ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ০৭ : ৪১ মিনিট

May 11th, 2016

২৮

কোনো কোনো জাতির জীবনে বিশেষ বিশেষ ঘটনা জাতীয় আশা-আকাক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে, সংগ্রামী প্রেরণার স্থায়ী উত্স হিসেবে কাজ করে। আমাদের জাতীয় জীবনে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন তেমনই এক ঘটনা। বাহান্নর রক্তঝরা আন্দোলনের সূচনার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি এখন ‘শহীদ দিবসে’র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন এসেছিল মিছিলে, স্লোগানে, সমাবেশে, প্রতিবাদে এবং রক্তিম বর্ণমালার ঝাঁক ঝাঁক ফেস্টুনে একাকার হয়ে। সেই সব রক্তঝরা সংগ্রামী দিন চলে গেছে, কিন্তু পেছনে রেখে গেছে তাদের চেতনার সাক্ষী হিসেবে শহীদ মিনারের দুর্মর ভাস্কর্য।

শহীদ মিনার আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা আন্দোলনের সাহসী ঘটনাবলি, বাঙালির স্বদেশ চেতনার প্রথম রক্তাক্ত পদক্ষেপের ইতিহাস। শহীদ মিনার তাই স্মৃতির মিনার। বাহান্নর ঐতিহাসিক ঘটনাবলির স্মৃতি নিয়ে আবেগে, অনুভবে এক জ্বলন্ত বিশ্বাসে গড়া মিনার। ভাষার অধিকার রক্ষার শপথ নিয়ে এ মিনার সাহসের, সংগ্রামের ও প্রেরণার প্রতীক।

বাহান্ন সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিকেল ছাত্রদের হাতে গড়া প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ আর আজকের শহীদ মিনার যেমন এক নয়, তেমনি তাদের অবস্থানও কিছুটা ভিন্ন। সেই কাঁটাতারে ঘেরা বাঁশ, কাঠ, ইট-সিমেন্টে তৈরি মেডিকেল ব্যারাক যেমন নেই, তেমনি নেই প্রথম শহীদ মিনারটিও। একুশের ইতিহাস জানতে গেলে শহীদ মিনারের ইতিহাসও জানতে হবে আজকের নতুন প্রজন্মকে। জানতে হবে কবে, কখন, কেমন করে, কাদের হাতে তৈরি হয়েছিল প্রথম শহীদ মিনার এবং পরের মিনারগুলো, যে মিনার বাহান্নর পর থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে, আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে এসেছে, গড়ে তুলেছে এক সংগ্রামী ঐতিহ্য, হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ যেখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ, ডিসপেনসারি এবং সেবিকাসদন—এই বিরাট প্রাঙ্গণে এক সময় দাঁড়িয়েছিল মেডিকেল হোস্টেল। বাঁশ, কাঠ, ইট, সিমেন্টে তৈরি কুড়িটি শেড। এর মধ্যে সতেরটিতে বাঁশের ছাউনি, বাকি তিনটির মাথায় টিন। দেয়ালের অর্ধেকটা ইট-গাঁথা, বাকিটা বেড়ার। দেখতে অনেকটা সেনা ছাউনির মতো বলেই এই হোস্টেল ‘মেডিকেল ব্যারাক’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। তখনকার বাম রাজনীতির কেন্দ্র এই ব্যারাকে পা রাখেননি এমন সরকারবিরোধী নেতা কেউ ছিলেন বলে মনে হয় না।

এখন যেখানে বহির্বিভাগের প্রবেশপথ, তার পশ্চিমপাশেই ছিল তখনকার ব্যারাকে ঢোকার গেট, কাঠ ও কাঁটাতারে তৈরি এবং নড়বড়ে। এই গেট থেকে ছাত্রাবাসের বুক চিরে অপরদিকে অর্থাত্ বকশীবাজারের দিককার গেট পর্যন্ত প্রসারিত লাল সুরকির রাস্তা—দুই ধারে সারি সারি ব্যারাক; বাঁদিকে ১, ২, ৩, ৪ করে এগারো পর্যন্ত এবং ডানদিকে ফুলার রোডের কিছুটা সমাস্তরাল অবস্থান নিয়ে ১২ নম্বর ব্যারাক, এরপর ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ নম্বর পর্যন্ত একের পর এক। এর পরের সারিতে পশ্চিম দিকে ফুলার রোডের গা-ঘেঁষে ২০ নম্বর ব্যারাক, এর দক্ষিণে পর পর ১৯ এবং ১৮ নম্বর।

