ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ২০ মিনিট

image_143687_0আজ ৩ ডিসেম্বর। ঠাকুরগাঁও হানাদার মুক্ত দিবস।  ১৯৭১ সালের এ দিনে ঠাকুরগাঁও মহকুমা শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের জনগণ ওইদিন ভোরে ঠাকুরগাঁও শহরে প্রবেশ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে। শুরু হয় বিজয়ের উল্লাস।  ্এই বিজয় আনতে প্রাণ দিতে হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের ২৫ হাজার নারী-পুরুষকে। সম্ভ্রম হারায়েছে দুই হাজারও বেশি নারী।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুতে ২৭ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রথম শহীদ হন রিকশাচালক মোহাম্মদ আলী। পরদিন ২৮ মার্চ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করায় শিশু নরেশ চৌহানকে গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা।

২৯ মার্চ তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ঠাকুরগাঁওয়ের সুবেদার কাজিম উদ্দিন সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে হাবিলদার বদিউজ্জামানের সহায়তায় অস্ত্রাগারে হামলা চালানো হয়। অস্ত্র লুট করে তা বাঙালি সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বদিউজ্জামানের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ফলে ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার পুরোপুরি বাঙালিদের দখলে চলে আসে।

এ সময় ১০টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীকে ঠাকুরগাঁওয়ে ঢুকতে না দেওয়ার জন্য ২০টি জায়গা নির্ধারণ করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। ১০ এপ্রিল থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে অন্যান্য মহকুমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সৈয়দপুরে পাকিস্তানি সেনারা শক্ত ঘাঁটি করে এগিয়ে আসতে শুরু করে। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৩ এপ্রিল কন্ট্রোল রুম ও ২০টি প্রতিরোধ ক্যাম্প তুলে নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নেয় সংগ্রাম কমিটি। নেতারা শহর ছেড়ে চলে যান।

১৫ এপ্রিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায় ঠাকুরগাঁও। পাকিস্তানি সেনারা ১০টি ট্রাক ও আটটি জিপে করে মুহুর্মুহু সেল বর্ষণ করতে করতে ঠাকুরগাঁও শহরে ঢুকে পড়ে। পার্শ্ববর্তী পঞ্চগড় থানার তেঁতুলিয়াকে কেন্দ্র করে ১৫০ বর্গমাইলের একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে ওঠে। সেখানে হানাদার বাহিনী কখনো ঢুকতে পারেনি। আর ওই স্থান থেকেই পরিচালিত হয় চূড়ান্ত লড়াই। শুরু হয় হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট আর বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা।

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে পরিচিত ঠাকুরগাঁওয়ের ইসলামনগর থেকে ছাত্রনেতা আহাম্মদ আলীসহ সাতজনকে হানাদার বাহিনী ঠাকুরগাঁও ক্যাম্পে আটক করে রাখে। পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার পর তাঁদের লাশ শহরের টাঙ্গন ব্রিজের পশ্চিমপাশে গণকবর দেয়। এভাবে তারা রুহিয়া রামনাথ হাট, ফারাবাড়ী রোড, ভাতারমারী ফার্ম, ভোমরাদহ ও বালিয়াডাঙ্গী এলাকায় গণহত্যা চালায়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা ঘটে উপজেলার জাঠিভাঙ্গা এলাকায়। ২৩ এপ্রিল সেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা দুই হাজার ৬০০ নারী-পুরুষ ও শিশুকে পাথরাজ নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে। এদিনে জগন্নাথপুর, গড়েয়া শুখাপনপুকুরী এলাকার কয়েক হাজার মুক্তিকামী মানুষ ভারত অভিমুখে যাওয়ার সময় স্থানীয় রাজাকাররা তাদের আটক করে মিছিলের কথা বলে পুরুষদের লাইন করে পাথরাজ নদীর তীরে নিয়ে যায় এবং সেখানে নিয়ে গিয়ে হানাদাররা ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে তাদের।

দ্বিতীয় গণহত্যা চালানো হয় রানীশংকৈল উপজেলার খুনিয়াদীঘিরপাড়ে। মালদাইয়া বলে পরিচিত স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী হরিপুর ও রানীশংকৈল উপজেলার নিরীহ লোকজনকেও ধরে নিয়ে যেত ওই পুকুরের পাড়ে। সেখানে একটি শিমুলগাছের সঙ্গে হাতে-পায়ে লোহার পেরেক গেঁথে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে বর্বর নির্যাতন চালাত লোকজনের ওপর। তারপর লাইন করে দাঁড় করিয়ে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হতো তাদের। পরে এই পুকুর খুনিয়াদীঘি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ঠাকুরগাঁও ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। কমান্ডার ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার খাদেমুল বাশার। এ সেক্টরে প্রায় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিল। এর মধ্যে এক হাজার ইপিআর, ৭০০ আনসার, পুলিশ। সমগ্র সেক্টরে এক হাজার ১২০টির মতো গেরিলা ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। ৮ মের আগ পর্যন্ত সুবেদার কাজিম উদ্দিনের দায়িত্বে ছিলেন। ৯ মে ক্যাপ্টেন নজরুল, কাজিম উদ্দিনের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে স্কোয়াড্রন সদরুউদ্দিন ও ১৭ জুলাই ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার সাব-সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয় জুলাই মাসের প্রথম দিকে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা যোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। ব্রিজ ও কালভার্ট উড়িয়ে দেয় তারা। পাকিস্তানি বাহিনীর দালাল ও রাজাকারদের বাড়ি এবং ঘাঁটিতে হামলা চালায়।

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক অভিযান চালান। ২১ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় বালিয়াডাঙ্গী, পীরগঞ্জ, রানীশংকৈল ও হরিপুর থানা অঞ্চলে। এ যুদ্ধে বেশির ভাগ ফলাফল মুক্তিবাহিনীর অনুকূলে আসে।

মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানে পঞ্চগড় মুক্তিবাহিনীর দখলে এলে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। এর পর ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ আক্রমণ শুরু হয় ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে। রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনী নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে।

ভারতীয় মিত্রবাহিনী যাতে ঠাকুরগাঁও দখল করতে না পারে, সে জন্য পাকিস্তানি সেনারা ৩০ নভেম্বর ভূল্লি ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। তারা সালন্দর এলাকায় সর্বত্র, বিশেষ করে ইক্ষু খামারে মাইন পুঁতে রাখে। মিত্রবাহিনী ভূল্লি ব্রিজ সংস্কার করে ট্যাংক পারাপারের ব্যবস্থা করে। ১ ডিসেম্বর ভূল্লি ব্রিজ পার হলেও মিত্রবাহিনী যত্রতত্র মাইন থাকার কারণে ঠাকুরগাঁও শহরে ঢুকতে পারেনি। ওই সময় শত্রুদের মাইনে দুটি ট্যাংক ধ্বংস হয়ে যায়। এর পর এসএফ বাহিনীর কমান্ডার মাহাবুব আলমের নেতৃত্বে মাইন অপসারণ করে মিত্রবাহিনী ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে অগ্রসর হয়।

২ ডিসেম্বর সারা রাত গোলাগুলির পর শত্রুবাহিনী ঠাকুরগাঁও থেকে পিছু হটে। ৩ ডিসেম্বর ভোররাতে শত্রুমুক্ত হয় ঠাকুরগাঁও। ওই রাতেই মুক্তিবাহিনী ও সর্বস্তরের জনগণ মিছিলসহ ঠাকুরগাঁও শহরে প্রবেশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন। আর ঠাকুরগাঁও পাকহানাদার মুক্ত হয়। [লেখাটি সংগ্রহ]

Comments

comments