ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৩ : ১৮ মিনিট

কার্তিক মাসে জন্ম। তাই বাবা আনর আলী পাঠান আর মা অরিশা বিবি মেয়ের নাম রাখেন কার্তিকজান। খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে গেল তার। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি বউ হয়ে এলেন আমাদের বাড়ি। আর ৮৬ বছর বয়সে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে গেলেন অগ্রহায়ণের এক সকালে। ১৯৮৭ সাল। আমার তখন দশ বছর বয়স। কার্তিকজান ছিলেন আমার ছেলেবেলার সবচেয়ে কাছের খেলার সঙ্গী। তাকে আমি বুবু বলে ডাকতাম। আমার বেড়ে ওঠার পেছনে তার অবদান অনেক।
তুলতুলে শরীরটার ভেতর যেন সারাক্ষণ আমায় গুঁজে রাখতে চাইতেন। একান্ত একা সময়ে তার মায়ামাখা আদরটা এখনো খুঁজে বেড়াই! আমার বুবুর মুখে তখন কোনো দাঁত ছিল না। তবু শক্ত খাবার খেতে পারতেন। কানে একটু কম শুনতেন। তবে সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পেতেন। পান চিবিয়ে মুখটা সব সময় লাল করে রাখতেন। তার ঠোঁটরাঙা মুখটা ভোলার মত নয়। মাঝারি গড়ন, শ্যামল গায়ের বরণ। টানা টানা চোখ, নাক আর মুখ ছিল বুবুর। চেহারায় ছিল শান্ত নদীর মতো সরল অভিব্যক্তি।
খুব সাধারণ ছিলেন তিনি। লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু মানুষের সঙ্গে অনেক মায়া করে কথা বলতেন। শরীরে কোনো রাগ ছিল না। কারো সঙ্গে রাগ করে কথা বলেন নি কোনো দিন। কথা বলতেন নীচু স্বরে। তাতে অনেক মায়া জড়ানো থাকতো। তার কাছে গিয়ে কেউ খালি মুখে ফিরতে পারতেন না। এত সরল আর এত মায়াবি মানুষ আজকাল খুব একটা চোখে পড়ে না।
বুবু ছিলেন পুরান বাউশিয়া গ্রামের পাঠানবাড়ির মেয়ে। পাঠানরা আমাদের এলাকায় বেশ সম্ভ্রান্ত। তাদের জায়গা জমির অভাব ছিল না। জরিমন নামে বুবুর এক ছোট বোন ছিল। বড় ভাই মাদু পাঠান আর ছোট ভাই পা-ব পাঠান ছিলেন স্বচ্ছল কৃষক। বুবু বলতেন, তার তিন ভাই। তিনি আমার মাকে বলতেন, দেখো, আমার এই ভাই একদিন ভাটেশ্বর হবে! ভাটেশ্বরের আভিধানিক অর্থ কী, তা আজও কোথাও খুঁজে পেলাম না! দাঁত না থাকায় আমরা তার অনেক কথা ঠিকমতো বুঝতেও পারতাম না।
ছোটবেলায় বুবুর কাছে আমি তার বাবাবাড়ির গল্প শুনতে চাইতাম। বুবু বলতেন, ‘ব্রিটিশরা তার বাবার বাড়ির পাশে নীলকুঠি স্থাপন করেছিলেন। তাই লোকজন তাদের গ্রামটাকে বলতো কুঠিপাড়া। এই গ্রামের পুবে সাবের কুড়ায় ভিড়ত ইংরেজদের জাহাজ। সাবের কুড়ার এখন প্রাণ নেই। মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে এর তলদেশ। ইংরেজদের হাতি আর গাধা চলাচল করত পাঠানবাড়ির গোপাট ধরে। ঘোরার পিঠে চড়তেন ইংরেজ বণিকেরা।’
আমি যখন ঘুমাতে চাইতাম না, তখন বুবু প্রায়ই একটি কবিতা বলতেন। পান চিবুতে চিবুতে বুবু বলতেন-
‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই,
কুঁড়েঘরে থাকি করো শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা ’পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।’
কবিতাটি শুনে ভাবতাম, চড়–ইপাখিরা অট্টালিকা পাবে কোথায়? এরা তো থাকে আমাদের টিনের ঘরের চালের কোণে। বৃষ্টি এলে এদের বাসা ভিজে যায়, ভোগান্তির সীমা থাকে না। বাবুই পাখি অবশ্য থাকে আমাদের নারকেলগাছে। নারকেলগাছের ডালে তাদের ঝুলন্ত বাসা। সেই বাসায় তারা সারা দিন মহাসুখে বাতাসে দোল খায়। তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে দেখি বুবুর কাছ থেকে শোনা কবিতাটি আমাদের বাংলা বইয়ে, ‘স্বাধীনতার সুখ’ শিরোনামে। আমার বুবু তো কোনো দিন স্কুলে যাননি। মক্তবে পড়ার সময়েই তার বিয়ে হয়েছিল। তাহলে কার কাছে শুনেছিলেন রজনীকান্ত সেনের অমর এই কবিতাখানি?
