ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৭ : ৩৮ মিনিট

চর  পরিদশর্ন। ছবি : সংগৃহীত

চর পরিদশর্ন। ছবি : সংগৃহীত

১৮৬৫ সালে মুন্সীগঞ্জের এসডিও হিসেবে যোগ দেন আর্থার লয়েড ক্লে। এক বছরের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে তিনি ঢাকার জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন তিনি। শেতাঙ্গ সিভিলিয়ান হিসেবে এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত্ম সহানুভূতিশীল। প্রতিদিন লিখতেন রোজনামচা। ছবিও আঁকতেন দুর্দান্ত্ম। ১৮৯৬ সালে লন্ডনের প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকমিলান প্রকাশ করে তাঁর লেখা বই ‘লিভস ফ্রম এ ডায়েরি ইন লোয়ার বেঙ্গল’। বইয়ের অষ্টম অধ্যায়টি ঢাকাসম্পর্কিত। সেই অংশটি অনুবাদ করেন সাংবাদিক ফওজুল করীম। সেই অনুবাদিত অংশ নিয়ে ঢাকা নগর জাদুঘর ১৯৯০ সালে প্রকাশ করে ‘ঢাকা: ক্লের ডায়েরি’ শিরোনামে একটি বই। ক্লের লেখা সেই ডায়েরিতে উঠে আসে কালীপুর গ্রামের তত্কালীন সামাজিক চিত্র।

১৮৬৫ সালের ২২ মে ক্লে একটা চিঠি পেলেন। তিনি তখন মাদারীপুরের এসডিও। বয়সে খুবই তরম্নণ। ভেবেছিলেন প্রমোশন। কিন্তু না, বদলির আদেশ। তাঁকে মুন্সীগঞ্জের এসডিও করা হয়েছে। ২৯ জুন কুমিলস্না ছাড়লেন ক্লে। ২ জুলাই সকালে দূর থেকে তাঁর নজরে আসে ঢাকা। নদী থেকে দেখলে শহরটিকে সুন্দরই লাগে। মুন্সীগঞ্জে দেশি এসডিও থেকে চার্জ বুঝে নিয়ে কয়েক দিন ঢাকায় কাটিয়ে ক্লে ফিরে এলেন মুন্সীগঞ্জে। ওই দিনই সরকারি চিঠিতে জানতে পারলেন, তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেটের পুরো ড়্গমতা দেওয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে তিনিই ছিলেন একমাত্র সিভিলিয়ান। তাই স্বাভাবিক কারণেই তাঁর সামাজিক জীবনে একঘেয়েমি তৈরি হয়। তাঁর বন্ধু গ্রেগ থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। মুন্সীগঞ্জের নিঃসঙ্গতা ও বিষাদময় পরিবেশে ক্লে আক্রান্ত্ম হলেন ডিসেন্ট্রিতে। এরপর এল দুর্গাপূজা। ঢাকায় পূজার ছুটি কাটালেন ক্লে। ছুটির পর তিনি ফিরে এলেন কর্মস্থল মুন্সীগঞ্জে।

বর্ষাকালে ঢাকা শহরের পরিবেশ কেমন গুমোট হয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে। বর্ষা কেটে গেছে, এখন প্রসন্ন আবহাওয়া। মেঘনার পূর্ব দিকে ত্রিপুরা, দাউদকান্দির উত্তর-পশ্চিমের জায়গাটি এই সময়ে শিকারের জন্য বিখ্যাত। কালেক্টর নেভিল ক্লেকে জায়গাটির খোঁজখবর নিতে বললেন। ক্লের ছিল শিকারের নেশা। একদিন কাচারি না থাকায় খুব সকালে বেরিয়ে পড়লেন ক্লে। নদী পেরিয়ে পৌঁছলেন কালীপুরে। তীরটি বেশ উঁচু। প্রশস্ত ময়দান ধানে ঢাকা, পাশে জঙ্গল। ধান কাটার পর ঘোড়ায় চড়ার জন্য জায়গাটি উপযোগী হয়ে উঠবে। খোঁজ নিয়ে আর পরিবেশ দেখে বুঝলেন, খুব সহজেই এখানে শিকার পাওয়া যাবে। সব কিছু ঠিকঠাক দেখে এলেন ক্লে।

