ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৮ : ৫৭ মিনিট

সফিউদ্দিন_আহমেদ_(১৯২২-২০১২)এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চা শুরুর আন্দোলনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাতে হাত মিলিয়ে যে কজন শিল্পী অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট’, শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রের জনক। তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার দ্বারা আমাদের ছাপচিত্র জগৎকে বিশ্বমানে উন্নীত করেছেন। ছাপচিত্রের অনেকগুলো মাধ্যমকে তিনি ব্যাপক ও গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সমৃদ্ধ করেছেন। এসব মাধ্যমের মধ্যে রয়েছে: উড এনগ্রেভিং, ড্রাই পয়েন্ট, এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট, কপার এনগ্রেভিং প্রভৃতি। ছাপচিত্রের পাশাপাশি তিনি জলরং এবং তেল রং-এর কাজেও দক্ষতা দেখিয়েছেন। সাত দশকের বেশি সময় ধরে শিল্পচর্চায় দেশের চারুকলার জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর শিল্পকর্মে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৯৪৫ সালে কলকাতা একাডেমি অব ফাইন আর্ট থেকে একাডেমি প্রেসিডেন্ট পদক, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদক ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ আরও অনেক পুরস্কার অর্জন করেন।

আজ এই শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। তাঁকে জানাই বিনম্র সশ্রদ্ধা। তিনি ১৯২২ সালে ২৩ জুন কলকাতায় জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪২ সালে এখান থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যেের সেন্ট্রাল স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস্ থেকে এচিং ও এনগ্রেভিংয় বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় ধানমন্ডিতে চলে আসেন।

১৯৫৮ সালে থেকে দেশ-বিদেশে একক ও দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৮ সালের ২৩ জুন দেশে তার প্রথম একক প্রদর্শনী ‘রেখার অশেষ আলো’ অনুষ্ঠিত হয়। তার অসাধারণ কাজ দেশ-বিদেশের শিল্পরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

১৯৬২-তে শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া জাপান থেকে লিথোগ্রাফি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ছাপচিত্র বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগদান করলে শিক্ষাদান পদ্ধতিতে আরেকটি মাত্রা যোগ হয়। এর ছাপচিত্র বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত। চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, আবুল বারক আলভী, ফরিদা জামান, আবুল খায়ের, সুবীর চৌধুরীসহ অনেকে তার কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

সফিউদ্দীন আহমেদ শুরুতে শুধু ছাপচিত্রের ক্লাসই নিতেন না, ড্রইং ও পেইন্টিং বিভাগেরও ক্লাস নিয়েছেন। তাঁর ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা সচেতন থাকত, ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না কোনোভাবেই। নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ দেখাতেন, বোঝাতেন আর আদায় করে নিতেন। তিনি ছিলেন সফল চিত্রকর, প্রিন্টমেকার এবং একজন একাগ্র সংবেদনশীল শিক্ষক।

তিনি ছুটিতে চলে গেছেন বিহারের সাঁওতাল এলাকায়। মধুপুর, গিরিডি বা দুমকায়। পাহাড়, বৃক্ষশোভিত উঁচু-নিচু দিগন্ত-ছোঁয়া প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করেছেন। অসংখ্য স্কেচ, ড্রইং আর জলরং করেছেন। ১৯৩৭ থেকে ’৪৫-৪৬ পর্যন্ত এই আসা-যাওয়া অব্যাহত ছিল। সাঁওতালদের সহজ-সরল স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন তাঁকে আলোড়িত করেছিল। জীবনযাপনের মধ্যে এক প্রাকৃতিক সারল্য খুঁজে পেয়েছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বরেণ্য চিত্রশিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বরেণ্য চিত্রশিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ

