ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ | ১২ : ২৪ মিনিট

February 2nd, 2017

পাকিস্তান শিক্ষা কমিশনের উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে সুপারিশের পর সৃষ্টি হওয়া ভাষা-বিতর্কের বিষয়টি ঢাকার ছাত্রসমাজে প্রতিবাদ বিক্ষোভের জন্ম দেয়। সংগঠিত এ বিক্ষোভে শহর ঢাকার অধিকাংশ স্কুল, প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অংশগ্রহণ করে। তাদের ক্ষুব্ধ পদচারণা তথা মিছিল রমনার রাজপথে উত্তাপ ছড়ায়।

এই আন্দোলন তখনো পুরান ঢাকার যুব-জনমানসে জায়গা করে নিতে পারেনি, তাদের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। এর কারণ সরকার পক্ষের ভাষাবিষয়ক বিভ্রান্তিকর প্রচার, ক্ষমতাসীন মুসলিম লিগ দলের নেতাদের বক্তৃতা, বিবৃতি, সেই সঙ্গে ঢাকাই নবাববাড়ির উর্দুর পক্ষে প্রচার ও প্রভাব। তবে আরও একটি বিষয় কিছুটা হলেও কারণ হিসেবে বিবেচ্য: পুরান ঢাকার বাসিন্দা যাদের ‘ঢাকাইয়া’ নামে ডাকা হয়, তাদের কথ্য ভাষা ছিল বাংলা-উর্দুর মিশ্রণে একধরনের দোশলা ভাষা। তাই তাদের উর্দুর পক্ষে টানা সহজ হয়েছিল।

শিক্ষা কমিশনের একপেশে নীতি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বর্জন করার প্রতিক্রিয়ায় ইতিপূর্বে ছাত্রদের যে প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হয়, তা কিন্তু সীমাবদ্ধ ছিল উত্তর ঢাকা তথা বৃহত্তর রমনা এলাকায়। পুরান ঢাকায় বাংলা ভাষাবিরোধী প্রচারণার কারণে রক্ষণশীল চেতনার স্থানীয় যুবকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

তাদেরই কিছুসংখ্যক যুবক ৯ ডিসেম্বর (১৯৪৭) কয়েকটি বাস ও ট্রাকে চড়ে উর্দুর পক্ষে স্লোগান দিতে দিতে রমনা এলাকায় এসে পড়ে। তাদের হাতে লাঠি, লোহার রড ইত্যাদি হাতিয়ার। তারা পলাশী ব্যারাক এবং পার্শ্ববর্তী মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। পলাশী ব্যারাক তখন বেশ কিছুসংখ্যক মেডিকেল ছাত্রের আস্তানা। অন্যরা সলিমুল্লাহ হলে, কেউ কেউ ফজলুল হক হলে। মেডিকেল ছাত্রদের হোস্টেল তখনো তৈরি হয়নি।

ঢাকাই যুবাদের হামলার খবর দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে পলাশী ব্যারাকের সরকারি কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য ছাত্ররা আক্রান্তদের সহায়তায় এগিয়ে এলে রণে ভঙ্গ দেয় দুর্বৃত্ত দল। তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তবে পালানোর আগে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হোস্টেলের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করে।

ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে সচেতনতা ও সমর্থন বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রাঙ্গণে ঘটনার প্রতিবাদে ও প্রতিকার চেয়ে বিরাট ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বহুসংখ্যক স্থানীয় লোক অংশগ্রহণ করে। সভায় যথারীতি ঘটনার নিন্দা এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

সভা শেষে বিভিন্ন শিক্ষায়তন থেকে আসা ক্ষুব্ধ ছাত্রদের এবং উপস্থিত জনতার সম্মিলিত মিছিল মেডিকেল কলেজ, কার্জন হল পার হয়ে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদের বাসভবনে পৌঁছায়। মিছিল থেকে ঘটনার তদন্ত ও দুর্বৃত্তদের শাস্তি দাবি করা হয়। মন্ত্রীর আশ্বাসে তারা শেষ পর্যন্ত ফিরে যায়।

এ ঘটনা ছাত্র ও স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতেই শুধু সাহায্য করেনি, ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বাঁকফেরা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন ও ছাত্রজনতার সংহতির পক্ষে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শহরবাসীর মনে এমন ধারণা বাড়তে থাকে যে তাদের মাতৃভাষা আক্রমণের শিকার। আক্রমণ যেমন আসছে সরকারের তরফে এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে, তেমনি বাংলাবিরোধী মহল থেকে।

আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক

Comments

comments