ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৩ : ২৬ মিনিট

12222ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে আসাম একটি। রাজ্যটিকে মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। আপার আসাম, লোয়ার আসাম, কাবলি-আলং অঞ্চল এবং বরাক উপত্যকা। এই সমস্ত অর্থাত্ গোটা আসামে অনেক বাঙালি বসবাস করলেও বরাক উপত্যকায় (কাছার, শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি) জনসংখ্যার ৯০ শতাংশই বাঙালি জাতির বসবাস বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি প্রস্তাব গ্রহণ করে যে, আসাম রাজ্যে একমাত্র অসমীয়া হবে রাজ্যের সরকারি ভাষা। তারপর ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসাম সরকার অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের ফলে আসামে বসবাসকারী বাঙালিরা প্রবলভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বরাক উপত্যকার বাঙালিরা নিজের মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ‘কাছার গণ-সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। ১৪ এপ্রিল থেকে বরাক উপত্যকার জনগণ বাংলা ভাষাকেও সরকারি ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে কাছার, শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দিতে আন্দোলন শুরু করেন।

১৯৬১ সালের ২৪ এপ্রিল গণ-সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বরাক উপত্যকার জনগণকে সচেতন করার জন্য ২০০ মাইল পদযাত্রা শুরু করা হয় এবং এই পদযাত্রা শেষ হয় শিলচরে ২ মে। এই আন্দোলন দমন করার জন্য ১২ মে আসাম রাইফেল, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ শিলচর শহরে ফ্ল্যাগমার্চ শুরুকরে। ১৮ মে গণ-সংগ্রাম পরিষদের তিনজন ভাষাসৈনিক নেতাকে আসাম পুলিশ গ্রেফতার করে। তারা হলেন শ্রী নলিনীকান্তদাস, শ্রী রবীন্দ্রনাথ সেন ও শ্রী বিধুভূষণ চৌধুরী। শ্রী বিধুভূষণ চৌধুরী ছিলেন সাপ্তাহিক ‘যুগাশক্তি’ পত্রিকার সম্পাদক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ মে গণ-সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বরাক উপত্যকায় হরতালের ডাক দেওয়া হয়।

১৯ মে শহীদের নিয়ে ২০ মে শহীদ শোক মিছিল। সামনের সারিতে রয়েছেন প্রথমেই মহীতোষ পুরকায়স্থ, প্রভাস সেন মজুমদার, সন্তোজ মোহন দেব, তারাপদ ভট্টাচার্য প্রমূখ বিশিষ্টজন।

১৯ মে শহীদের নিয়ে ২০ মে শহীদ শোক মিছিল। সামনের সারিতে রয়েছেন প্রথমেই মহীতোষ পুরকায়স্থ, প্রভাস সেন মজুমদার, সন্তোজ মোহন দেব, তারাপদ ভট্টাচার্য প্রমূখ বিশিষ্টজন।

ভাষা আন্দোলনকারীরা সকাল থেকে বরাক উপত্যকার সব সরকারি অফিস, কোর্ট, রেলস্টেশনের সামনে ‘পিকেটিং’ সত্যাগ্রহ এবং রাস্তা পরিক্রমা করেন। ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের প্রথম ট্রেনের একটি টিকিটও সেদিন বিক্রি হয়নি, এমন তীব্র সেই আন্দোলনের প্রভাব জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছিল। সকালবেলা বেশ শান্ত ভাবেই এই ধর্মঘট কর্মসূচি পালিত হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে এর চাপা উত্তেজনা ছড়াতে শুরুকরে। বেলা আড়াইটা নাগাদ গ্রেফতার হওয়া নয়জন ভাষাসৈনিককে পুলিশ ‘কাটীগোড়া’ থেকে ভ্যানে করে ‘তারাপুর’ রেলস্টেশনের সামনে দিয়ে যখন নিয়ে যাচ্ছিল, তখন উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা এই নয়জনকে পুলিশের কাছ থেকে জোর করে ছিনিয়ে নেয়। ঠিক তার ৫ মিনিটের মধ্যে অর্থাত্ ২টা ৩৫ নাগাদ আসাম রাইফেলস এবং সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ সেখানে ব্যাপকভাবে জড়ো হয় এবং আন্দোলনকারীদের ওপর প্রবল লাঠিচার্জ শুরু করে। এর ফলে প্রচুর আন্দোলনরত মানুষ আহত হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আন্দোলনকারী জনতার ওপর ১৭ রউন্ড গুলি ছোড়া হয়, যার ফলে ১১ জন ভাষাসৈনিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং শহীদ হন। যেসব বীর ভাষাসৈনিক বাংলা ভাষার জন্য ওই দিন শহীদ হয়েছিলেন তারা হলেন :

১) শ্রীমতী কমলা ভট্টাচার্য ২) শ্রী তরণী দেবনাথ ৩) শ্রী হিতেশ বিশ্বাস ৪) শ্রী সত্যেন্দ্র  দেব ৫) শ্রী কুমুদ রঞ্জন দাস ৬) শ্রী সুনীল সরকার ৭) শ্রী শচীন্দ্র চন্দ পাল ৮ ) শ্রী কানাইলাল নিয়োগী ৯) শ্রী চন্ডীচরণ সূত্রধর ১০) শ্রী বীরেন্দ্র সূত্রধর ১১) শ্রী সুকোমল পুরকায়স্থ ।

অবশেষে এই বীর বাংলা ভাষাভাষী সৈনিকদের আত্মবলিদানের বিনিময়ে আসাম সরকার বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

প্রতিবছরই ১৯ মে দিনটি আসে, কিন্তু এই দিনটির তাত্পর্য আমরা অনেকেই জানি না। বরাক উপত্যকায় এই দিনটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হলেও আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার কিছু সংগঠন ছাড়া এই দিনটি সেভাবে কোথাও পালিত হয় না। এই দিনটিও একটি মাতৃভাষা আন্দোলনের শহীদ দিবস হিসেবে সবার অন্তত একবার স্মরণ করা উচিত।

স্বপন চক্রবর্তী,কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

* লেখাটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১ এর একুশে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে প্রকাশিত হয়।

Comments

comments