ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ০৮ : ১৬ মিনিট

তিন বিজ্ঞানী জাঁ পিয়ের সভেজ, স্যার ফ্রেশার স্টডডার্ট ও বার্নাড ফেরিঙ্গা।

তিন বিজ্ঞানী জাঁ পিয়ের সভেজ, স্যার ফ্রেশার স্টডডার্ট ও বার্নাড ফেরিঙ্গা।

যন্ত্র কত ছোট হতে পারে? মানুষের একটি চুলের চেয়েও হাজারো ভাগ সরু? এমন ভাবনা বিজ্ঞানী মহলে দীর্ঘদিনের। সেই আণবিক বা সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম যন্ত্রের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর রসায়নে নোবেল পেয়েছেন ইউরোপের তিন বিজ্ঞানী জাঁ পিয়ের সভেজ, স্যার ফ্রেশার স্টডডার্ট ও বার্নাড ফেরিঙ্গা।

এই ক্ষুদ্রতম যন্ত্র নিজের আকৃতির চেয়ে বহুগুণ বড় বস্তু সরাতে বা নাড়াতে পারে। এমনকি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চালিকাশক্তি হিসেবেও এই যন্ত্রের গুরুত্ব রয়েছে। রোবট হিসেবে মানবদেহের মধ্যে প্রবেশ করে নির্ধারিত স্থানে ওষুধ প্রয়োগ করতে পারে। শরীরের ক্যানসার কোষেও ওষুধ প্রয়োগে সক্ষম এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যন্ত্র।

জাঁ পিয়ের সভেজ ফ্রান্সের বাসিন্দা। জন্ম ১৯৪৪ সালে। তিনি দেশটির স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। এ ছাড়া তিনি ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের ইমেরিটাস গবেষক। তিনি সূর্যরশ্মি ব্যবহার করে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর কাজ করে আসছেন। মূলত তাঁর গবেষণাই ক্ষুদ্রতম যন্ত্রের বিষয়ে অনুসন্ধানে গতি সঞ্চার করে। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি ও তাঁর গবেষক দল ক্ষুদ্রতম যন্ত্র উদ্ভাবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

স্যার ফ্রেজার স্টডডার্টের জন্ম যুক্তরাজ্যে ১৯৪২ সালে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ফেরিঙ্গা নেদারল্যান্ডসের বাসিন্দা। জন্ম ১৯৫১ সালে। তিনি দেশটির গ্রোনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজ করেন। ১৯৯৯ সালে আণবিক মোটর তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১১ সালে তাঁর নেতৃত্বে একদল গবেষক চার চাকার ন্যানো গাড়ি তৈরি করেন।

দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মলিকুলার মেশিনস বা আণবিক যন্ত্রের নকশা ও সংশ্লেষে অবদান রাখায় তিন বিজ্ঞানী এই পুরস্কার পাচ্ছেন। এই আণবিক যন্ত্র নিয়ন্ত্রণযোগ্য, ন্যানোমিটার আকৃতির কাঠামো যা রাসায়নিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তি ও গতিতে রূপ দিতে পারে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রসায়নবিদেরা সুইচ থেকে শুরু করে আণবিক যন্ত্র তৈরি করতে পারেন।

পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য গোরান হ্যানসন বলেন, এই বছরের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম যন্ত্রের জন্য। এই আবিষ্কার কোথায় নিয়ে যাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আকাশই হলো সীমানা।

১৮৩০-এর দশক। উইলিয়াম স্টুর্জেন, জোসেফ হেনরি, আনয়োস জেডলিক, মাইকেল ফ্যারাডে তড়িৎ আর চুম্বক নিয়ে নানা কাজ করছিলেন সেই সময়। সেই কাজের সূত্রেই তৈরি হল প্রথম তড়িৎচালিত মোটর। প্রথমে এটিকে শুধু বিজ্ঞানের একটি পরীক্ষা বলেই দেখা হত। বোঝা যায়নি এর অনন্ত সম্ভাবনার কথা। প্রায় ১৮০ বছর পরে সেই মোটর দুনিয়াকেই পাল্টে গিয়েছে। ফ্যান থেকে ফ্রিজে— মোটরের বহুল ব্যবহার বুঝিয়ে দিয়েছে সেই আবিষ্কারের গুরুত্ব। নোবেল কমিটির মতে, এক দিন জঁ পিয়ের সভাজ, ফ্রাসের স্টোডডার্ট এবং বার্নার্ড ফেরিঙ্গা-র কাজও একই ভাবে সমাদৃত হবে। এঁরা আণবিক স্তরে অণুকে সচল করে নানা কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। তৈরি করেছেন নানা আণবিক যন্ত্র। ২০১৬-এর রসায়নে নোবেল পুরস্কার হিসেবে সাত লক্ষ ১৮ হাজার ডলার তিন জনের মধ্যে সমান ভাবে ভাগ হয়ে যাবে। সভাজ ফ্রান্সের নাগরিক। স্টোডডার্ট এবং ফেরিঙ্গা যথাক্রমে আমেরিকা এবং নেদারল্যান্ডের বাসিন্দা।এ বছরের নোবেলজয়ীরা বিভিন্ন অণুকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে আণুবীক্ষণিক মোটর থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত তৈরি করতে সফল হয়েছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষুদ্রাকার পেশি তৈরি করা সম্ভব।

পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞানী ফেরিঙ্গা বলেন, ‘এর অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। চিন্তা করুন আগামী দিনে চিকিৎসক একটি ক্ষুদ্র রোবটকে আপনার শরীরে রক্তে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে। সেটি আপনার দেহের ক্যানসার কোষের সন্ধান করছে এবং সেখানে ওষুধ প্রয়োগ করছে।’

পুরস্কার হিসেবে তিন বিজ্ঞানী পাচ্ছেন ৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার বা ৯ লাখ ২৮ হাজার ৯০৪ মার্কিন ডলার। তাঁদের বিশ্বের ক্ষুদ্রতম যন্ত্রের উদ্ভাবক হিসেবে বর্ণনা করে নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তাঁদের গবেষণা রসায়নশাস্ত্রকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

 

Comments

comments