ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৮ : ৫৫ মিনিট

নির্মল লালা অগ্নিযুগের সশস্ত্র বিপ্লবী। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অগ্রনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের অন্যতম সহযোদ্ধা। ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন আক্রমণ এবং জালালাবাদ যুদ্ধের প্রখ্যাত সৈনিক। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল সংঘটিত জালালাবাদ যুদ্ধের অন্যতম শহীদ হন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী হাওলা গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৫ সালের জানুয়ারি মাসে জন্ম গ্রহণ করলেও বিশের দশকের শুরুতে তার পিতা যাত্রা মোহন লালা কক্সবাজারে স্থিত হন। ত্রিশের উত্তাল সময়ে তিনি ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ের (বতর্মানে কক্সবাজার সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। কক্সবাজার ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি এবং বিপ্লবীদের গ্রাম সংগঠনের নেতাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে মুক্ত চিন্তা এবং ফরাশি বিপ্লব, সিপাহী বিদ্রোহ, রুশ বিপ্লব, দেশের কথা, যুগান্তরসহ বিপ্লবী সংশ্লিষ্ট বইপত্র পড়ে বিপ্লবী মন নাড়া দেয় এবং দেশকে বৃটিশের কবল থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতেন। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধে যাওয়ার সংকল্প করতেন তিনি।

নির্মল লালা যখন সবে ৮ম শ্রেণিতে উঠেছে তখন চট্টগ্রামসহ সারা বাংলায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের তখন মাত্র দু মাস বাকী। ঠিক এ সময়ে স¤পৃক্ত হন কক্সবাজারের বিপ্লবী গ্রাম সংগঠনে। ওই বিপ্লবী গ্রাম সংগঠনের ছিলেন অমৃতাঙ্কুর সেন (১৯৩৭ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রাম জেলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম অর্গানাইজিং কমিটির (ডিওসি) সদস্য ছিলেন), প্রবোধ কুমার রক্ষিত (যিনি পরবর্তীতে কক্সবাজার মহকুমা আদালতে আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে প্রভূত সম্পদের মালিক হন)। এ সংগঠনের নেতা ছিলেন বিধু সেন(১৯১০-১৯৯৩) । চট্টগ্রামের শাকপুরা গ্রামে পৈতৃক বাড়ি হলেও বিধু সেনের জন্ম কক্সবাজারে এবং ওখানে বসবাস করতেন। ১৯২৯ সালে মাস্টারদা সূর্যসেনের কাছ থেকে কক্সবাজারে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব পান। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম পুলিশ হেডকোয়ার্টার অস্ত্রাগার দখলে অংশগ্রহণ করেন এবং জালালাবাদ যুদ্ধে লড়াই করেন। পুলিশের নজর থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারায় তাঁর উপর মাস্টারদা ও বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের দাযিত্ব দেওয়া হয় তাকে। বেঙ্গল অর্ডিন্যাসে বন্দি হয়ে দীর্ঘ ৮ বছর বিনাবিচার জেল খাটেন।
বিধু সেনের সাথে পরিচিত হন নির্মল লালা। ভাই বলে সম্বোধন করতেন তাকে। বিধু সেনের সহায়তায় কক্সবাজারের স্থানীয় বিপ্লবী কর্মীদের সংস্পর্শে এসে দলের একজন উৎসাহী কর্মীতে পরিণত হন। কক্সবাজার হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে প্রতিদিন আড্ডা দিতেন বন্ধুদের সঙ্গে। ওই সব আড্ডায় দেশমাতাকে বৃটিশ থেকে কবল মুক্ত করার আহ্বানও জানানো হতো। কয়েকজন ছাত্রকে বিপ্লবী দলের সাথেও সম্পৃক্ত করান তিনি। কিন্তু ততটা সফল হতে পারে নি। একেতো বয়স খুব কম। মাত্র ১৪ বছরের যুবকের কণ্ঠে এসব কথাবার্তা শুনে ওই স্কুলের জনৈক এক শিক্ষক তাকে মারধরও করেন। কিন্তু ভালো ছাত্র হওয়ায় তার সুনাম ছিলো প্রচুর। তিনি খুব বেশি জোর করে যে সেও ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ যাবে। তাই দলের প্রধান নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনকে দেখার জন্য তিনি অত্যন্ত আগ্রহান্বিত হয়ে উঠেন। একদিন নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিধু সেনের সহায়তায় উপস্থিত হন চট্টগ্রাম শহরের কংগ্রেস অফিসস্থ মাস্টারদার কাছে। কয়েকদিন চট্টগ্রামে থাকার পর ‘শিগগিরই একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে ’ তা বুঝতে পেরে নির্মল সোজা মাস্টারদা সূর্যসেনের কাছে গিয়ে আবদার ধরল :
‘আপনারা শীগগিরই একটা কিছু করবেন-আমি বেশ বুঝতে পারছি। আমাকে কিন্তু নিতে হবে আপনাদের সঙ্গে।’
১৪ বছর বয়সী নির্মলের এই ধরনের অস্বাভাবিক দাবি শুনে সূর্যসেন তাকে জিজ্ঞেস করলেন :
‘ক’দিন হয় পার্টিতে এসেছ ?’
