ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৩ : ২২ মিনিট

August 2nd, 2016

shundor-bonছোটবেলায় আনন্দ সাগরের পরিচালনায় নির্মিত অ্যারবিয়ান নাইটস বা আলিফ লায়লা দেখে দেখে, আবার দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের ইংরেজবিরোধী শাসক টিপু সুলতানের উপর নির্মিত ‘টিপু সুলতান’ কিংবা ক্যালোফোর্নিয়ায় জন্ম নেয়া জেন ব্রান্ট জেসনার অভিনীত ‘দ্য এ্যাডভেঞ্চার অব সিনবাদ’ বা বিখ্যাত আরব্য রজনীর রূপকথার কাঠুরিয়া আলীবাবা ও চল্লিশ চোর কাহিনীর দৃশ্যায়নে যোদ্ধের কলা কৌশল কিংবা শয়তান পক্ষের পরাজয় দেখে দারুণ খুশি হতাম। মনের মাঝে একটা উত্তেজনাময় অপেক্ষা কাজ করতো যে কখন যুদ্ধ শুরু হবে আর কখন শত্রুপক্ষ পরাজিত হবে। আর এখন এসবে ঠিক উল্টো চিন্তা কাজ করে। যুদ্ধবিগ্রহকে অসহ্য এ্যালার্জীর মতো মনে হয়। ভদ্র আর অভদ্র কোন প্রকারের যুদ্ধই ভাল্লাগেনা। অবশ্য তখন সেসব কাহিনীতে অনেক প্রতিবাদী চরিত্রই চোখে পড়ত। সেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ব্যক্ত বা অব্যক্ত ভাষাও ছিল দারুণ।

Bachukতবে একটা ব্যাপার খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি দিনদিন মানুষের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন এর জন্য নানান প্রেক্ষাপট দায়ী। আবার আরেক দল বলছেন কোন রাষ্ট্রে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি থাকলে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে নাকি এমনটা হয়। অবশ্য তাদের এমন কথা খুব একটা অযৌক্তিক নয়। হুম এটাও ঠিক যে প্রতিবাদ করারও অনেক উপায়-উপকরণ আছে। কেউ প্রতিবাদ করে রাস্তায় নেমে, কেউ ছবি এঁকে, মৌন থেকে, গান গেয়ে, কলম চালিয়ে, বর্জন করে, অনশন করে, কার্টুন এঁকে, অভিনয়ের মাধ্যমে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি অন্য এক গল্প লিখতে চাই।

একটা সংগঠনের গল্প। বিশেষ করে এর কলাকুশলীদের সৃজনশীলতার কথা, তাদের চেতনার কথা, তাদের প্রতিবাদী উপস্থাপনার কথা, সত্যকে সহজে প্রকাশ করার কথা, প্রকৃতি বা পরিবেশ প্রেমের কথা। সিলেটের নাট্যসংগঠন ‘নগরনাট’। মূলত নাট্যচর্চায়ই পরে থাকার কথা। কিন্তু এর বাইরে সংগঠনটির ব্যপক কার্যক্রম চোখে পড়ার মত। বিশেষকরে সংগঠনটির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত অরূপ বাউল ও উজ্জ্বল চক্রবর্তী এ দুজনের সৃজনশীল সাহসিকতাই ‘নগরনাট’কে আলাধা ইমেজ এনে দিচ্ছে। অবশ্য অন্যান্য সদস্যরাও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। নানা আন্দোলনে সংগঠনটির সরব অংশগ্রহণ আমাদের সজাগ করে দেয়। তাঁরা নিজেরাই লিখে, নিজেরা অভিনয় করে। আবার সে লিখায় ঢালে দরদ জাগানিয়া সুর। আবার নিজেরাই বানায় স্লোগান মুখরিত প্রতিবাদী পোস্টার। তাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুর তোলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক নষ্টামির বিরুদ্ধে, তাঁরা গলা ধরে গায় সুন্দরবন রক্ষার গান, নদীর জন্য সংগ্রামের গান, তাঁদের অমূল্য উপস্থিতি থাকে চা শ্রমিকের আন্দোলনেও। নাটকে আর গানে তাঁদের প্রতিবাদী উপস্থাপনা থাকে ধর্ষকের বিরুদ্ধে। স্বার্থান্ধ আর সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে। তারা কাজ করে রাতারগুলকে বাঁচানোর জন্য, পাখি নিধনের বিরুদ্ধে তাঁদের মুভমেন্ট আমাদেরকে নতুন করে শিখিয়ে দেয় পাখিদের প্রতি ভালোবাসা।
‘নগরনাট’ কিংবা অরূপ-উজ্জ্বলদের এমন প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড দীর্ঘকাল বেঁচে থাকুক। নগরনাট’কে নিয়ে দু চার কলম লিখতে গিয়ে মনে পড়ে বাংলাসাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের মনসামঙ্গলের কাহিনী। এ কাব্যে চাঁদ সদাগরের বিপুল বিদ্রোহ আর বেহুলার সতীত্ব কাহিনীর জন্য মনসামঙ্গল কাব্য অনেকটা জনপ্রিয় হয়েছিল। কাহিনী সাজাতে আদি কবি কানাহরি দত্তসহ এই কাব্যের কবিরা চাঁদ সদাগরকে এমন ভাবে উপস্থাপনা করেছিলেন যে চাঁদ সদাগরকেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নগরনাটের এমন কার্যক্রমে আরও প্রাণসঞ্চার হোক। একদম শেষে এসে বলতে চাই, জয়তু নগরনাট।

Comments

comments