এই সময়ে করা জলরং, উড-এনগ্রেভিং, এচিং, ড্রাইপয়েন্ট বা তেলরঙে করা কাজ তাঁর চিন্তাভাবনায়, সৃষ্টিশীলতায় এক নতুন মাত্রা এনে দিয়েছিল। এর সঙ্গে কলকাতা আর্ট স্কুলের কয়েকজন খ্যাতিমান শিক্ষক, যাঁদের কথা তাঁর স্মৃতিচারণে সবসময় উঠে আসত সেই মুকুল দে, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বসন্তকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, সতীশ চন্দ্র সিংহ, প্রহ্লাদ কর্মকার আর আবদুল মঈন – এঁদের সাহচর্য, উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় উপদেশ তাঁর চলার পথকে সুগম করেছে। উড-এনগ্রেভিংয়ের শিক্ষক আবদুল মঈনের উৎসাহ আর রমেন চক্রবর্তীর কাছে হাতে-কলমে ছাপচিত্রের করণ-কৌশল শিক্ষা, সেই সঙ্গে নিজের মেধা, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের সংযোজন তাঁর কাজে (ছাপচিত্রে) নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

সেই ’৪০-এ করা (প্রথম উড-এনগ্রেভিং) ‘দুমকা’ বা ’৪২-এর ‘কৃষকের মুখে’ আলোছায়া আর নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি করার প্রয়াস দেখা যায়। যার চূড়ান্ত প্রতিফলন পরবর্তী সময়ের কাজে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন – ‘বাঁকুড়ার ল্যান্ডস্কেপ’ (’৪২), ‘বাড়ীর পথে’ (’৪৩), ‘বাড়ীফেরা’ (’৪৪), ‘সাঁওতাল রমণী’ (’৪৬), ‘মেলার পথে’ (’৪৭) করা এনগ্রেভিংগুলোতে। সব কাজেই আলোছায়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে (’৪৬-৪৮) তেলরঙে করা চিত্রেও দেখা যাচ্ছে স্ট্রোকের ব্যবহার আর আলোছায়া নিয়ে খেলা। ‘শালবন দুমকা’, ‘দুমকা-১’, ‘দুমকা-২’, ‘সূর্যালোকে কুটির’, ‘দিলীপ দাশগুপ্তের প্রতিকৃতি’, ‘জড়জীবন’ – এই ছবিগুলোর উল্লেখ করা যেতে পারে। এছাড়া এই সময়ে করা ড্রাইপয়েন্ট ’৪৪, ’৪৫ ও ’৪৬-এ করা ও এচিং (’৪৫), এচিং-অ্যাকুয়াটিন্ট ‘কবুতর’, ‘ময়ূরাক্ষী’ – এই কাজগুলোতেও তাঁর স্বতন্ত্র একটা স্টাইল লক্ষ করা যায়।

15দেশবিভাগের পরে ১৯৪৮-এ শিল্পী সফিউদ্দীন এদেশে চলে এলেন। ছবি আঁকার সরঞ্জামের অভাব এবং চারুকলার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণেই হয়তো ১৯৪৯ থেকে ’৫১ পর্যন্ত তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু ’৫২ থেকে আবার তাঁর নিয়মিত করা উল্লেখযোগ্য কাজ আমাদের চোখে পড়ে। তেলরঙে করা তাঁর বিখ্যাত ‘ধানঝাড়া’ (’৫২) ও ‘ধানের বাজার’ (’৫২) উল্লেখযোগ্য। মোটা রঙে স্ট্রোকে করা কাজ। ১৯৫৪-তে করা তেলরং চিত্র ‘মাছধরা’ ও ‘কাঠমিস্ত্রী’ – এই ছবি দুটিতে কিছুটা লোকজ প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু ‘শূন্য ঝুড়ি’ (’৫৪), ‘শরবতের দোকান-১’ (’৫৪), ‘সূর্যমুখী’ (’৫৬) ও ‘মাছধরা’ (’৫৮) – এই ছবিগুলোতে আবার পরিবর্তন এসেছে। উড-এনগ্রেভিংয়ে করা বন্য (’৫৬) ও ‘ইমেজ ফ্রম লাইফ’ (’৫৫) – এই দুটি কাজ ও আগের এনগ্রেভিংগুলো থেকে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

