ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ১২ : ৪২ মিনিট

October 23rd, 2016

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

তেওতা জমিদার বাড়ি। দেশের পুরাকীর্তি স্থাপনার মধ্যে অন্যতম। এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটা এখন  শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ঢাকা থেকে আরিচার দূরত্ব ৯০ কিঃ মিঃ। ৩ ঘন্টায় বাসে চড়ে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর কূলঘেঁষা সবুজ-শ্যামল গাছপালায় ঢাকা তেওতা গ্রামের তেওতা জামিদার বাড়ি। জমিদার শ্যামশংকর রায়ের প্রতিষ্ঠিত নবরত্ন মঠটিও ঐতিহাসিক। অনেকদূর থেকেই দেখা যেত শ্বেতশুভ্র নবরত্ন মঠ। এক সময়ে জমিদারের বাড়ির আঙিনার এই মঠকে ঘিরে দোলপূজা আর দুর্গাপূজার রঙিন উৎসব পালিত হতো। আরও আছে এই গ্রামের মেয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী আশালতা সেন বা প্রমীলা দেবী। তার সঙ্গে প্রেম, নজরুলের আত্মগোপনসহ নানা স্মৃতি বিজড়িত এই জমিদার বাড়ী।

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

জমিদার বাড়ী ইতিহাস

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তেওতা জমিদার বাড়িটির বয়স ৩০০ বছর ছাড়িয়েছে। জেলার ইতিহাস থেকে জানা গেছে, ১৭৪০ সালের শুরুতে পাচুসেন নামের পিতৃহীন দরিদ্র এক কিশোর তার সততা আর চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে বিপুল ধন সম্পদ অর্জন করেন। দরিদ্র পাচুসেন দিনাজপুরের জয়গঞ্জে জমিদারী কিনে হয়ে যান পঞ্চানন সেন।তারপর শিবালয়ের তেওতায় তিনি এই জমিদার বাড়িটি তৈরি করেন। জমিদার বাড়ির মূল ভবনের উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেমশংকর এস্টেট এবং দক্ষিন দিকের ভবনগুলো নিয়েছিল জয়শংকর এস্টেট। প্রতিটি এস্টেটের সামনে বর্গাকৃতির অট্টালিকার মাঝখানে আছে নাটমন্দির। পূর্বে দিকের লালদিঘী বাড়িটি ছিল জমিদারদের অন্দর মহল। অন্দর মহলের সামনে দুটি শানবাঁধানো ঘাটলা, এর দক্ষিন পাশের ভবনের নীচে রয়েছে চোরা কুঠুরী যাকে এলাকার মানুষেরা বলে অন্ধকুপ। উত্তর ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৪ তলা বিশিষ্ট ৭৫ ফুট উচ্চতার নবরত্ন মঠ। এর ১ম ও ২য় তলার চারদিকে আছে ৪টি মঠ। তেওতা জমিদার বাড়িটি ৭.৩৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়িটি নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য একটি স্থান। এখানে নজরুলের বেশ কিছু স্মৃতি খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই বাড়িটিকে সংরক্ষণ করে এর হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা দরকার।বাড়িটি দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক পযর্টন আসে আরিচার শিবালয়ে এর অবস্থান।

কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত
জমিদারবাড়ী ঠিক পাশেই ছিল প্রমীলা দেবীর বাড়ি। বাবা বসন্তকুমার সেন আর মা গিরিবালা সেন মেয়ে প্রমীলা দেবী। কবি জমিদার কিরণশঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে অতিথি হয়ে আসেন সেই জমিদার বাড়ীতে। সেই সময়ে দেখা হয় প্রমীলা দেবীর সঙ্গে। জমিদার কিরণ শঙ্কর রায়ের স্নেহধন্য ছিলেন প্রমীলা। বেড়াতে আসার পর নজরুল জমিদার বাড়ীতে প্রতিরাতে গান-বাজনার আসর বসাতেন। সেই আসরের একমাত্র গায়ক ছিলেন নজরুল ইসলাম।১২ বছরের ছোট দুলি নজরুল গানের ফাঁকে ফাঁকে পান তুলে দিতেন। দুলির তখন ছিল সেই আসরে কবিতে পান তুলে দেওয়ার দায়িত্ব। তারপর প্রমীলা দেবীর বাবার ভ্রাতুষপুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে কবির পরিচয় সুত্রধরে প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। এই আসা যাওয়ার সূত্রধরে প্রমীলা দেবী যার ডাকনাম দুলী তাৎর  সঙ্গে নজরুল জড়িয়ে পড়েন প্রেমে। প্রমীলা নজরুলকে কবিদা বলে ডাকতেন। এক সময়ে দুলি  জমিদার বাড়ির পুকুরে গোসল করতে গেলে কবি তার রূপ মুগ্ধ হয়ে লিখলেন :

তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সে কী মোর অপরাধ’

অথবা

মোর প্রিয়া হবে
এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল’

