ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১০ : ৫৮ মিনিট

Swapno71_Shohid১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ আপামর জনতা। জাতির সূর্যসন্তানদের সে সব বীরত্বগাথায় আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ড। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা ছিল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২নং সেক্টরের অধীন। সে সময়ে ঢাকার সম্ভাবনাময় তরুণরা এই সেক্টরে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর সুদৃঢ় শক্তি কেন্দ্র ঢাকায় নানা অপারেশন শুরু করে। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণ গেরিলারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনসহ ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় সফল অভিযান চালায়। ক্র্যাক প্লাটুন নামে পরিচিত এই গেরিলাদের একের পর এক অপারেশনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। আবু বকর, হাফিজ, জুয়েল, আজাদ, বদি, রুমিসহ তরুণ গেরিলাদের এ সব অভিযান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সে সময় তুলেছিল তুমুল আলোড়ন। মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছিল প্রেরণা। আগস্টের ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ এ সব অসীম সাহসী, নির্ভীক, গেরিলা যোদ্ধাদের একে একে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের সহযোগিতা ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য একুশের গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদকে। হানাদারদের টর্চার সেলে তাদের ওপর চলে অমানুষিক, নির্মম, বর্বর নির্যাতন। এর পর তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সে সব তরুণ গেরিলার অসম সাহসী বীরত্বে আমরা পেয়েছি মাতৃভূমি বাংলাকে। তাদের বীরত্বগাথা, আত্মত্যাগ আমরা কখনো ভুলব না।

শহীদ বকর

১১ আগস্ট ১৯৭১, ঢাকা ইন্টারকন্টিনেনালে দ্বিতীয় দফায় একটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটানোর নেপথ্যে মূল নায়ক ছিল ১৮ বছর বয়সী একটি ছেলে, ক্র্যাক প্লাটুনের সর্বকনিষ্ঠ গেরিলা- মোহাম্মদ আবু বকর। ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টালে তার সেই দুঃসাহসিক এ্যাকশনের খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানী মিলিটারিদের দাম্ভিকতা, যারা ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত করে রেখেছিল। ১৮ বছর বয়সী এক বাঙালী ছোকরা সেই উঁচু নাকের দাম্ভিকতার ওপর পাড়িয়ে গিয়ে ওদের সবচেয়ে নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গায় হামলা চালিয়ে স্বগৌরবে বের হয়ে এসেছিল। পাক মিলিটারি পাগলা কুকুর হয়ে গিয়েছিল। তারপর এই দুঃসাহসী যুবককে ৩০ আগস্ট ভোরে গুলশান-২ এর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পাক আর্মিরা। নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরিসংলগ্ন এমপি হোস্টেলের বদ্ধ কামরায় অমানুষিক নির্যাতন চলে এই গেরিলার ওপর। সেদিনের পর বকর আর ফিরে আসেনি…।

শহীদ হাফিজ

শহীদ হাফিজ বেহালা বাজাতেন, সেই সূত্রে আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে সখ্য ছিল অনেক বছরের। হাফিজকে আলতাফ মাহমুদের ছায়াসঙ্গী বলে ডাকা হতো। একাত্তরের যুদ্ধ চলাকালীন গান রচনার সূত্র ধরে গেরিলা অপারেশনেও দেখা গেছে এই দু’জনকে একসঙ্গে। ৩০ আগস্ট পাক সেনাদের হাতেও তারা একসঙ্গে ধরা পড়েন। অত্যাচারের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে, হাফিজ টর্চার সেলেই ৩১ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

শহীদ আলতাফ মাহমুদ

৩৭০ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের বাসায় থাকতেন আলতাফ মাহমুদ। একাত্তরের গেরিলাদের জন্য এক দুর্গ বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল তার বাড়িটি। এ সময়ই তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ঢাকা শহরে কতগুলো অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের নির্দেশে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অপারেশন হয় আলতাফ মাহমুদের অংশগ্রহণে। তাদের কাছে প্রচুর বিস্ফোরক থাকায় সেগুলো নিরাপদে রাখার স্থান পাওয়া নিয়ে দেখা দেয় সমস্যা। আলতাফ মাহমুদ নিজ দায়িত্বে সব গোলাবারুদ তার বাসায় কাঁঠালগাছের নিচে পুঁতে রাখেন। আগস্টের শেষ সপ্তাহে ক্র্যাক প্লাটুনের সামাদ নামে একজন গেরিলা ধরা পড়েন। পাঞ্জাবী পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হাতে মার খেয়ে তিনি আলতাফ মাহমুদের বাসার কাঁঠালগাছের নিচে লুকিয়ে রাখা গোলাবারুদের কথা বলে দেন। ৩০ আগস্ট ভোরে আর্মিরা প্রথমে আলতাফ মাহমুদকে ওই ট্রাংকভর্তি অস্রসহ ধরে নিয়ে যায়। তার পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শহীদ আজাদ