১৯৫৬-তে বিলেত গেলেন ছাপচিত্রে উচ্চশিক্ষার জন্যে। শিক্ষা গ্রহণকালে ইউরোপীয় সমকালীন শিল্পীদের মৌলিক কাজ দেখার সুযোগ হলো। এর ফলে তাঁর ভেতর গ্রহণ-বর্জনের এক বোধ কাজ করেছিল। এখানে শিক্ষক হিসেবে পেলেন বিশ্ববিখ্যাত প্রিন্টমেকার হেটারের ছাত্র মালিন ইভান্সকে। সেন্ট্রাল স্কুল থেকে এচিং ও এনগ্রেভিংয়ে হাতে-কলমে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। কাজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বিভিন্ন গ্যালারি এবং বিখ্যাত শিল্পীদের কাজ তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে আরো স্বকীয় করতে সাহায্য করে। এই সময়ে করা এনগ্রেভিং ও সফট গ্রাউন্ডে করা ‘হলুদ জাল’ (’৫৭) ও এনগ্রেভিং-অ্যাকুয়াটিন্টে করা ‘কম্পোজিশন’ (’৫৮), ড্রাইপয়েন্টে করা ‘দুমকা’ (’৫৭), ‘মেটাল এনগ্রেভিং গুণটানা’ (’৫৮) ও ‘জেলের স্বপ্ন’ (’৫৭) এবং এচিং-অ্যাকুয়াটিন্টে করা ‘জড়জীবন’ (’৫৭), ‘নেমে যাওয়া বন্যা’ (’৫৮), ‘ফিশিং টাইম’ (’৫৮), ‘সেতু পারাপার’ (’৫৯), ‘ঝড়ের আগে’ (’৫৮), ‘বন্য’ (৫৯) – এগুলো উল্লেখযোগ্য।

2এরপর ঢাকায় ফিরে করেছেন মেটাল এনগ্রেভিংয়ে কয়েকটি কাজ, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘একুশে স্মরণে’ (’৮৭), ‘একাত্তরের স্মৃতি’ (’৮৮), ‘একাত্তরের স্মরণে’ (২০০০) ও এচিং-অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে করা ‘বিক্ষুব্ধ মাছ’ (’৫৪), ‘নীল জল’ (’৬৪), ‘জলের নিনাদ’ (’৮৫), ‘ফিশিং নেট’ (’৬৬), ‘ফিশিং নেট’ (’৬৭), আর পেইন্টিং তেলরং মাধ্যমে ‘প্যারিসে বইয়ের দোকান’ (’৬০), ‘বন্য’ (’৮৯), ‘রিদম অব লাইন-১’ (’৯৮), ‘মাছধরার জাল’ (’৭৫), ‘সূর্য, গাছ ও মেয়ে’ (’৮৯), ‘আপেল ও গাড়ি’ (’৭৫), ‘শরবতের দোকান-২ (’৮৮), ‘মাছ ও জাল’ (’৯১), ‘নারী’ (’৯৪), ‘লাল ও সবুজ’ (’৯৪), ‘মাছ ও জাল’ (’৯৬), ‘নীল জল’ (’৯৬), ‘একাত্তরের স্মরণে’ (’৯৮), ‘স্টিল লাইফ-৩’ (’৮৪), ‘কালো মাছ’ (’৮৪), ‘নীলের নিনাদ-১’ (২০০০), ‘প্রকৃতির সংগীত-২’ (২০০০), ‘নীলের নিনাদ-২’ (২০০০), ‘জীবন’ (’৯৬), ‘অন্ধ মেয়ে ও মৃত পাখি’ (২০০০), ‘প্রকৃতির সংগীত’ (২০০০), ‘রিদম অব লাইন’ (২০০১), ‘রিদম অব লাইন-৩’ (২০০৫) উল্লেখযোগ্য।

শিল্পকীর্তির জন্য অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য হলো- কলকাতা একাডেমি অব ফাইন আর্টের দেওয়া একাডেমি (১৯৪৫), ভারতের পার্টনার শিল্পকলা পরিষদের দেওয়া ‘দ্বারভাঙা মহারাজার স্বর্ণপদক’ (১৯৪৭), পাকিস্তান সরকারের ‘প্রেসিডেন্ট পদক’ (১৯৬৩), বাংলাদেশ সরকারের ‘একুশে পদক’ (১৯৭৮) ও ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’ (১৯৯৬)।

১৯ মে ২০১২ শনিবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে শিল্পগুরু সফিউদ্দীন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান শিল্পী সফিউদ্দীন।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, শিল্প ও শিল্পী, সাংস্কৃতি

 

 

 

Comments

comments