কবির বিয়ে
পরবর্তীতে কুমিল্লায় আবার দু’জনের দেখা হয়। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে প্রমীলা চলে যান কুমিল্লায় কাকা ইন্দ্রকুমার সেনের কাছে। এদিকে বন্ধু আলী আকবরের সঙ্গে নজরুল বেড়াতে আসেন কুমিল্লায়। আলী আকবরদের দৌলতপুরের বাড়িতে যাওয়ার পথে পূর্ব পরিচিত ইন্দ্রকুমারের বাড়িতে নজরুলকে নিয়ে যায় আলী আকবর। এখানেই আবার নজরুলের সঙ্গে প্রমীলার দেখা হয় বলে রফিকুল ইসলামের দাবি। পরবর্তীতে বিয়ের রাতেই নার্গিসদের বাড়ি থেকে চলে এসে নজরুল অসুস্থ অবস্থায় আশ্রয় নেয় ইন্দ্রকুমারের বাড়িতে। এখানে বেশ কিছুদিন থাকার সময় প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের গভীর প্রেশের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং পরবর্তীতে বিয়ে করেন।

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বিয়ের পর তেওতা জামিদার বাড়িতে আবার
কবি এখানে কেন এসেছিলেন এই নিয়ে অনেক তর্ক বির্তক আছে। তবে স্থানীয় জনমতে, ১৯২২ সালে সালে প্রমীলার সঙ্গে তিনি এসেছিলেন তার কথায় সবাই একমত। সেই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে  ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশ হলে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। প্রমীলাকে নিয়ে তেওতা গ্রামে আত্মগোপন করেন নজরুল। আত্মগোপনে থাকতে আসলেও দুরন্ত নজরুল অবশ্য ঘরের কোনে বসে থাকেননি। যমুনার ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা সবুজ শ্যামল পাখিডাকা তেওতা গ্রামে ছুটে বেরিয়েছেন। ঝাঁকড়া চুল আর মায়াবী চোখের নজরুল গান, কবিতা আর অট্টহাসিতে পুরো গ্রামের মানুষকে আনন্দে মাতিয়েছেন। কখন ও বা জমিদার বাড়ির শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে রাতের বেলায় করুণ সুরে বাঁশি বাজিয়ে বিমোহিত করেছে রাতজাগা গ্রামের মানুষকে।

সেখানে কবি লিচু চোর কবিতাটি লিখেন। তেওতার জমিদারদের স্থানীয়ভাবে ডাকা গতো বাবু বলে। তাদের বিশাল পুকুর ঘিরে তালগাছ থাকায় বলা হতো তালপুকুর। প্রাচীর ডিঙিয়ে এই পুকুর পাড়ের গাছ থেকে একটি বালক লিচু চুরি করতে গিয়ে মালি ও কুকুরের তাড়া খাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে নজরুল এই কবিতাটি রচনা করা হয়েছে বলে রফিকুল ইসলাম তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তেওতা গ্রামের পাশ দিয়ে যমুনা নদীর স্মৃতিতে বেশ কিছু গান ও কবিতা লিখেছেন। যেমন : নীল শাড়ি পরে নীল যমুনায় কে যায়. কেন প্রেম যমুনা আজি হলো অধীর, আজি দোল ফাগুনে দোল লেগেছে..বৃন্দাবনে প্রেম যমুনায়, যমুনা কূলে মধুর মধুর মুরলী সখি বাজিল, যমুনা সিনানে চলে তীরে মরাল,  চাঁপা রঙের শাড়ি আমার যমুনা নীর ভরণে গেল ভিজে।

নজরুল তার ‘‘ছোট হিটলার’’ কবিতাতেও তেওতা গ্রামের কথা স্মরণ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের মাইলাই গ্রামটি কামানের গোলায় বিরাণভূমিতে পরিণত হয়।এছাড়া নারী কবিতাও এখানে রচনা করেন।

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বর্তমান অবস্থান

মানিকগঞ্জ উপজেলাধীন শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়িটি বাবু হেমশংকর রায় চৌধুরী, বাবু জয় শংকর রায় চৌধুরী পিং দুই সহোদর ভ্রাতার নিজ বসতবাড়ী ছিল। তেওতা অবস্থান করে তারা জমিদারি পরিচালনা করতেন। এই জমিদার বাড়ির মোট ৫৫ টি কক্ষ এখন জরাজীর্ন অবস্থায় আছে এবং ৫৬ টি নদীভাঙ্গা পরিবার অবৈধভাবে বসবাস করছে।

কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে আরিচার দূরত্ব ৯০ কিঃ মিঃ। ৩ ঘন্টায় বাসে যেতে ভাড়া দিতে হবে ৬০-৮০ টাকা। গাবতলী থেকে যাত্রীসেবা, বিআরটিসি, পদ্মা লাইন,ইত্যাদি বাসে আরিচা ঘাট যেতে হবে।আরিচা ঘাট থেকে রিকশায় ১৫-২০টাকা ভাড়ায় যাওয়া যাবে তেওতা জমিদার বাড়ি।

তথ্যসূত্র : মানিকগঞ্জ জেলা ওয়েবসাইট
দৈনিক সংগ্রাম, ডেইলি স্টার

Comments

comments