উত্তর প্রদেশ থেকে নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান, চৌধুরী খালিকুজ্জামান, হায়দরাবাদ থেকে গোলাম মোহাম্মদ প্রমুখ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁরা সবাই অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত ঘরানার রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবী, বেসামরিক-সামরিক ব্যক্তি ও পূর্বোক্ত মোহাজেররা পাকিস্তানবাদী দ্বিজাতিতত্ত্বে ও মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধে গভীরভাবে বিশ্বাসী এবং ভারত-বিদ্বেষে আক্রান্ত ছিলেন। বাঙালিদের তাঁরা বিজাতীয় জ্ঞানে অবজ্ঞা, অবহেলা করেছেন, আবার রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদের ব্যবহারও করেছেন। মৌখিক জবানে তাঁরা ছিলেন উদু‌র্ভাষী। বাংলা ভাষাকে ঘৃণা না করলেও অপছন্দ করতেন, অনৈসলামিক বলে মনে করতেন।

মোটা দাগে এ ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ব্যবহারিক পার্থক্যের ভিত্তিতে পশ্চিম পাকিস্তান (পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান) ও পূর্ববঙ্গ (পরে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত) নিয়ে পাকিস্তান ডোমিনিয়নের জন্ম, যা পরে ১৯৫৬ সালে নতুন সংবিধান রচনার মাধ্যমে ‘ইসলামিক স্টেট অব পাকিস্তান’ নামে চিহ্নিত হয়। অথচ পাকিস্তানে মুসলমান ছাড়াও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি একাধিক ধর্মবিশ্বাসী মানুষের বসবাস। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান হয়ে ওঠে একটি সম্প্রদায়বাদী রাষ্ট্র। অথচ পাকিস্তান এককথায় বহুভাষী, বহুজাতিক রাষ্ট্র। এসব কারণে একজন মার্কিন ইতিহাসবিদ পাকিস্তানকে ‘উদ্ভট রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি উদু‌র্কে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতে থাকে। ২৭ নভেম্বর (১৯৪৭) করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে গৃহীত এক প্রস্তাবে উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা (লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা) হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর ঢাকায় ছাত্রসমাজে জ্বলে ওঠে আগুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ৬ ডিসেম্বর (১৯৪৭) দুপুরে অনুষ্ঠিত বিশাল ছাত্রসভায় কিছুসংখ্যক শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীও যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে দু-একজন বক্তৃতাও করেন। যেমন আবুল কাসেম, মুনীর চৌধুরী, এ কে এম আহসান প্রমুখ। ছাত্রনেতারাও বক্তৃতা করেন। সভায় পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সভায় তখন প্রবল উত্তেজনা। উত্তেজিত ছাত্রদের একটি মিছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘উর্দুর জুলুম চলবে না’, ‘পাঞ্জাবিরাজ বরবাদ যাক’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে সচিবালয়ে উপস্থিত হয়।

সেখান থেকে মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনসহ একাধিক মন্ত্রীর বাসভবনের সামনে উত্তেজিত ছাত্রদের প্রতিবাদী স্লোগান, মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের আশ্বাসে ছাত্রদের স্থানত্যাগ এবং কুখ্যাত মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে চলে বিক্ষোভ প্রদর্শন। উল্লেখযোগ্য যে শিক্ষা কমিশনের বাংলা ভাষাবিরোধী প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় এই প্রথম সরকারি কর্মচারী অনেকে সভা ও মিছিল করে প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে আসে।

শিক্ষা সম্মেলনে গৃহীত ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব এবং সে সম্পর্কে একাধিক মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ছাত্রসমাজে যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, সে সম্পর্কে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর বিতর্কিত বিবৃতি ছাত্রদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। এভাবে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরেও রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক একটি প্রস্তাব পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আন্দোলন তৈরিতে উত্তেজক পরিস্থিতি বা সন্ধিক্ষণ সৃষ্টি করে। এমনটিই ছিল ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর বৈশিষ্ট্য।

আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক

Comments

comments