ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৬ : ১৮ মিনিট

human-forudiদৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক সালেহ চৌধুরীর মাথায় (কাজকর্ম তেমন ছিল না বলেই মনে হয়) অদ্ভুত অদ্ভুত আইডিয়া ভর করত। একদিন এ রকম আইডিয়া ভর করল। তিনি আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় উপস্থিত হয়ে বললেন, বাংলাদেশে পাঁচজন হুমায়ূন আছে। দৈনিক বাংলায় এদের ছবি একসঙ্গে ছাপা হবে। আমি একটা ফিচার লিখব, নাম ‘পঞ্চ হুমায়ূন’। আমি বললাম, পাঁচজন কারা? সালেহ চৌধুরী বললেন, রাজনীতিবিদ হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, দৈনিক বাংলার সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূন, অধ্যাপক এবং কবি হুমায়ূন আজাদ, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং তুমি। আমি বললাম, উত্তম প্রস্তাব। তবে এখন না। আরো কিছুদিন যাক। সময় যেতে লাগল, হুমায়ূনরা ঝরে পড়তে শুরু করলেন। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী গেলেন, আহমেদ হুমায়ূন গেলেন, হুমায়ূন আজাদ গেলেন। হারাধনের পাঁচটি ছেলের মধ্যে রইল বাকি দুই। এই দু’জনের মধ্যে কে আগে ঝরবেন কে জানে! সময় শেষ হওয়ার আগেই হুমায়ুন ফরীদি বিষয়ে কিছু গল্প বলে ফেলতে চাচ্ছি।

শুরু করি প্রথম পরিচয়ের গল্প দিয়ে। ফরীদির তখন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। বিটিভির অভিনয় রাজ্য দখল করে আছেন। একদিনের কথা- বেইলি রোডে কী কারণে যেন গিয়েছি, হঠাৎ দেখি ফুটপাতে বসে কে যেন আয়েশ করে চা খাচ্ছে। তাকে ঘিরে রাজ্যের ভিড়। স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিক দেখানোর সময় তাদের ঘিরে এ রকম ভিড় হয়। কৌতূহলী হয়ে আমি এগিয়ে গেলাম। ভিড় ঠেলে উঁকি দিলাম, দেখি হুমায়ুন ফরীদি- চা খাচ্ছেন, সিগারেট টানছেন। রাজ্যের মানুষ চোখ বড় বড় করে দৃশ্য দেখছে; যেন তাদের জীবন ধন্য। হঠাৎ ফরীদির আমার উপর চোখ পড়ল। তিনি লজ্জিত গলায় বললেন- আপনি এখানে কী করেন? আমি বললাম, আপনার চা খাওয়া দেখি। ফরীদি ওঠে এসে আমার হাত ধরে বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার। মিতা! আসুন তো আমার সঙ্গে। (নামের মিলের কারণে আমরা একজনকে অন্যজন মিতা সম্বোধন করি) তিনি একটা মনিহারী দোকানে আমাকে নিয়ে গেলেন। সেলসম্যানকে বললেন, আপনার দোকানের সবচেয়ে ভালো কলমটি আমাকে দিন। আমি মিতাকে গিফট করব। ফরীদিকে আমি একটি বই উৎসর্গ করেছি। উৎসর্গ পাতায় এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আছে।