প্রতিটি ব্যারাকের সঙ্গে লম্বা টানা বারান্দা যেখানে বসে বা দাঁড়িয়ে আড্ডা দেবার সুযোগ থাকলেও পড়াশোনায় সিরিয়াস ছেলেদেরই বরং দেখা যেত চেয়ার বা মাদুর পেতে জোড়ায় জোড়ায় ঢাউস ঢাউস বই মেলে পড়াশোনা করতে। শেষ বিকেলে অবশ্য অনেককেই দেখা গেছে প্রাঙ্গণে সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে গল্পে মশগুল হতে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে পাঠ্যক্রম নিয়ে যত সরস আলোচনা।

বাহান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা মাসের হিসাবে ৮ ফাল্গুন, বৃহস্পতিবার আন্দোলনের সূচনা। বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনকে শুরুতেই গুঁড়িয়ে দিতে মুসলিম লীগ সরকার ছাত্র-অছাত্র জনতার ওপর গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এলিস কমিশনের ভাষায় ‘হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি চালানো হয়।’

পাকিস্তানি শাসকের বুলেটে ঝরা রক্ত সেদিন ক্রুদ্ধ ডাক পাঠিয়েছিল জনমানসের উদ্দেশে এবং সে ডাক বৃথা যায়নি। বাইশে ফেব্রুয়ারি থেকে কয়েকটি দিন ঢাকার রাজপথ স্পন্দিত হয়েছে ছাত্র-জনতার ক্রুদ্ধ পদক্ষেপে। ফলে রাজপথে আবার রক্ত ঝরেছে। সেই জানা-আজানা শহীদের স্মৃতি ধরে রাখতে গড়ে উঠেছিল শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, পরে যা ‘শহীদ মিনার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ২২ তারিখ থেকেই মিছিলে জমায়েত অযুত কণ্ঠে নতুন একটি স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে—‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’। হ্যাঁ, শহীদ মিনার শহীদ স্মৃতিকে অমর করে রেখেছে।

আন্দোলনের সেই তুঙ্গ পর্যায়ে প্রতিবাদী মানুষের শাহাদাত বরণের কারণে আবেগতাড়িত মেডিকেল কলেজের সংগ্রামী ছাত্ররা উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন তাদের প্রাঙ্গণে রক্ত-ভেজা ঘাসের বুকে শহীদ স্মৃতি অমর করে তুলতে। এই পরিকল্পনায় বা কাজে ভাষা আন্দোলনের অন্য কোনো নেতা বা কর্মী এগিয়ে আসেননি। মেডিকেল হোস্টেলের রাজনীতিসচেতন সংগ্রামী ছাত্রদের তাত্ক্ষণিক পরিকল্পনার এবং যৌথ শ্রমের ফসল শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি সম্পন্ন হয় একরাতে তেইশে ফেব্রুয়ারি শনিবার। পরদিন রোববার ছুটির সকালে সবাই অবাক হয়ে দেখেছে মেডিকেল ছাত্রদের হাতে গড়া এই অভাবনীয় স্থাপত্য। এবং ওই এক দিনের মধ্যে দেখা গেল ব্যারাক প্রাঙ্গণে দাঁড়ানো শহীদ মিনার মাজারের মর্যাদা অর্জন করে ফেলেছে।

এই প্রথম শহীদ মিনারের কাজ শুরু তেইশে ফেব্রুয়ারি রাতে, কাজ শেষ হয় ভোরের দিকে। কলেজ ভবন সম্প্রসারণের জন্য স্তূপীকৃত ইট, বালি সে রাতে এই মহতী কাজে অংশ নিতে পেরেছিল। সারি বেঁধে দাঁড়ানো ছেলেদের হাতে হাতে কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে ইট চলে এসেছে হোস্টেল প্রাঙ্গণে রক্ত-শুকানো স্থানটির পাশে। ঘাম ঝরেছে, হাত কেটে রক্ত পড়েছে, তবু কারো মুখে কোনো অভিযোগ নেই। শীত রাত আরামদায়ক হয়ে উঠেছে স্বেদাক্ত শ্রমের বিনিময়ে।

মিনারের নকশা আগেই তৈরি হয়েছিল বদরুল আলমের হাতে। রাজমিস্ত্রিও জোগাড় করা হলো। সিমেন্টের অভাব হলো না কনট্রাক্টর পিয়ারুসর্দারের কল্যাণে। গুদামের চাবি এসে গেল ছেলেদের হাতে, বালি ও সিমেন্ট পরিবহনের জন্য হাসপাতালের স্ট্রেচার। ‘এনজিনিয়ার’ নামে পরিচিত দীর্ঘদেহ ছাত্রটি তার আধো অভিজ্ঞতা নিয়েই সে রাতে এই স্থাপত্য কাজের তদারকি করেছে। মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে শহীদ মিনার।