বুবু আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন। কারো যেন নজর না লাগে, তাই কায়তনের সুতোয় ঘুঙুর বেঁধে আমার কোমরে লাগিয়ে দিতেন। হাঁটলে ঝনঝন আওয়াজ হতো। আমি একটু শুকিয়ে গেলেই বুবু বলতেন, কড়া বেড়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে আমার বুকের কড়া ওপরের দিকে ঠেলে দিতেন। কায়তনের সুতোয় কড়ি লাগিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিতেন। আমি দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলতাম। কড়ি না পেলে লাউয়ের বিচি ফুটো করে সুতোয় গেঁথে গলায় পরিয়ে দিতেন। আমি কামরাতে কামরাতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। ছেলেবেলায় দাঁত দিয়ে কামরানোর অভ্যাস ছিল। হাতের কাছে কিছু পেলেই কামড়াতে শুরু করতাম। তাই দাঁত দিয়ে নখ কাটার অভ্যাসটা বুঝি আমার এখনো রয়ে গেল।
তার নাতি-নাতনির সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবু তিনি আমার উপর একটি দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। বছরে অন্তত দুই ঈদে আমি যেন তার কবরে পানি দিই, আমার কাছে এটাই ছিল তার চাওয়া। ঈদের দিন সকালবেলা মা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বুবুর কথা মনে করিয়ে দিতেন। ঈদের জামাত শেষে লোকজন দলে দলে কবরস্থানের সামনে গিয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে। পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া স্মজনের জন্য কান্নাকাটি করে। ওই সময় সবার সামনে বুবুর কবরে পানি দিতে আমার খুব লজ্জা লাগত। ভাবতাম, লোকে কী ভাববে? এখন অবশ্য এই কাজটা আমি বেশ দায়িত্ব নিয়েই করি।
তবে একটা বিষয় নিয়ে আমি প্রায় দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি। বুবু চলে যাওয়ার সময় আমি খুব ছোট ছিলাম। তিনি যেখানে শায়িত, তার চারদিকে দেয়াল উঠেছে। ঝোপঝাড় আর গাছ কেটে ফেলায় দৃশ্যপটেরও বেশ পরিবর্তন হয়েছে। ফলে বুবুর কবরটি ঠিক কোথায়, তা বুঝে উঠতে পারি না। তবু আন্দাজ করে আমি একটা নির্দিষ্ট সীমানা ধরে পানি ছিটাই। আমি জানি না, আমার ছিটানো জলে তার আত্মা জুড়ায় কি না!
