ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ০৮ : ০৯ মিনিট

ramachowdhary-

প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম যাচ্ছি। তার উপরে আবার প্রথম ট্রেনে ভ্রমণ। আর মনের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি। চট্টগ্রাম যাওয়ার আগে টিএসসিতে বসে কথা হয়েছিল সাঈদ ভাইয়ার সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে ভাইয়া জানতে পারেন, নারীদের নিয়ে আমার কাজ করার ইচ্ছা। সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়া বললেন, যেহেতু চট্টগ্রাম যাচ্ছ, তুমি তো রমা দি’র সঙ্গে দেখা করে আসতে পার।’

আমার ছোটবেলার বান্ধবীকে নিয়ে ১৯ জুলাই রওনা দিলাম চট্টগ্রামের পথে। চট্টগ্রামের বন্ধু জিসানের সঙ্গে আগে থেকেই ঠিক ছিল- দিদির সঙ্গে দেখা করার কথা। সব ব্যবস্থা জিসান করে রাখবে। তবুও যেন আর দেরি সইছে না, কখন দেখা হবে দিদির সঙ্গে। বন্ধু জিসানের সহযোগীতায় ২১ জুলাই, রাত ৮ টায় পৌঁছালাম চেরাগী পাহাড়। সেখানে পরিচয় হয় দিদির এক ছেলে আলাউদ্দিন খোকন ভাইয়ের। তখন রাত ৮ টা ২৫ মিনিট। লুসাই ভবনের ৪র্থ তলায় উপরে উঠতেই দেখি সেই প্রতীক্ষিত প্রিয় মুখ বসে আছেন।

দ্রুত ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। মনে হল কত দিনের চেনা। অথচ ঐদিনই প্রথম দেখা, পরিচয়। “আমি মানুষের জন্য অনেক করেছি কিন্তু কিছুই পাইনি। গত ৮ বছর যাবৎ বিড়াল নিয়েই আছি। যা খেতে দিই খায়, আমাকে আদর করে-ভালবাসে। আর মানুষেরা সব বেঈমান, লোভী, স্বার্থপর, বড় সুবিধাবাদী। আমরা সবাই মানুষ কিন্তু এক রকম না”।- এমন আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন। একাত্তরের জননী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবদন্তী সাহিত্যিক রমা চৌধুরী; আমাদের রমা দি’।

নিজের সর্বস্ব হারিয়ে একটা ছোট্ট ঘরে বিড়াল নিয়ে তাঁর বসবাস। বিড়ালগুলো যেন তার সন্তানের মত। যা বলছেন, সবই বুঝছে। বিড়ালের সংখ্যা জিজ্ঞেস করতেই দিদি বললেন, “সংখ্যা বলব না, সংখ্যা বললে বিড়াল টিকে না। পারলে তোমরা আমাকে একটা মেয়ে বিড়াল এনে দাও”। কারণ একটাই, দিদির বর্তমান সবগুলো বিড়াল ছেলে। বিড়ালের গল্প বলতে বলতেই তিনি জানালেন তার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, নানা সংগ্রাম, দৈনন্দিন জীবনযাপনের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় হারানো সন্তান “সাগর” ও “টগর”, বাড়িঘর পোড়ানোর সেই স্মৃতি। সবই দিদি একের পর এক বলে চলেছেন। কথা বলতে বলতে হাসছেন, কখনও কেঁদে ফেলছেন, আবার কখনও উপদেশ দিচ্ছিলেন। আর আমি মগ্ন হয়ে কেবল দিদির কথা শুনছি।

মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজেদের সর্বস্ব দিলেও আমরা নামে মাত্র স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা এখনও সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারিনি। মুক্তিযোদ্ধারা আজও শক্তিতে বলীয়ান; বিশ্বাসে অটল। সেটা রমা দি’র কথা শুনলেই বোঝা যায়। প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি বয়স হলেও নিজের লেখা বই নিজের হাতে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। কারও কোন সহযোগীতা নিয়ে তিনি বাঁচতে চান না। তিনি এদেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য দিনের পর দিন লিখে চলেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর ১৮ টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

কথা শুনতে শুনতে কখন যে রাত ১০টা বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। আসতেই ইচ্ছে করছিল না। দিদি এত সুন্দর করে সাবলীলভাবে তার জীবনী বলছিলেন যে, এতটুকু সময়ে কিছুই শোনা সম্ভব নয়। তবু চলে তো আসতেই হবে। বাধ্য হয়ে যখন উঠে পড়লাম। বুঝতে পারলাম, দিদিরও ভালো লাগছিল কথা বলতে। কিন্তু আসতে তো হবেই। দিদিকে কথা দিলাম আবার আসব। তবে আসার সময় একটা মেয়ে বিড়াল সঙ্গে নিয়ে আসব।

চলে আসার সময় দিদি বললেন, “একটা কথা দাও, এদেশ ছেড়ে, দেশের মাটি ছেড়ে তোমরা তরুণরা কখনও বিদেশে চলে যাবে না। এদেশ ছেড়ে তোমরা চলে গেলে এদেশের জন্য কারা কাজ করবে?” দিদি আরও বললেন, “ওরা (পাকিস্তানি, রাজাকার বাহিনি) আমার সব কেড়ে নিয়েছে, সুযোগ ছিল তবু আমি আমার দেশ ছেড়ে কোথাও যাই নি। তোমরাও যাবে না।” অবশেষে দিদিকে কথা দিলাম, এদেশ আমাকে জন্ম দিয়েছে। আমি এদেশেই থাকব, দেশের জন্য কাজ করব। আর ভালোবাসব আমাদের সবার প্রিয় জন্মভূমিকে।

Comments

comments