চব্বিশে ফেব্রুয়ারি। ১২ নম্বর ব্যারাক থেকে সামান্য দূরে হোস্টেলের বুকচেরা সুরকি রাস্তার পাশে বাঁশের ছাউনি ব্যারাকের পশ্চাদপট নিয়ে ভোরের আলোয় জেগে উঠল প্রথম শহীদ মিনার। এর গায়ে সযত্নে আঁটা ফলকটিতে লেখা ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। মিনারের পাদদেশ ঘিরে দড়ির বেষ্টনী পোস্টারে ছাওয়া। সেখানে নানা স্লোগানের মধ্যে ‘রাষ্ট্রভাষা তহবিলে মুক্ত হস্তে দান করুন’ কথা কয়টিও ছিল। ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ এবং ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করার’ দাবি।

২৪, ২৫ ও ২৬—১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এই তিন দিন ঢাকা শহরের সব পথের নিশানা শেষ হয়েছে শহীদ মিনারে এসে। পুরান ঢাকা, নতুন ঢাকা একাকার হয়ে গেছে। শহরের ছোট-বড় ছেলেমেয়ে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ, গৃহকর্তা গৃহবধূ সবাই ক্ষণিকের জন্য হলেও শহীদ মিনারের সঙ্গে একাত্ম হতে চেয়েছে। আবেগের উত্তাল ঢেউ, কান্নার করুণ স্রোত নিঃশব্দে বয়ে গেছে। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে দুটো সবুজ পাতার ডাঁটি; কেউ মোনাজাতের ভঙ্গিতে দুই করতল সংযুক্ত করে দাঁড়ানো—এ দৃশ্য ভোলা যায় না। আমাদের জীবনে এ এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনারে এসেও ভক্তিতে মুক্তি খোঁজার এক আশ্চর্য প্রয়াস!

কার পরামর্শ মনে নেই। লক্ষ্মীবাজার এলাকা থেকে শহীদ সফিউর রহমানের পিতা মাহবুবুর রহমানকে ডেকে এনে প্রথম দিনই শহীদ মিনারের অনানুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। সবকিছু দেখেশুনে ভয় পেয়ে যায় সরকার। ভক্তিপথের দুর্বার স্রোতের একমুখী গতি তাদের ভালোভাবেই জানা। মধ্যপন্থীরাও তখন এদিকে মাথা নুইয়ে দিয়েছে, এমনকি দক্ষিণপন্থী দৈনিক ‘আজাদ’ পর্যস্ত। প্রশাসনযন্ত্রের ক্রমাগত অপপ্রচারের মুখে কৌশলগত কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন ব্যবস্থাপক পরিষদ থেকে ইস্তফাদানকারী প্রতিবাদী মুসলিম লীগ সদস্য এবং ‘দৈনিক আজাদে’র সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি সকাল প্রায় এগারোটার দিকে শামসুদ্দিন সাহেব উদ্বোধনের কাজ বেশ ধীরেসুস্থেই সম্পন্ন করলেন। অনুষ্ঠানের কয়েকটি ছবিও তোলা হলো। অবশ্য আজকাল কেউ কেউ এ সম্পর্কে বৃথাই সন্দেহ প্রকাশ করে বিতর্ক সৃষ্টি করছেন। ঘটনাটি এখানো সেখানে উপস্থিত একাধিক মেডিকেল ছাত্রের স্মৃতিতে অম্লান। অনুষ্ঠানের ছবিও দুই-একজনের কাছে ছিল। তাই এ সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

কিন্তু শহীদ মিনারের নিহিত শক্তি ও নীরব চ্যালেঞ্জ মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না পাকিস্তানি আমলাতন্ত্র এবং অবাঙালি প্রধান সেই আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত এ-দেশীয় পুতুল সরকারের নেতৃবৃন্দ। তাই ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি বিকেলে হঠাত্ করেই পুলিশ ঘেরাও করে মেডিকেল ব্যারাক। ভেতরে ঢোকে সশস্ত্র পুলিশ, সঙ্গে ট্রাক এবং কোদাল-শাবল-গাঁইতি হাতে ঘাতক স্কোয়াড। আঘাত পড়ে শহীদ মিনারের পাঁজরে। বেশ কষ্ট করেই ভাঙতে হয় মিনারের স্থাপত্য।

