ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ : ৩৮ মিনিট

bloodtelegramস্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা চালায় পাকিস্তান। আর তাতে গোপন সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত হেনরি কিসিঞ্জার ও প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। সে সময় ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের প্রধান আর্চার ব্লাড গণহত্যার বিবরণ দিয়ে একের পর এক টেলিগ্রাম পাঠান নিক্সন সরকারের কাছে। ঐসব টেলিগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানে জেনোসাইড বা গণহত্যা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সেগুলো পাত্তাই দেয়নি। তারা বরং সরাসরি অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে। সেই অস্ত্র দিয়েই নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা।

মার্কিন সাংবাদিক ও প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক গ্যারি জে ব্যাসের ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনোসাইড’ বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক জ্বলন্ত দলিল। ২০১৪ সালে এই বইটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নন-ফিকশন বইয়ে সবচেয়ে বড় পুরস্কার কানডিল পুরস্কার পান।  সাধারণত বইয়ের সাহিত্যমান, সমাজ ও শিক্ষাজীবনে এর গুরুত্বের বিষয়টি বিবেচনা করা পুরস্কারটি দেয়া হয়। সে বছর পুরস্কারের জন্য সারা বিশ্বের ৭৫টি প্রকাশনা সংস্থা থেকে ১৭৫টি বই জমা পড়ে। এর মধ্য থেকে দ্য ব্লাড টেলিগ্রামকে প্রথম পুরস্কারের জন্য বেছে নেন বিচারকরা।

২০ নভেম্বর ২০১৪ সন্ধ্যায় টরন্টোর একটি হোটেলে পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়। এই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করে কানাডার অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি।

পুরষ্কারটি পাওয়ার পরে  বইটির লেখক  গ্যারি জও ব্যাস জানান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ গণহত্যা হয়েছিলো, তার প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরির  লক্ষ্য নিয়েই বইটি লিখেছেন তিনি।  তিনি আরও জানান, এই পুরস্কার বইটির প্রতি আগ্রহ তৈরি করবে। আর ইতিহাসের গবেষক, পণ্ডিত ব্যক্তিদের আড়ালে চাপা পড়া বাংলাদেশের গণহত্যার ব্যাপারেও আগ্রহী করবে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সম্মানজনক পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক নেইল শিহান ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা এই বইটি নিয়ে লিখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এ। বইটি নিয়ে আলোচনা হলেও নেইল শিহানের এই লেখাটি ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ প্রকাশ করেছিল উপসম্পাদকীয় কলাম হিসেবে।

সে সময় নেইল শিহান তার কলামে বইটি সম্পর্ক লিখেন,  সাধারণ বিবেচনায় ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম  বইটি এক বিদেশি গবেষকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ হলেও এটি অন্য যে কোনো বইয়ের চেয়ে আলাদা। কারণ, সম্ভবত এই বইয়েই প্রথম কোনো পশ্চিমা গবেষক ১৯৭১ এ সংঘটিত বাংলাদেশের গণহত্যাকে ‘প্রমাণিত গণহত্যা’ হিসেবে বিশ্বের সামনে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

বইটিকে উদ্ধৃত করে তিনি জানান, এক সময়কার পূর্ব পাকিস্তান, যেটি পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, সেখানে ২৫ মার্চ রাতে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়। রাতের আধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ কোনো মানুষ এমনকি নারী-শিশুও সেনাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এরপর পরবর্তী নয় মাসে সুনির্দিষ্টভাবে কত সংখ্যক লোক গণহত্যার শিকার হয়েছে তার কোনো হিসাব দেননি গ্যারি জে ব্যাস। হাজার হাজার লোকের প্রাণহানির কথা লিখেছেন তিনি তাঁর বইতে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে দুই লাখ মানুষ নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে। এই নারকীয় গণহত্যা থেকে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন অন্তত এক কোটি মানুষ।

বইটিতে শুধু যুদ্ধকালীন সমীক্ষায় তুলে ধরা হয়নি। বরং ৬৯ এর গণঅভ্যুথান এবং ৭০ এর নির্বাচন প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় দেশ ভাগ হয় ধর্ম অনুসারে। ইসলাম ও হিন্দু। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে এক ধর্ম ছাড়া অন্য কোন বিষয়েই মিল ছিলো না। এটাকে সবচেয়ে বড় ভুল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্যারি জে ব্যাস তাঁর বইতে দাবি করেন,  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছে। আর সেই গণহত্যা চালিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা। সেই হত্যাকারীদের সব ধরনের সুবিধা নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি। শুধুই তাই নয়, বিষয়টি নিতান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন ব্যাপার, সেখানে বহির্বিশ্বের করণীয় কিছু নেই’ বলেও মার্কিন প্রশাসন থেকে সরাসরি জানিয়ে দেয়া হয়।

পাকিস্তানি গণহত্যা আর নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভূমিকার প্রামাণ্য দলিল খুঁজতে গ্যারি ব্যাস ছুটে গিয়েছেন দিল্লিতে, এসেছিলেন বাংলাদেশেও। দিনের পর দিন হোয়াইট হাউজের নানা গোপনীয় দলিল হাতড়ে উদ্ধার করেছেন সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, অডিও বার্তা, এমনকি বাংলাদেশের যুদ্ধ নিয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটির একান্ত সংলাপগুলোও। এ সময় কিসিঞ্জার ইন্দিরা গান্ধীকে ‘ডাইনি’ বলে উল্লেখ করেন। আর ভারতে  দুর্ভিক্ষ কামনা করেন। এসব বিষয় খুব স্পষ্টভাবেই বইটিতে তুলে এনেছেন তিনি।

গ্যারি জে ব্যাস  বর্তমানে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। দ্যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোষ্টসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই- দ্যা ব্লাড টেলিগ্রাম: ইন্ডিয়া’স সিক্রেটস ওয়ার ইন ইস্ট পাকিস্তান

আরও পড়ুন :
কানডিল পুরস্কার পেলেন থমাস লাকেরের ‘দ্য ওয়ার্ক অব দ্য ডেড’

Comments

comments