ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৩ : ২৩ মিনিট

EL2011_42আত্রাই নদীটা দিনাজপুর,জয়পুরহাট এবং নওগাঁ জেলার ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে সীমান্তের কাছাকাছি দূরত্বে বয়ে গেছে। যে জায়গাটায় নদীটি সীমান্ত ছুঁয়ে গেছে সে স্থানটির নাম আত্রাই। আত্রাই নদীর মাঝ প্রবাহ দু’দেশের সীমান্তরেখা। পাকিস্তানি এক প্লাটুন সৈন্য এবং এক প্লাটুন রাজাকার ছিল সেখানে প্রতিরক্ষা অবস্থানে।

ভারতীয় ৬ গার্ড রেজিমেন্ট এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল ভিকে সিং তারেকের (হামিদুল হোসেন তারেক,বীর বিক্রম) ওপর দায়িত্ব দেয় ত্রিশালের এই শত্রু অবস্থান দখলের। তাঁকে দেয়া হল দেড়শ গণযোদ্ধার একটি কোম্পানি। এ অবস্থান দখল করতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আক্রমণ রচনা করতে হবে শত্রুর উপর। যদিও আক্রমণের নীতি অনুযায়ী দুই কোম্পানি নিয়মিত সৈনিক দুই প্লাটুনের প্রতিরক্ষা অবস্থান দখলের জন্য অংশগ্রহন করার কথা (আক্রমনের ক্ষেত্রে ১:৩ আনুপাতিক হার অনুযায়ী) এবং অবশ্যই আর্টিলারী বা মর্টার ফায়ারের সহায়তায়। তারেক গণযোদ্ধা।

তাঁর এতোসব জানা নেই, জানার প্রয়োজনও নেই। লে.কর্নেল ভিকে সিং পিঠ চাপড়িয়ে আর দ’গাল প্রশংসা করে সুন্দর ইংরেজীতে এই দুরহ কাজটি অর্পণ করেছেন তারেকের ওপর। গণযোদ্ধাদের প্রাণ কানাকড়িতে বিকায় – ভারতীয়দের এমনই ভাব। বিষয়টি তারেক নিয়েছে বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে। অবশ্য তার আর কোনো হিসাব করবার অবকাশও ছিল না। যুদ্ধের জন্য যতো পরিসংখান আর অংক করে পৃথিবীর সব নিয়মিত বাহিনী। জনযুদ্ধের গণযোদ্ধারা তৈরিও হয় পাইকারীতে,খরচও হয় পাইকারীতে। এদের ব্যক্তিগত নথী নেই,পেনশন নেই, গ্রাচুইটি নেই। হিসাব বড় সোজা।
৮ নভেম্বর প্রত্যুষে শত্রু অবস্থান দখল করা হলো। তারেক কমান্ডার। তার কাজ তখোনো শেষ হয়নি। সে বেরিয়েছে পরিশ্রান্ত দেহটি নিয়ে সহযোদ্ধাদের হতাহতের অবস্থা জানতে। নিহত সহযোদ্ধাদের আর আহত সতীর্থদের ব্যবস্থা করতে হবে। ত্রস্ত তারেক হঠাৎ করে উচ্চকন্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ালো – ‘এই শমসের,এ কী করছিস? পাগল হয়েছিস নাকি?’ তারেক দৌড়ালো ঘটনাস্থলের দিকে।


শযসের নামের ছেলেটি বরাবরই খুব শান্ত। কোনো কাজেই ‘না’ নেই। মুখ বুজে কাজ করে। কখনো তার কোনো ওজর নেই,আপত্তি নেই,অভিযোগ নেই। বহু যুদ্ধ করেছে সে তারেকের সাথে। যুদ্ধের মাঠে সে অদম্য সাহসী। যে কোনো কাজের জন্য সে অত্যন্ত আস্থাশীল। শমসের পাগল হতে যাবে কেন। কিন্তু এ মুহুর্তে সে এক মৃত পাক সেনার একটা হাত কেটে নিয়ে কাঁচা মাংশ চিবিয়ে খাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। কেউই তাকে বিরত করতে পরছে না। শমসের কাঁচা মাংস চিবাচ্ছে আর চিৎকার করছে ‘ছেড়ে দে আমাকে। আমাকে প্রতিশোধ নিতে দে’। শমসেরের রক্তবর্ণ চোখ কোটর থেকে ঠিককরে বেরিয়ে আসছে।


তারেককে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। ‘তারেক ভাই,এই শালা হারামীর বাচ্চারা আমার বাবাকে মেরেছে, ম’কে মেরেছে। আমার চোখের সামনে আমার ছোট বোনের জামাইকে মেরে বোনের ইজ্জত লুটে ওকে খুন করেছে। আমি ওদের মাংস কাঁচা চিবিয়ে খাবো। বাঁধা দিও না, কসম লাগে তোমার। আমাকে বাঁধা দিও না।’


প্রচন্ড শীতে তারেকের রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগলো। তারপরও শান্তভাবে শত্রুর বিচ্ছিন্ন হাতটা শমসেরের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। পরম মমতায় শমসেরকে বুকে টেনে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরলো তারেক। উপস্থিত সহযোদ্ধাদের হঠাৎ করেই চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগলো। শমসের হাউমাউ করে কাঁদছে। তারেক বা কারোরই কিছু বলবার ছিল না,করবারও ছিল না কিছুই।


শমসেরের অশান্ত হৃদয়ের সব কান্না কাঁদবার জন্য এই ক্ষণটির প্রয়োজন ছিল বড় বেশি।

মেজর (অব) কামরুল হাসান ভূঁইয়া : মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

Comments

comments