ওরা চলে যায়। যাবার আগে টুকরো টুকরা করে ভাঙা শহীদ মিনারের ইট সিমেন্টের শেষ খণ্ডটি ট্রাকে তুলে নেয়। না, ওদের বাধা দেবার মতো কেউ সেখানে ছিল না, বাধা দেবার কোনো চেষ্টাও করা হয়নি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে শহীদ মিনারের শূন্য স্থানটির দিকে শেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ওরা দ্রুত অকুস্থল ত্যাগ করে। পেছনে রেখে যায় কিছু ধুলা আর পোড়া জ্বালানির উত্কট গন্ধ; সেই সঙ্গে মিনারের নির্বাক বেদনা। দূর থেকে কয়েকজন ছাত্র অসহ্য বেদনায় এই করুণ দৃশ্যটি দেখে আর স্মৃতিতে ধরে রাখে।

স্মৃতিস্তম্ভ গুঁড়িয়ে ফেলা সম্ভব হলেও স্মৃতির মিনার নিশ্চিহ্ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কবির ভাষায় : ‘স্মৃতি যে দুরন্ত লোহার/ বৈশাখী রোদে, কি শ্রাবণের ধারাজল সে টিকে থাকে অফুরন্ত আয়ুর শক্তি নিয়ে। শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেবার পর সেই স্মৃতি ছড়িয়ে গেল দেশময়। সর্বত্র মাথা তুলে দাঁড়াল ছোট-বড় নানা আকারের শহীদ মিনার, বিশেষ করে স্কুল, কলেজ বা প্রতিষ্ঠানের চত্বরে। ‘মিনিয়েচার’ মিনারে ছেয়ে গেল সারা দেশ। শহীদ মিনার দেশ ও জাতির জন্য হয়ে উঠল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রেরণা, জাতীয় সংগ্রামের ধারা বহনকারী উত্স।

 

ভেঙে ফেলার পর সে বছর শহীদ মিনার নতুন করে আর গড়ে তোলা হয়নি; ওরা আবারও সেই স্থাপত্য ভেঙে ফেলবে, এই আশঙ্কায়। তাই ৫৩-৫৪ সালে শহীদ মিনারের অনুপস্থিতিতেই একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হয়েছে। যত দূর মনে পড়ে, পুরোনো শহীদ মিনারের স্থানটিতে লাল কাগজে প্রথম স্মৃতিস্তম্ভের অবিকল ছোটখাটো প্রতিকৃতি তৈরি করে কালো কাপড়ে ঘিরে দেওয়া হয়। পূরণ করা হয় শহীদ মিনারের শূন্যতা। বদরুল আলম, জিয়া হাসান, নুরুল ইসলাম প্রমুখ মেডিকেল ছাত্র এ কাজটি সম্পন্ন করেন। এখান থেকেই একুশের প্রভাতফেরির যাত্রা শুরু হয়। কার্জন হলের প্রাঙ্গণেও একটি ছোট প্রতীকী মিনার গড়ে ওঠে, যেখান থেকে ঢাকা হল এবং ফজলুল হক হলের ছাত্ররা প্রভাতফেরির মিছিল নিয়ে বেরিয়ে আসেন। সে বছর অর্থাত্ ১৯৫৩ সালে ইডেন কলেজ এবং ঢাকা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে কলেজ প্রাঙ্গণে মিনার তৈরির চেষ্টা করে, কিন্তু এক বছর পরও মিনারবিদ্বেষী কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের বাধায় তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি।

তবে যত দূর জানি, মফস্বলে এবং দেশের দূরদূরান্তে গ্রামাঞ্চলের স্কুল কলেজগুলোতে সংগ্রামী ছাত্রসমাজ শহীদ মিনার তৈরি করে অথবা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করেই একুশের কর্মসূচি অর্থাত্ প্রভাতফেরির মিছিল, সমাবেশ, আলোচনা সভা ইত্যাদির অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে। শহীদ মিনার যথেষ্ট সংগ্রামী উত্সাহ ও উদ্দীপনা যুগিয়েছে, যদিও শহর ঢাকা এদিকে থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। এমনি করে শহীদ মিনার দেশের ছাত্র-যুব জনতার মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। চিরন্তনীর মর্যাদা নিয়ে শহীদ মিনার পরিণত হয়েছে স্মৃতির মিনারে।

’৫৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকায় এভাবেই অস্থায়ী শহীদ মিনার একুশে ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি পালনে নিশ্চিহ্ন শহীদ মিনারের শূন্যস্থান পূরণ করেছে, প্রতিবাদী চেতনায় শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে। অবশেষে ১৯৫৬ সালে স্থানীয় সরকার শহীদ স্মৃতি রক্ষার চেষ্টায় এগিয়ে আসে। ফুলার রোডের সমান্তরাল অবস্থানে দাঁড়ানো ২০ এবং ১২ নম্বর ব্যারাকের অংশবিশেষ নিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

