ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ০১ : ২৯ মিনিট

123আর পাঁচজন বিদেশির মতোই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড চাকরি করতে এসেছিলেন এ দেশে। এ দেশ তখন পাকিস্তানের পূর্বাংশে। ১৯৭১ সাল। পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। স্বাধিকারের দাবিতে দৃঢ়সংকল্প বাঙালির আন্দোলনে উত্তাল সমগ্র দেশ।
ওডারল্যান্ড ওই বছরের শুরুতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে যোগ দিয়েছেন বাটা শু কোম্পানিতে। টঙ্গীতে তাঁর কার্যালয়। দেশের পরিস্থিতি আঁচ করতে মোটেই অসুবিধা হয়নি তাঁর। অন্যের বিপদ-আপদে না জড়িয়ে নিরাপদে গা বাঁচিয়ে চলতে পারতেন। কিন্তু ওডারল্যান্ড সেই ধরনের মানুষ, যাঁরা আত্মপর বিবেচনা না করে মানবতার লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধ করা নিজের অনিবার্য কর্তব্য জ্ঞান করেন। তা থেকে পিছপা হন না। জীবন বিপন্ন হলেও সম্ভব সবটুকু সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে যান মানবতার মুক্তির আন্দোলন-সংগ্রামে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ মার্চ বাঙালিদের গণহত্যা ওডারল্যান্ডকে অত্যন্ত বিচলিত করে তোলে। জঘন্য গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিকাণ্ড, নারী নির্যাতন ওডারল্যান্ডের মনে এক পুরোনো ক্ষতকেই যেন নতুন করে জাগিয়ে তোলে। রক্তের ভেতর আবার সেই পুরোনো ডাক অনুভব করেন তিনি যুদ্ধে যাওয়ার। বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্তা ৫৪ বছর বয়সী ওডারল্যান্ড আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন যোদ্ধার ভূমিকায়।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে অবাধে চলাচলের সুযোগ ছিল তাঁর। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে হত্যা-নির্যাতনের ছবি তুলে সেসব ছবি গোপনে বিদেশের গণমাধ্যমে পাঠাতে থাকেন। সেই সঙ্গে চেষ্টা করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যোগাযোগ সৃষ্টির। একটা পর্যায়ে তিনি গভর্নর লে. জে. টিক্কা খান ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জে. নিয়াজি, রাও ফরমান আলীসহ পাকিস্তানি সেনাদের মাথা-মুরব্বিদের সঙ্গে দহরম-মহরম গড়ে তোলেন। সেই সুবাদে তাদের অনেক গোপন পরিকল্পনা, নানা ধরনের সমর তথ্য জানার সুযোগ হয় তাঁর। ওডারল্যান্ড সেসব তথ্য নিয়মিত পাঠাতে থাকেন ২ নম্বর সেক্টরের মেজর এ টি এম হায়দার
রহমানের কাছে। যোগাযোগ রাখতেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গেও।
06সমর তথ্য সংগ্রহের কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই করছিলেন তিনি, যেমন করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাশিবিরে গিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ওডারল্যান্ডের পিতৃভূমি হলেও ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামে। জীবিকার তাগিদে ১৭ বছর বয়সে তিনি একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, পরে সেখান থেকে বাটা শু কোম্পানিতে। জার্মানির নািস বাহিনী হল্যান্ড আক্রমণ করলে তিনি ডাচ্ সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে যোগ দেন। নািসরা ১৯৪০ সালে বিমান হামলায় হল্যান্ডের রটারডাম শহর বিধ্বস্ত করে দেয়, হল্যান্ড চলে যায় তাদের দখলে। ওডারল্যান্ড বন্দী হন জার্মানদের হাতে। তবে কৌশলে তিনি বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের ক্যাম্পে কাজ করতে থাকেন। যোগ দেন ডাচ্ প্রতিরোধ আন্দোলনে। ডাচেদর বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জার্মান ভাষা রপ্ত ছিল তাঁর। এই সুযোগ নিয়ে তিনি জার্মানদের গোপন আস্তানায় ঢুকে পড়েন। তথ্য সংগ্রহ করে পাঠাতে থাকেন মিত্রবাহিনীর কাছে। ১৯৪৩ সালে তিনি কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কমান্ডো সৈনিক ওডারল্যান্ড এই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়েছেন ঢাকায় নানাভাবে। প্রথম পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করলেও শুধু এতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি তিনি। পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হামলা তাঁকে এতটাই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল যে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে। টঙ্গীর বাটা কারখানার ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন প্রশিক্ষণ শিবির। কমান্ডো হিসেবে অস্ত্র, গোলাবারুদ সম্পর্কে তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল। নিজ হাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা যুদ্ধ চালান। ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংস করেন, রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। যুদ্ধের পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাঁদের নগদ অর্থ, খাদ্য ও কাপড়চোপড় দিয়ে নানাভাবে সহায়তা করেছেন।
দেশ স্বাধীন হলো। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এখানে কাজ করে অবসর নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরত যান বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড ‘বীর প্রতীক’। তিনিই একমাত্র বিদেশি, বাংলাদেশ সরকার যাঁকে এই খেতাবে ভূষিত করেছে। ২০০১ সালের ১৮ মে পার্থের একটি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে খুব গর্বভরে নামের সঙ্গে বীর প্রতীক খেতাবটি লিখেছেন আমৃত্যু

আশীষ-উর-রহমান : সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘স্বপ্ন ’৭১  এর প্রথম সংখ্যায় [২০১২]  লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। 

Comments

comments