ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৩ : ১৫ মিনিট

images

ছবি : সংগৃহিত

সোহানার এসএসসির ফল বেরিয়েছে। সে তার স্কুলের অনেক বন্ধুর মতো সর্বোচ্চ গ্রেড পায়নি। পরীক্ষার আগে সে অনেক খেটেছিল, কিন্তু ফলটা আশানুরূপ হয়নি। সোহানার মন খারাপ। দরজা বন্ধ করে ঘরে শুয়ে আছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। মা দুবার ডেকে গেছেন, কিন্তু সে খেতে আসছে না। মা-বাবা তাকে নানাভাবে বোঝাচ্ছেন, কিন্তু তার মন কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে না।

.

নাবিল পরীক্ষা দিয়েছিল ভালো একটি স্কুল থেকে। আশা করেছিল সে খুব ভালো ফল করবে, কিন্তু দেখা গেল তা হয়নি। প্রত্যাশিত ফলের চেয়ে সে অনেক পিছিয়ে। তার ফল শুনেই বাবা রেগে আগুন, বাসা থেকে বের করে দিতে চাইলেন—নানা রকম ধমক আর বিদ্রূপ বাক্যবাণে তাকে জর্জরিত করে ফেললেন ছেলেকে। মা তো কাঁদতে কাঁদতে বিছানা নিলেন আর বলতে লাগলেন, এই লজ্জা তিনি কোথায় রাখবেন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সামনে কীভাবে মুখ দেখাবেন? নাবিল নিদারুণ অসহায় বোধ করতে লাগল।

পরীক্ষা শব্দটির একটি নেতিবাচক দ্যোতনা আছে। লেখাপড়ার বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর মেধা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। পরীক্ষার দরকার আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে তর্ক বিস্তর। সব সময় যে এই পরীক্ষা আর তার ফলাফল সঠিকভাবে মেধা যাচাই করতে পারে তা নয়, কিন্তু এটা প্রচলিত ও স্বীকৃত এক পদ্ধতি। পরীক্ষার প্রস্তুতি, খাতায় উপস্থাপনা এমনকি পরীক্ষকের মান ইত্যাদি বিষয় ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রস্তুতি ভালো না থাকায় প্রত্যাশিত ফল হয় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুব ভালো প্রস্তুতি থাকার পরও পরীক্ষার দিন যথাযথভাবে পরীক্ষা দিতে না পারা এবং পারিপার্শ্বিক অন্যান্য কারণে ফল আশানুরূপ না-ও হতে পারে। কারণ যা-ই হোক না কেন, পরীক্ষার ফল প্রত্যাশিত না হলে পরীক্ষার্থী ও তার বাবা-মা নানা প্রতিক্রিয়া দেখান। এই প্রতিক্রিয়া যদি ইতিবাচক হয়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক। আর নেতিবাচক হলে তা ক্ষতিকর। শিশুর বিকাশের প্রতিটি পর্যায়েই তাকে মূল্যায়িত হতে হয়—এই মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় তাকে উৎসাহিত করা না হলে তার মধ্যে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি হতে পারে, নিজের ওপর থেকে আস্থা চলে যেতে পারে। ছাত্র বা ছাত্রীটির তখন মনে হতে পারে, ‘আমাকে দিয়ে কিছু হবে না।’

আবার অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে যে সফলতার মতো ব্যর্থতাও জীবনের একটি অনুষঙ্গ। ফলে ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মতো তৈরি করতে হবে শিশুকে। ব্যর্থতা মানে যে সব শেষ তা নয়, নতুন করে সফলতার দিকে যে এগোনো যায়, তা শিশুকে শেখাতে হবে। আর যদি সব সময় ‘সফল হতে হবে’, ‘সেরা হতেই হবে’—এমন মন্ত্র শিশুর কানে ঢোকানো হয়, তবে সে ব্যর্থতাকে মেনে নিতে না পেরে অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

ছবি : সংগৃহিত

ছবি : সংগৃহিত

পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না হলে অনেক পরীক্ষার্থীই মুষড়ে পড়ে। নিজেকে গুটিয়ে রাখে, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা যতটা, তার চেয়ে বেশি থাকে লোকলজ্জার ভয়। বন্ধুরা ভালো করেছে, প্রতিবেশীরা ভালো করেছে, স্বজনেরা ভালো করেছে—এই ভাবনা তাকে বাধ্য করে লুকিয়ে থাকতে। এই গুটিয়ে থাকা তাকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত করে ফেলতে পারে, যা তার ভবিষ্যতের চলার পথকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে তার মধ্যে তৈরি হয় আতঙ্ক (প্যানিক), এরপর মানসিক চাপ (অ্যাকিউট স্ট্রেস) আর তারপর বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)। বাবা-মা হয়তো যথেষ্ট দায়িত্বশীল আচরণ করলেন, কিন্তু পরীক্ষার্থী নিজেই নিজের ভেতরে একটা নেতিবাচক চিন্তার জন্ম দেয়, কখনো বেছে নেয় আত্মহননের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত।

বাবা-মায়েরাও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা ও সামাজিক অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে ভেবে তাঁরা সন্তানকে অপ্রত্যাশিত ফলের জন্য দায়ী করেন। রাগ করেন, কটুবাক্য বলেন, বিদ্রূপ করেন, শাসন করেন। কখনো এমন অপমান করেন যে তা সন্তানের জন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। কেউবা মুখে কিছু বলেন না, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে এমন আচরণ করেন যে পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না হওয়ায় সে পরিবারের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে! তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে থাকেন, কথা বলা বন্ধ করে দেন, যা সন্তানের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

মনে রাখতে হবে যে জীবনে সফলতার অর্থ কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বরং সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়া, কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখা। আমরা প্রায়ই বিষয়টি ভুলে যাই। ভালো ফল করার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া, সামাজিকভাবে দক্ষ হওয়া হাজার গুণ জরুরি।

সন্তানের অপ্রত্যাশিত ফল: অভিভাবক কী করবেন?