তখন কৃষক-শ্রমিক পার্টির সরকার ক্ষমতায়। মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের উদ্যোগে সরকারিভাবে মিনার গড়ার সিদ্ধান্তনেওয়া হয়। সে বছর (১৯৫৬ সালে) একুশে ফেব্রু্নয়ারি দিনটিকে সরকারিভাবে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং সেটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়।

নানা কারণে সে বছর শহীদ দিবস ঘিরে জনমানস এতটাই আলোড়িত হয়ে ওঠে যে, ছাত্র-জনতা একুশে ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা না করে বিশে ফেব্রুয়ারি তারিখে শহীদ আবদুল আউয়ালের ছোট্ট মেয়ে বসিরনকে দিয়ে প্রস্তাবিত শহীদ মিনারের ভিত্তি স্থাপন করায়। পরদিন অবশ্য সে কাজটিই আবার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করেন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম।

এরপর ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার আমলে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরুহয় এবং ১৯৫৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি নাগাদ মিনারের মঞ্চ ও স্তম্ভ এবং নিচে ম্যুরালের কিছু কাজও শেষ হয়। মিনারের কাজে শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন ভাস্কর নোভেরা আহমেদ কিন্তু ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন এবং দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

আবার ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের তত্কালীন গভর্নর লে. জেনারেল আজম খানের উদ্যোগে শহীদ মিনারের অসম্পূর্ণ কাজ শুরু করা হয়। মূল নকশা ও পরিকল্পনার অনেকটা কাটছাঁট করে নিয়ে সংক্ষেপে মিনারের কাজ শেষ করা হয়। এবং ১৯৬৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি নবনির্মিত শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম।

এরপর থেকে এই সংক্ষিপ্ত বা অসম্পূর্ণ শহীদ মিনারই একুশের চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। একাত্তরে পাকবাহিনী এই মিনারই ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলে এবং স্থানটিতে ‘মসজিদ’-এর একটি পরিচিতি চিহ্ন টানিয়ে দেয়। কিন্তু এ দেশের ধর্মনিষ্ঠ সাধারণ মানুষ এই ‘মসজিদ’-কে গ্রহণ করেনি, শহীদ মিনার তাদের চোখে শহীদ মিনারই রয়ে গেছে। বাঙালি জাতিসত্তার এবং তার স্বাধিকার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে এর অস্তিত্ব মুছে ফেলা যায় নি বাঙালির মানস গভীর থেকে।

পাকবাহিনীর হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহীদ মিনার স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন করে তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে এবং কিছুটা জোড়াতালি দিয়ে এর কাজ শেষ করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সালে আবার নতুন করে এর নকশা ও পরিকল্লগুনা অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। আবার ১৯৮৩ সালে পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার তৈরির যে ব্যাপক পরিকল্লগুনা নেওয়া হয়, বর্তমান শহীদ মিনার ও তার চত্বর সেই রূপ বুকে ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বিবেচনায় শহীদ মিনারের মূল পরিকল্পনা ও নকশাদির সঙ্গে তুলনায় এটিও অসম্পূর্ণ মিনার। জানি না, এরপর কোনো জাতীয়তাবাদী সরকার শহীদ মিনারটিকে তার যথাযথ চেহারায় গড়ে তুলবে।

অসম্পূর্ণ শহীদ মিনার আজো সেই অবহেলার প্রতিক্রিয়া বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এবং লজ্জার কথা, একাত্তরের পরও স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ মিনার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরপরও স্বার্থপর রাজনীতিকদের হাতে এর লাঞ্ছনার বিরাম নেই। তবু শহীদ মিনারের মৃত্যু ঘটেনি। সে বরাবর দাঁড়িয়ে রয়েছে সহিষ্ণু মহীরূহের মতো। ছায়া দিয়ে চলেছে, শক্তি ও সাহস যুগিয়ে চলেছে, জাতীয়তাবাদী চেতনার শিকড়ে সংগ্রামী জলধারার পুষ্টি যুগিয়ে চলেছে। তাই এ দেশে নতুন পরিবেশে শহীদ মিনার অসহিষ্ণু মৌলবাদী রাজনীতির অস্তহীন আক্রোশের শিকার হয়ে উঠছে। কিন্তু এদিকে আমরা যথেষ্ট সচেতন বলে মনে হয় না।

তবু শহীদ মিনার বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে। এ দেশ, শহীদ মিনার, স্মৃতির মিনারের মৃত্যু নেই।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী ‍ও উপদেষ্টা, মুক্ত আসর

* লেখাটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১ এর একুশে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে প্রকাশিত হয়।

Comments

comments