ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ | ০৯ : ০৪ মিনিট

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

যতটুকু মনে পড়ে, দিনটা ছিল শুক্রবার। ছুটি চলছে। তাই ইচ্ছেমতো ঘুমিয়ে সকাল দশটা-এগারোটায় উঠি। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করলাম, টিভি দেখলাম। দুইটার মধ্যেই গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেলাম। ছুটিতে কাটানো প্রতিদিনের মতোই আরাম করে শুয়ে একটা উপন্যাস পড়তে শুরু করলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল, আজ কী যেন একটা কাজ আছে। কাজটা মনে করার চেষ্টা করতে করতেই মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে আৎকে উঠি। ছত্রিশটা মিসড কল! আবারও কল আসে। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ও প্রান্ত থেকে উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেলো।
‘কোথায় তুমি? কতগুলো কল দিলাম। রিসিভ করছিলে না কেন!’
‘এইতো আমি বাসায়। আপনি কি পৌঁছে গিয়েছেন?’
‘না, তবে কাছেই এসে পড়েছি। আর দশ মিনিটের মতো লাগবে।’
‘আচ্ছা আমি বের হচ্ছি এখনি!’
ফোনটা রেখেই ঝটপট জামাটা বদলে নিয়ে নিজেকে পরিপাটি করে নিলাম। প্রথমবার দেখা করতে যাচ্ছি বলে কথা! একটু যে নার্ভাস ফিল হচ্ছিল না, তা নয়। মানুষটা একই সঙ্গে কবি, লেখক, মাসিক পত্রিকার সম্পাদক আরও কত কী কী যেন! অল্প বয়সের ছোট মাথায় অত কিছু ঢোকেনি আমার। এসএসসি দেয়া তিন মাসের বেকার ছাত্রী আমি। বই পড়তে প্রচণ্ড ভালোবাসি আর মন চাইলেই টুকটাক লেখালেখি করি। সেই সুবাদেই ফেসবুকে পরিচয় ওনার সঙ্গে। ওনার পত্রিকায় নিয়মিত লিখবার সুযোগ পাই যদি!

মানুষটার নাম ওলীউল্লাহ আহমেদ। গাম্ভীর্যতা যেন এই নামের মাঝেই লুকায়িত আছে! চ্যাটেও কম গম্ভীর নন তিনি। তাই বাস্তবে মানুষটা কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে কোনো উত্তেজনাই কাজ করছিল না আমার মাঝে। তার বয়স ত্রিশ। আর আমি মাত্র সতের বছরের কিশোরী। এই হিসেবে এমনিতেও তাকে নিয়ে কোনো আকর্ষণ থাকার কথা নয়। যাই হোক, তাকে খুঁজে পেতে বেশ ঝামেলাই পোহাতে হলো। ধানমন্ডি লেক তো আর ছোট জায়গা নয়!

বেশ ছোটকাল থেকেই ছেলেদের উৎপাতের কারণে মা -বাবা একা কোথাও একা যেতে দেন না। সেদিনও তাই মা সঙ্গে ছিল। আর বাবাকে এ কথা জানানোর সাহসই করিনি। তিনি চান মেয়ে ডাক্তার হবে। তাই এসব ছাইপাশ লিখে মেয়ে কিছু করতে পারবে না বলেই তার ধারণা। অথচ আমার কেন জানি লেখালেখি আর সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোই বেশি টানে!

একপাশে ওলীউল্লাহ সাহেব, আরেক পাশে মাকে রেখে আমি মাঝে বসলাম। ভার্চুয়াল জগতের ওলীউল্লাহ আহমেদের সঙ্গে আমার সামনে বসে থাকা মানুষটিকে মেলাতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল। সামনাসামনি তিনি অনেক বেশি প্রাণচঞ্চল আর রসিক একজন মানুষ। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছিলেন, না জানি আমাদের পরিচয় কত জনমের! আমার নিয়ে যাওয়া লেখাটি পড়ে ভালো মন্তব্য করলেন। আর ছোটখাটো ভুলগুলো হাসিমুখে বুঝিয়ে দিলেন। মাঝে মাঝে নিচু গলায় টুকটাক দুষ্টুমিও করছিলেন। সামনাসামনি কথা বলার পর এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম যে, আমাদের চিন্তা-ভাবনায় অকল্পনীয়ভাবে কতটা মিল রয়েছে! কথার ফাঁকে ফাঁকেই মায়ের চোখের অগোচরে আমাদের দৃষ্টি বিনিময় হচ্ছিল। তিনি আমার চোখে কী খুঁজছিলেন, জানা নেই। কিন্তু আমি যেন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার চোখে আমাকেই খুঁজছিলাম! সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। বিদায় নেবার সময় মাকে সালাম জানিয়ে আমার দিকে এক মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে অনেক বড় হতে হবে, জয়া।’সেদিনই মনে মনে পণ করেছিলাম, ‘আমাকে বড় হতেই হবে!’