এখন দ্বিতীয় গল্প। শুরুতেই স্থান-কাল-পাত্র উল্লেখ করি। স্থান সুইডেন, কাল ২০০৮, পাত্র মানিক। এই ভদ্রলোকের সুইডেনে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। তিনি একদিন নিমন্ত্রণ করলেন তার বাড়িতে। দেশের বাইরে গেলে আমি কোথাও কোনো নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি না। কারো বাড়িতে তো কখনো না। মানিক সাহেবের বাড়িতে গেলাম, কারণ তার চেহারা অবিকল হুমায়ুদ ফরীদির মতো। আপন ভাইদের চেহারাতেও এত মিল থাকে না। ভদ্রলোককে এই কথা জানাতেই তিনি বিনয়ী ভঙ্গিতে বললেন, অনেকেই এমন কথা বলে। আমি বললাম, ফরীদির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো পরিচয় কি আছে? মানিক বললেন, সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭১ সালে আমি ও ফরীদি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছি। আমি চমকালাম! ফরীদি যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তা আমার জানা ছিল না। মানিকের বাড়িতে আমার জন্য আরো বড় চমক অপেক্ষা করছিল। সেখানে দেখি তার বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘরটির নাম ফরীদি। এই ঘরটি তিনি সারাবছর তার বন্ধু হুমায়ুন ফরীদির জন্য সাজিয়ে রাখেন। যদি ফরীদি বেড়াতে আসেন। অন্য কারো সেই ঘরে প্রবেশাধিকার নেই।

তৃতীয় গল্প। সন্ধ্যাবেলায় ফরীদি টেলিফোন করেছেন। আমি ফোন ধরতেই বললেন- মিতা, আপনি কি আচার খান? আমের আচার, তেঁতুলের আচার এসব? আমি বললাম- খাই। ফরীদি বললেন- সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে গল্প করতে আসব। ভাবছি তখন আচার নিয়ে আসব। তিনি গল্প করতে এলেন, সঙ্গে কোনো আচারের বোতল কোথায়? শেষ পর্যন্ত বলা হলো না। আমরা দুজন দুজনকে মিতা ডাকি কিন্তু আমাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই। গল্প শেষ করার পর ফরীদি বিদায় নিলেন। রাত ১২টার মতো বাজে। ঘুমানোর আয়োজন করছি- তখন দরজায় কলিং বেল। দরজা খুলে দেখি হুমায়ুন ফরীদির ড্রাইভার। তার সঙ্গে ২৩টা আচারের বোতল। তার দায়িত্ব ছিল দোকানে দোকানে ঘুরে যত রকমের আচারের বোতল ছিল সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। সংগ্রহ করতে দেরি হয়েছে বলেই সে এত রাতে এসেছে।

চতুর্থ এবং শেষ গল্প। এই গল্পটি শুনেছি আমার প্রিয় প্রতিভাময়ী এক জনপ্রিয় শিল্পীর কাছে। গল্পটি আমার এতই পছন্দ হয়েছিল যে, এই লেখায় উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। গল্পের পটভূমির পরিবর্তন হয়েছে। নতুন পটভূমিতে গল্পটি বলা শোভন হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়েছে। ফরীদি স্ত্রীর রাগ ভাঙানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। রাগ ভাঙাতে পারেননি। সুবর্ণা কঠিন মুখ করে ঘুমাতে গেছেন। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতেই সুবর্ণা হতভম্ব। ঘরের দেয়াল এবং ছাদে ফরীদি লিখে ভর্তি করে ফেলেছে। লেখার বিষয়বস্তু, সুবর্ণা! আমি তোমাকে ভালোবাসি। সুবর্ণা আমার সঙ্গে হাসতে হাসতেই গল্পটা শুরু করেছিলেন, এক সময় দেখি তার চোখে ভালোবাসা এবং মমতার অশ্রু চিকচিক করছে।

পাদটীকা, আচ্ছা এই মানুষটি কি অভিনয়কলায় একটি একুশে পদক পেতে পারেন না? এই সম্মান কি তার প্রাপ্য না? (যে পাঁচ হুমায়ূনের নাম করা হলো তাদের মধ্যে ফরীদি ছাড়া বাকি সবাই একুশে পদক পাওয়া) মিতার ষাটতম জন্মদিনে তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা। হে পরম কুরুণাময়, এই নিঃসঙ্গ গুণী মানুষটিকে তুমি তোমার করুণা ধারায় সিক্ত করে রাখ।

আমিন।

[ লেখাটা হুমায়ূন ফরীদি ষাটতম জন্মদিন উপলক্ষে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক  হুমায়ূন আহমেদ এই লেখাটি লিখেন।]

আরও পড়ুন : কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি

Comments

comments