কার্তিকজান নামটাই যেন অপার্থিব। যেন মনুষ্য পৃথিবীর কেউ নন তিনি। বরং জীবনানন্দ দাশের ‘যে জীবন দোয়েলের, ফড়িংয়ের’ সে জীবনের কেউ। বুবুর কথা মনে হলেই মাথার ভেতর ঘুরপাক খায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার কয়েকটি লাইন হলো-
‘কার্তিকের ভোরবেলায় কবে
চোখে মুখে চুলের ওপরে
যে শিশির ঝরল তা
শালিখ ঝরাল ব’লে ঝরে।’
নির্লোভী মানুষ ছিলেন আমার ঠোঁটরাঙা বুবু। সব সময় কী যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। এই ঘোর কিংবা নির্মোহ থাকাও তো এক ধরণের সাধনা। তিনি মারফতি ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। অন্তরে বাউলিয়ানা লালন করতেন। ফকিরী গান শুনতে পছন্দ করতেন। ভবেরচর গ্রামের ফকির আশ্রাব আলী সিকদারের মুরিদ ছিলেন। লোকদেখানো নামাজ-রোজা তিনি করতেন না। তিনি প্রায়ই বলতেন-
‘নামাজ পড়ো, রোজা করো,
স্বর্গে যাইবার আসে
খোদায় যারে স্বর্গে নিব,
খোদার মনে মনেই আছে।’
বুবু ছিলেন বারো সন্তানের মা। সন্তান জন্ম দিতে দিতে কেটে গেছে জীবনের অনেক সময়। তার নয় সন্তানই অকালে মারা যায়। তাই তার দুঃখ-কষ্টের শেষ ছিল না। সে সময় গ্রামে ডাক্তার ছিল না। গর্ভবতী মা ও শিশুরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতো। সন্তান হারানোর বেদনা থেকেই তিনি হয়তো শেষ জীবনে দাইমা হয়ে উঠেছিলেন। গর্ভকালীন সময়ে নারীদের নানা রকম সমস্যায় তিনি পাটের পাতা ও তেল পড়া দিতেন।
বুবু সারা জীবন মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। প্রসবের আগে মানুষ অসহায় অবস্থায় বুবুর কাছে আসতেন। এই সব কাজে তিনি সঙ্গে সঙ্গে চলে যেতেন। যেনো আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতেন তিনি। বুবু গেলেই নাকি অনেক জটিল সমস্যারও সমাধান হয়ে যেত। বুবু এই সেবা দিয়ে কারো কাছ থেকে কোনো টাকা পয়সা নিতেন না। তাই সন্তান জন্মের পর লোকজন খুশী হয়ে তার জন্য কাপড় ও মিস্টি নিয়ে আসতেন। কারো জন্য কিছু করতে পারলে তিনিও খুব খুশী হতেন। খুশীতে তার চোখ ঝলঝল কওে উঠতো। সে সময় সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা ছিল না। তাহলে কি ব্যবস্থায় তিনি সহজেই এত কঠিন সমস্যার সমাধান করতেন, এখনো তা আমার মাথায় আসে না।
লোকমুখে শোনা যেত তার নানা রকম আধ্যাত্মিক গুণের কথা। অসুখে-বিসুখে আর বিপদ-আপদে পড়ে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ তার কাছে আসতেন। বুবুর দেওয়া গাছের ছাল, বাকল, লতাপাতা, শেকড় আর পড়া পানিতে লোকজন আরোগ্য লাভ করতেন। মা প্রায়ই কৌতূহলী হয়ে অনেকের কাছে জানতে চাইতেন, আপনারা কি কোনো উপকার পান? রোগীরা বলতেন, না পেলে কি আর এত দূর কষ্ট করে আসি?
বুবুর একটিমাত্র ছবি আছে আমার কাছে। বড় মামা সাদাকালো ফিল্মে ছবিটি তুলেছিলেন। ছবিটির বেশির ভাগ অংশে রং উঠে গেছে। তবু এই ছবিটিই এখন আমার একমাত্র সম্বল। মৃত্যুর মাস খানেক আগে, সম্ভবত কার্তিক মাসের শুরুতে, বুবু একদিন বললেন, ‘আমার সময় বোধ হয় শেষ হয়ে এসেছে। অনেক বছর থাকলাম এই পৃথিবীতে। যেতে ইচ্ছে করে না। পৃথিবীটা হল একটা মায়ার খেলা।’ আরো কিছু বলেছিলেন, মনে করতে পারি না।
অগ্রহায়ণের ভোর। বেশ শীত পড়েছে। কুয়াশায় ঢাকা সমস্ত প্রকৃতি। মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের আযান। আযানের শব্দে আমার মায়ের ঘুম ভাঙ্গে। মা ঘুম থেকে উঠে দেখেন বুবুর চোখ-মুখ বন্ধ। সমগ্র শরীর খিঁচুনি দিচ্ছে। আমার বাবা ‘মা’ বলে চিৎকার করে উঠলে এক পলক চোখ মেলে তাকান। পরক্ষণেই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়। টানা ছয় দিন কথা বলা বন্ধ ছিল তার। এরপর আর কখনো চোখ মেলেন তাকান নি কার্তিকজান।

সাহাদাত পারভেজ : লেখক,  গবেষক ও আলোকচিত্রী

Comments

comments