ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৪ মিনিট

dabirulমুহম্মদ দবিরুল ইসলাম ১৩ মার্চ ১৯২২ সালে বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলাধীন বামুনিয়া গ্রামে জন্মলাভ করেন। তার পিতার নাম মাওলানা তমিজউদ্দিন আহমেদ, মাতা দখতার খানম। ঠাকুরগাঁও হাইস্কুল হতে ১৯৩৮ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষা অংশগ্রহণ করে প্রথম বিভাগে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী ও অন্যান্য আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার কারণে লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে এবং সরকারি রোষানলে পড়েন। পরে ১৯৪৭ সালে তিনি বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন। বিভিন্ন আন্দোলনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং ১৯৫৫ সালে কারাবাস থেকে এলএলবি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।

বাঙালিদের অধিকার আদায়ের গৌরবজনক অধ্যায়ে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারীদের আন্দোলনে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) গঠনে যে ক’জন তেজোদীপ্ত তরুণ ছাত্রনেতা বিশেষ অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে মুহম্মদ দবিরুল ইসলাম অন্যতম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ক্লাসের সহপাঠী।

১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে দিনাজপুরের নুরুল হুদা বা কাদের বক্্স, মুস্তাফা নূরুউল ইসলাম, এম আর আখতার মুকুল, দবিরুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে দবিরুল ইসলাম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত করেন এবং ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হলে সরকারের জুলুম নির্যাতন নেমে আসে। জুলুম নির্যাতন প্রতিরোধ হিসেবে ১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র ধর্মঘট হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে ছাত্ররা জমায়েত হতে শুরু করে। শেখ মুজিবুর রহমান, দবিরুল ইসলাম ও অলি আহাদ এখানে বক্তব্য রাখেন। এই আন্দোলনের সূত্র ধরে দিনাজপুরে অপ্রতিরোধ্য ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নেতা দবিরুল ইসলাম, নূরুল হুদা এবং কাদের বক্্স ও এম আর আখতার মুকুল কারারুদ্ধ হন। তাদের মুক্তির উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, আব্দুল হামিদ চৌধুরী ও আব্দুল আজিজ দিনাজপুর পৌঁছালে জেলা প্রশাসক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নেতৃত্ববৃন্দকে দিনাজপুর ত্যাগের নির্দেশ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ম বেতনভুক্ত কর্মচারীদের ধর্মঘটকে সমর্থন করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল ১৯৪৯ সালের ২৯ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান, দবিরুল ইসলাম, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, অলি আহাদসহ মোট ছয়জন বহিষ্কার হন।

১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দবিরুল ইসলাম যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্টের আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি (শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম) এবং তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠতা সভাপতি ছিলেন। তখন তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে সুগার মিল স্থাপনের জন্য জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিরল প্রতিভার অধিকারী মুহম্মদ দবিরুল ইসলাম ১৯৪৯ ও ১৯৫৪ সালে কারা অভ্যন্তরে অকথ্য নির্যাতন ভোগ করায় হূদরোগসহ বিভিন্ন রোখে আক্রান্ত হন। ফলে  তিনি ১৯৬১ সালে অল্প বয়সে মারা যান।

গ্রন্থনা: সামিউল্লাহ সমরাট

( লেখাটি  মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১ এর ‌’একুশে ফেব্রুয়ারি ২০১৬’ সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়) 

Comments

comments