ইংরেজ সাহেবদের প্রধান বিনোদন ছিল পিগস্টিকিং বা বরাহ শিকার। বন্দুক দিয়ে গুলি করে মারায় কোনো উত্তেজনা নেই, যতটা আছে খুঁচিয়ে মারার মধ্যে। সুতরাং শিকারে যাবার সময় সিভিলিয়ানরা ঘোড়ায় চাপতেন। ঘোড়া চালনায় তাঁদের দড়্গ হতে হতো। তাঁদের হাতে থাকত বর্শা। প্রথমে বনের ভেতর ছেড়ে দেওয়া হতো কুকুর। কুকুরের দল বন্য বরাহকে ড়্গেপিয়ে তুলত। ঝোপঝাপ থেকে বরাহ বেরম্নলেই শিকারিরা ছুড়তেন বর্শা।

ঢাকায় তখন মহকুমা ছিল দুটি। মুন্সীগঞ্জ আর মানিকগঞ্জ। সেখানে এসডিওরাই সর্বেসর্বা। সরকারের প্রধান আয়ের উত্স জমি। নদীভাঙনে কখনো চর জেগে ওঠে, আবার কখনো নদীতে জমি চলে যায়। নতুন চর জেগে উঠলেই দখল নিয়ে বিবাদ শুরম্ন হয়ে যায়। এ রকম এক বিবাদ মেটাতে একবার সেই চরে গিয়ে হাজির হলেন ক্লে। তিনি সেই চর পরিদর্শনের সময় একটি ছবিও আঁকেন। ছবিটি প্রান্ত্মিক এলাকার সেই সময়ের একটি সামাজিক চিত্র আমাদের সামনে হাজির করে দেয়। কালেক্টররা মাঝেমধ্যেই চরে যেতেন। চরে যাওয়া মানেই বরাহ শিকারের সুযোগ। বর্ষার শেষে শুরম্ন হতো শিকার মৌসুম। আর শেষ হতো জুন মাসে।

এরই মধ্যে ঢাকায় ঘোড়দৌড় দেখতে গেলেন ক্লে। ঘোড়দৌড়ের পর ক্রিসমাসের ছুটি। এ সময় ঠিক হলো, বরাহ শিকারের জন্য তারা যাবেন কালীপুরে। তাদের দলে ছিলেন লিয়ন, গ্রেগ, রেজিমেন্টের সাব-অলটার্ন ডসন ও পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা স্ট্রিটফোর্ড। ফোর্ট ছিলেন উত্সাহী শিকারি। দুটি বজরা করে রওনা হলেন তারা। রান্নাবান্নার সরঞ্জাম ও ভৃত্যদের নেওয়ার জন্য নেওয়া হলো আরেকটি বজরা। তাদের ঘোড়া আগেই পৌঁছে গিয়েছিল কালীপুরে। দুটি হাতিও রাখা ছিল তাদের সেবায়। নববর্ষের দিনে শিকারে কাটান তারা। শিকার পেলেন বেশ কয়েকটি বরাহ।

মুন্সীগঞ্জে ক্লে ছিলেন এক বছরের একটু কম সময়। খুশিমনেই ছিলেন তিনি। তবে গুজব শুনেছিলেন তার পদোন্নতি হবে। একদিন সকালে পেলেন প্রত্যাশিত সেই খাম। তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ঢাকার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কাজ করার জন্য। ১৮৬৬ সালের ৯ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে তিনি প্রথমে গেলেন নারায়ণগঞ্জে। সেখানে গ্রেগ তাকে সংবর্ধনা জানালেন। পর দিন তিনি ঢাকায় পৌঁছালেন। তার স্থলে আসলেন মি. লিওন। ১৩ মে আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের জন্য কালেক্টর ক্লেকে নিয়ে গেলেন ঢাকার ধনাঢ্য জমিদার খাজা আবদুল গনির বাসায়।

রানির ২৪তম জন্মদিন উপলড়্গে ঢাকার কমিশনার সিটি বাকল্যান্ড তার বাসায় এক ভোজসভার আয়োজন করেন। কমিশনারের ডিনারের দাওয়াতে সব সিভিলিয়ান উপস্থিত হলেন। ঢাকায় খুব হইচই করে পালন করা হলো রানির জন্মদিন। জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে বরাহ শিকার করতে সবাই দল বেঁধে আসেন কালীপুরে। এটা ছিল কালীপুরে বরাহনিধন ক্রীড়ার দ্বিতীয় আয়োজন। শিকারে যোগ দিতে ক্লের সঙ্গে আসেন ঢাকা কলেজের অধ্যাপক এম ও স্ট্রিটফোর্ট। মুন্সীগঞ্জ থেকে এলেন লিওনও।

Comments

comments