ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ : ৩৬ মিনিট

firoza_begum_3500কিংবদন্তি শিল্পী ফিরোজা বেগমের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৯ সেপ্টেম্বর। তিনি ১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই ফরিদপুরে। বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী। মা কওকাবন্নেসা বেগমও ছিলেন সংগীতানুরাগী ও সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারিণী। কি স্কুল, কি কলেজে—প্রথম বাদে দ্বিতীয় হওয়ার অভিজ্ঞতা খুব কমই হয়েছে তাঁর জীবনে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গান গেয়ে সাড়া ফেলেছিলেন ফিরোজা। খুব অল্প বয়সে নামজাদা গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে তাঁর রেকর্ড প্রকাশ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

পেয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের দুর্লভ সান্নিধ্য। স্বয়ং জাতীয় কবির কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন। নয় বা দশ বছর বয়সে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ।

অল ইন্ডিয়া রেডিওর সুনীল বোস একটা অনুষ্ঠানে ফিরোজা বেগমের গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর আগ্রহেই ছোট্ট ফিরোজাকে এইচএমভিতে অডিশন দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ঘিয়ে রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমার প্রধান প্রশিক্ষককে দেখলেন তিনি। নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গেই গান ধরলেন, ‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা…’।

প্রধান প্রশিক্ষক বললেন, ‘এতটুকু মেয়ে। এই গান তুমি কোথায় শিখলে!’ ফিরোজা বেগম তখনো জানেন না, এই মানুষটাই কাজী নজরুল ইসলাম। সেদিন কমল দাশগুপ্তের সঙ্গেও প্রথম দেখা হয় তাঁর। কমল তখন ২৫-২৬ বছরের তরুণ। পরে এই মানুষটিরই সহধর্মিণী হন ফিরোজা বেগম।

১৯৪২ সালে প্রথম গানের রেকর্ড বের হয় তাঁর, এইচএমভি থেকে। কাজী নজরুল ইসলামের প্রধান সহযোগী চিত্তরঞ্জন রায় সব ব্যবস্থাই করলেন। তখনো লং প্লে আসেনি। ৭৮ আরপিএমে বের হলো তাঁর প্রথম রেকর্ড। একদিকে ছিল ‘মোর আঁখিপাতে’, অন্যদিকে ছিল ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’। কলকাতার খবরের কাগজগুলোতে ফলাও করে প্রকাশিত হয় ফিরোজা বেগমের গানের খবর।

তাঁর সংগীতজীবনের প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয় ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ ও ‘মোমের পুতুল’ গান দুটি।

সুস্থ কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য পান তিনি প্রায় আড়াই বছর।

একটা সময় কাজী নজরুল ইসলামের গানের আলাদা কোনো নাম ছিল না। বিদ্রোহী কবির গানকে ‘নজরুলসংগীত’ নামে পরিচিত করানোর পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন ফিরোজা বেগম। গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি ফিরোজা বেগমের গান দিয়েই প্রথম নজরুলসংগীতের একক লং প্লে প্রকাশ শুরু করে। কবি নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর ফিরোজা বেগমই নজরুলসংগীতের প্রথম স্বরলিপিকার। নজরুলসংগীতের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের জন্য তাঁকে করতে হয়েছে কঠিন সংগ্রাম।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ৩৮০টির বেশি একক অনুষ্ঠানে গান করেছেন তিনি। নজরুলসংগীত ছাড়াও তিনি গেয়েছেন আধুনিক গান, গীত, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাত। এ পর্যন্ত তাঁর ১২টি এলপি, চারটি ইপি, ছয়টি সিডি ও ২০টির বেশি অডিও ক্যাসেট বেরিয়েছে।

নজরুলসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশে-বিদেশে পেয়েছেন নানা পুরস্কার—স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র পুরস্কার, সত্যজিৎ রায় পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী স্বর্ণপদক, সেরা নজরুলসংগীতশিল্পী পুরস্কার (টানা কয়েকবার), নজরুল আকাদেমি পদক, চুরুলিয়া স্বর্ণপদক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিলিট, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।

জাপানের অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিবিএস থেকে পেয়েছেন গোল্ড ডিস্ক।

‘নূরজাহান’, ‘চাঁদ সুলতানা’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’, ‘আমি চিরতরে দূরে সরে যাব’—নজরুলের এমন অনেক কালজয়ী গানের মাঝে অমর ও অক্ষয় হয়ে থাকবেন তিনি।

তাহসীন, হামিন ও শাফিন—তিন সুযোগ্য পুত্র তাঁর। হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ দুই ভাই এখন আমাদের ব্যান্ড সংগীতজগতের উজ্জ্বলতম দুই তারকা।
৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর রাত আটটা ২৮ মিনিটে ওই হাসপাতালেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Comments

comments