*  শান্ত থাকুন, দায়িত্বশীল আচরণ করুন। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ভিগাস মিলার তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে বলেছেন, ‘চিৎকার করা, ধমক দেওয়া বা উপদেশ কোনো ভালো ফল আনে না, তাই শান্ত থাকুন।’ তিনি এ-ও বলেন যে ভালো ফলের জন্য বড় পুরস্কার যেমন কোনো উপকারী নয়, তেমনি খারাপ ফলের জন্য তিরস্কার কোনো সুফল আনে না।

*  কেন এমনটি হলো, ভেবে দেখুন। কী হয়েছে, সেটার দিকে নজর কম দিয়ে কেন ফল এমন হলো, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করুন। সন্তানকে দায়ী করে নয়, বরং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য কারণ বের করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত‌ি নিতে সন্তানকে উৎসাহ দিন।

*   শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকদের দায়ী করবেন না। মনে রাখবেন, ওই প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকে প্রত্যাশিত ফলও করেছে। বরং শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলুন, কীভাবে আপনার সন্তান ভবিষ্যতের পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করতে পারে, তা নিয়ে।

*  সন্তানের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। মনে রাখবেন, প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় সে-ও ভেঙে পড়েছে। তার দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিন, এই সময়ে তার পাশে বন্ধুর মতো থাকুন।

*   ভবিষ্যতের পরিকল্পনা: একটি পরীক্ষাই জীবনের শেষ কথা নয়। পরবর্তী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে পরিকল্পনা করুন।

*  সন্তানের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। কেবল যন্ত্রের মতো সন্তানকে ভালো ফলের পেছনে ছোটাবেন না, তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। ফল খারাপের পর তার মধ্যে বিষণ্নতা বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা দেখলে দ্রুত মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

*  দায়িত্ববান হতে শেখান। সন্তানকে কেবল উপদেশ না দিয়ে তাকে নিজের পছন্দ-অপছন্দ বেছে নিতে দিন। তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন। সে বিজ্ঞান পড়বে না মানবিক শাখায় পড়বে, সেটা তার ওপর চাপিয়ে দেবেন না।

*  লোকলজ্জা পরিহার করুন। সন্তানের অপ্রত্যাশিত ফলে লোকলজ্জার ভয়ে ভীত হবেন না। আপনার সন্তান যেমন ফলই করুক না কেন, তা সবাইকে জানান, নিজেকে গুটিয়ে না রেখে ফল মেনে নিতে শিখুন। এটা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য উপকার বয়ে আনবে।

*  নতুন করে পরিকল্পনা শুরুর আগে সন্তানকে বিনোদনের সুযোগ দিন, তার মন ভালো করতে পরিবারের সবাই মিলে পছন্দের কোনো জায়গা থেকে কিছুদিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন।

*  ধৈর্য ধরুন। অনেক সময় কারিগরি বা করণিক ত্রুটির কারণে ভুল ফল আসতে পারে। এ বিষয়টিও মাথায় রেখে ধৈর্য ধরুন এবং প্রয়োজনে ফল পুনঃযাচাই এর সুযোগ নিতে পারেন।

পরীক্ষার্থীরা কীভাবে সামলাবে

*  মোটেও আতঙ্কগ্রস্ত হবে না। মাথা ঠান্ডা করে ফলাফল অভিভাবককে জানাও।

*  বাস্তবতাকে মেনে নাও। যেকোনো কারণেই হোক না কেন, প্রত্যাশিত ফল হয়নি, এটাই বাস্তবতা। তাই নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বাস্তবতাকে মেনে নিত শেখো।

*  গোপন করবে না। ফল যা-ই হোক না কেন, অভিভাবক বা অন্য কারও কাছ থেকে সেটা গোপন করবে না।

*  কেন এমনটা হলো ভাবো, তবে এই ভাবনা যেন তোমাকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। এটা ভাবা জরুরি এ জন্য যে তোমার পরিকল্পনার কোথায় খুঁত ছিল, তা বের করে ভবিষ্যতের জন্য সংশোধিত হওয়া। অর্থাৎ ভুল থেকে শিক্ষা নাও।

*  শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলো। তাঁদের উপদেশ তোমার ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হবে।

*  নিজেকে গুটিয়ে রাখবে না, ফল যা-ই হোক না কেন। পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলো, তোমার ফল যে আশানুরূপ হয়নি, তা তাদের বলো।

*  তোমার ফল যেমনটা হয়েছে, সে অনুযায়ী তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করো।

*  অন্যের সহায়তা চাও। ভবিষ্যতে ভালো করার জন্য বা এই ফলের কারণে তোমার মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশা কাটিয়ে উঠতে তুমি বন্ধু, স্বজন বা শিক্ষকদের কাছে সহায়তা চাও।

*  পড়ার প্রক্রিয়া পরিবর্তন করো। যদি মনে করো যে অনেক পরিশ্রম করেছিলে, অনেক পড়েছিলে, কিন্তু ফল আশানুরূপ হয়নি; তবে নিজের পড়ালেখার পদ্ধতিটি পরিবর্তন করো।

*  হঠকারি কোনো সিদ্ধান্ত কখনোই নয়। আশানুরূপ ফল না হলে মাদক গ্রহণ, পালিয়ে যাওয়া বা আত্মহননের মতো অগ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত কখনোই নয়। এ ধরনের কোনো চিন্তা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবককে জানাও।

আহমেদ হেলাল, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা এবং উপদেষ্টা, মুক্ত আসর।

 

Comments

comments