১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। রাতে বাড়িতে হামলা চালায় পাকিস্তানী সেনারা। ধরা পড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের একদল তেজী মুক্তিযোদ্ধা। আজাদকে ধরে নিয়ে গিয়ে রাখা হয় রমনা থানায়। আজাদের মা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান। ছেলেকে বলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনোকিছু স্বীকার করবে না।’ আজাদ তখন মার কাছে ভাত খেতে চায়। মা ভাত নিয়ে এসে ছেলেকে আর পাননি। আর কোনোদিনও মায়ের বুকে ফিরে আসেনি মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আজাদ। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। ঠিক ৩০ আগস্টেই মারা যান তিনি। পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তোলেননি। কেবল একবেলা রুটি খেয়ে থেকেছেন। কারণ তার একমাত্র ছেলে আজাদ ভাত চেয়েও খেতে পারেনি সেদিন। অপেক্ষা করেছেন ১৪টি বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। ১৪ বছর তিনি কোনো বিছানায় শোননি। মেঝেতে শুয়েছেন। শীত-গ্রীষ্ম কোনো সময়ই তিনি পাল্টাননি তার এই পাষাণশয্যা। কারণ তার ছেলে নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরিসংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে বিছানা পায়নি।

শহীদ বদি

বদিউল আলম ঢাকা শহর ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ অপারেশনে অংশ নেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— ৮ আগস্ট ফার্মগেটে পাক বাহিনীর চেকপোস্ট অপারেশন, ১১ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটানো, ১৪ আগস্ট গ্যাস বেলুনের মাধ্যমে ঢাকা শহরের আকাশে বাংলাদেশের অনেক পতাকা ওড়ানো, ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে অপারেশন, ২৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ১৮ ও ২০ নম্বর রোডে অপারেশন। এ সব অভিযান এখনো তাদের দুর্ধর্ষতা ও দুঃসাহসিকতার উদাহরণ। মায়ের আদেশ মেনে বদিউল আলম ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’র সদস্য হিসেবে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় একের পর এক দুর্ধর্ষ ও দুঃসাহসিক সফল অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন। ২৯ আগস্ট ধানমণ্ডিতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাক বাহিনীর একটি দল হঠাৎ করেই বাড়ি ঘেরাও করে। বদিউল জানালা টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তা কাজে আসেনি। পাক হায়েনারা সেখান থেকে শুধু বদিউলকেই ধরে নিয়ে যায়। এর পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

শহীদ জুয়েল

১৯ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন অপারেশনের সময় পাক বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে তিনি আহত হন। এর পর তাকে মগবাজারে প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদের বাসায় চিকিৎসার জন্য আনা হয়। আলবদরের তৎকালীন সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এই খবরটা পৌঁছে দেয় স্থানীয় পাকিস্তানী ক্যাম্পে। ২৯ আগস্ট পাক বাহিনী হামলা চালায় জুয়েলের বাড়িতে। আহতাবস্থায় জুয়েলকে ধরে নিয়ে আসে ক্যাম্পে। ক্র্যাক প্লাটুনের তথ্য ও সকলের পরিচয় জানার জন্য প্রচণ্ড অত্যাচার চালানো হয় তার ওপর। যে হাত দিয়ে একদিন স্বাধীন বাংলাদেশের ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চড়াও হতে চেয়েছিলেন, সেই হাতের দুটি আঙ্গুল কেটে ফেলে পাক বাহিনী নির্মম নিষ্ঠুরতায়। প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখেও একটা কথা বলেননি তিনি। ৩১ আগস্টের পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তাকে ৩১ আগস্ট ক্র্যাক প্লাটুনের অন্য সকল যোদ্ধার সঙ্গে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ জুয়েলকে মরণোত্তর বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তার বীরত্বভূষণ সনদ নম্বর ১৪৮। বাংলা মায়ের এক অকুতোভয় বীর সন্তান এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের টেস্ট দলের ওপেনিং ব্যাটসম্যান হওয়ার স্বপ্ন বুকের গহীনে নিয়ে হাসতে হাসতে জীবন উৎসর্গ করেন।

শহীদ রুমি

সেক্টর-২ এর অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সেক্টরটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি ঢাকায় ফেরত আসেন এবং ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দেন। ক্র্যাক প্লাটুন হল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনাকারী একটি সংগঠন। রুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলা করা। এ সময় তাকে ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয়, যার মধ্যে ধানমণ্ডি রোডের একটি আক্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ধানমণ্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তার সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তার নিজের বাড়িতে কাটান এবং এই রাতেই বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধার সঙ্গে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে বেশকিছু যোদ্ধাকে গ্রেফতার করে, যার মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারাক, আজাদ ও জুয়েল। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তার সহযোদ্ধাদের আর পাওয়া যায়নি।

(তথ্যসূত্র, ছবি ও কৃতজ্ঞতা : Guerrilla1971)

Comments

comments