বাসায় ফেরার দু’ঘণ্টা বাদে ফেসবুকে আসতেই তিনি মেসেজ দিলেন।
‘কী করছ?’
‘তেমন কিছু না। আপনি?’
‘আমি একটু টিএসসি যাচ্ছি।’
‘বাহ্! জানেন আমারও অনেক ইচ্ছে হয় সন্ধ্যায় টিএসসির মোড়ের দোকানে এক কাপ কড়া লিকারের চা খেতে। কিন্তু এ সমাজের নিয়মের শেকল যে বাঁধা আমার পা! তাই এ রকম ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো মনেই রয়ে যায়। বাস্তবে আর পূরণ হয় না!’
‘কী করবে বলো, এ সমাজই যে এমন! আচ্ছা একটা কথা বলি?’
‘বলুন’
‘তোমার চোখ দু’টো ভীষণ সুন্দর। এ চোখে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়।’
‘তো আপনি বুঝি হারিয়ে গিয়েছেন?’
‘জানি না ঠিক। কেমন যেন ওল্টপাল্ট লাগছে। গত পাঁচ-ছয় বছরেও এমন লাগেনি।’
‘ও কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে সব। সাবধানে যাবেন বাসায়। মা ডাকছে, বাই।’
‘বাই’
এভাবে আমাদের প্রতিদিনই চ্যাট হতে লাগল। কাজের কথার পাশাপাশি আমরা ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়েও টুকটাক আলোচনা করতে লাগলাম। নাম না জানা এক সম্পর্কে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম।
২.
অনেকদিন বাদে ফোনটা ভুলে বাসায় রেখে একটা দাওয়াতে চলে যাই। তার সঙ্গে এ কারণে কোনো যোগাযোগ হয়নি সারাদিন। রাতে বাসায় ফিরে অনলাইন হতেই দেখি তার শ’খানেক মেসেজ। আমাকে অনলাইনে দেখতেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি কল দিলেন। সেদিন রাতের তার সেই কান্নার কথা মনে পড়লে আজও আমার ভিতর অপরাধবোধ কাজ করে, কেন যে ফোনটা বাসায় রেখে গিয়েছিলাম! বাচ্চাদের মতো অভিমানী সুরে ফোনের ও প্রান্ত থেকে সে বলে, ‘সারাটাদিন আমাকে একটুও মনে পড়েনি, জয়া?’ এ কথা শুনে আমার চোখ থেকেও যে তখন দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েনি, তা নয়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আসল ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বলতেই চাপা অভিমান নিয়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘আর অমন করবে না কখনো। আমার অনেক কষ্ট হয় জানো!’

৩.
এক সপ্তাহ পর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার নাম করে তার সঙ্গে দেখা করলাম। সেদিনই সে শিমুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে শক্ত করে আমার হাত দু’টো ধরে বলেছিলো, ‘তোমাকে অনেক ভালোবাসি, জয়া। জানি তোমার এখনও অনেক বড় হতে হবে। তোমার জীবনে অনেক সময় বাকি আছে। বাকি পড়ে থাকা আমার জীবনের এই অল্প সময় নিয়ে তোমাকে চাওয়াটা হয়তো অন্যায় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোমাকে ছাড়া আমার এ জীবন একদমই অপূর্ণ রয়ে যাবে।’ এখনও স্পষ্ট মনে আছে তাকে জড়িয়ে ধরে শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিলাম, ‘তোমার এ জীবনের বাকি থাকা অল্প সময়টুকু আমার জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেবে?’

একটা অসমতার সম্পর্ককে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে স্বাভাবিকভাবেই অনেক কষ্ট করেছিলাম আমরা। এ সমাজ তো আবার ভালোবাসার চেয়ে সমতাই খোঁজে বেশি! তবুও, ভালোবাসার এ যুদ্ধে আমরা সমাজের কাছে হেরে যাইনি। আমি, কবি এবং আমাদের তিন বছরের মেয়ে জয়িতা ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে পেরেছি!

Comments

comments