‘প্রায় দু’ মাস হবে’ নির্মল বলল।
‘কোন ক্লাসে পড়’ ?
‘ক্লাস এইটে’
‘বয়স কত’
‘চৌদ্দ’।
‘এইটুকু বয়সে তুমি কী করে আমাদের সঙ্গে যাবে ?
অনেক করেও মাস্টারদা সূর্যসেনকে রাজী করতে না পেরে নির্মল অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ফিরে আসেন কক্সবাজারে। কক্সবাজারে পৌঁছে ছুটে যান কক্সবাজার বিপ্লবী গ্রাম সংগঠনের সমন্বয়ক বিধু সেনের কাছে। উন্মাদ পাগলের মতো হয়ে বিধু সেনের কাছে আরজি জানালো :
‘বিধুদা যেমন করেই হোক আমি যাবই আপনাদের সঙ্গেÑমাস্টারদাকে রাজী করবার কি কোনো উপায় নেই ? ’
বিধু সেন তার অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পেরে বললেন :
‘তুমি আবার গিয়ে মাস্টারদাকে ধর- এ ছাড়া তো আর আমি অন্য কোনো উপায় দেখছি না।’
বিধু সেনের কাছ থেকে এ ধরনের অভয় পেয়ে নির্মল ফের উপস্থিত হন চট্টগ্রাম কংগ্রেস অফিসে। যাওয়ার সময় প্রতিজ্ঞা করলেন এবার সে আর কক্সবাজারে ফিরে আসবে না।
১৯৩০ সালে কক্সবাজার হাই স্কুলে যারা পড়তেন তাদের অনেকেরই বই কেনার স্বার্থ ছিলো না, যারা গরীব ছিলেন। তা উপলব্ধি করতে পেরে নিজের সামর্থের ভিতরে নির্মল লালা গরীব সন্তানদেরকে সহায়তা করতেন। চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের সাথে যুদ্ধে অংশ করার নিমিত্তে কক্সবাজার ছেড়ে আসার আগের দিন তার সহপাঠীদের ভিতর বন্ধু স্থানীয় কয়েকজনকে ডেকে নিজের বই, খাতা সব বিলিয়ে দেন। তারা অবাক হয়ে এ ধ রনের অস্বাভাবিক দানের কারণ জিজ্ঞেস করতেই আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন-
‘ভাই, আমি আর পড়বো না। আমার সমস্ত বই পত্র তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি। যার যা প্রয়োজন নিয়ে নাও। আমি আর কক্সবাজারে ফিরবো না।’
সহপাঠীরা নির্মল লালার কথার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারলো না। অপলক দৃষ্টিতে নির্মলের দিকে তাকিয়ে রইলো তারা। শুধু বই পত্র নয়, তার অত্যন্ত প্রিয় সুটকেসও তার এক বন্ধুকে দান করে দিলেন। বই পত্র বন্ধুদের দান করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার অভিপ্রায়ে মাস্টার দা সূর্যসেনের সাথে সাক্ষাৎ করতে চট্টগ্রামে চলে যান।
যে বয়সে তিনি বিপ্লবী দলে যোগ দেন তখন কক্সবাজারের শিক্ষা ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিলো না। শুধু তাই নয়, কক্সবাজারের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও তেমন সুবিধের ছিলো না। চট্টগ্রাম শহরের সাথে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় একশো মাইল (১৫১ কিলোমিটার)। তিনি একশো মাইল অতিক্রম করে উপস্থিত হন চট্টগ্রামস্থ কংগ্রেস অফিসে বিপ্লবী দলের নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনের দরবারে এবং চূড়ান্তভাবে কক্সবাজার ছেড়ে আসার কাহিনিও জানান তাকে । এও জানান যে, ‘এবার সে বদ্ধপরিকর হয়ে এসেছেÑকিছুতেই নিবৃত্ত হবে না। নাছোড়বান্দার মতো নির্মল লালা লেগে থাকলো মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গে এবং এক রকম জোর করেই মাস্টারদাকে বাধ্য করলো তার আবদার মেনে নিতে। তারপর জড়িয়ে পড়েন সশস্ত্র বিপ্লবে। তখন নির্মল লালাকে মাস্টারদা এবং আরো কয়েকজন বিপ্লবী ছাড়া বিপ্লবী দলের কেউ তাকে চিনতো না। রূপময় পাল এর ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের শহীদ ও বীরবৃন্দের সংক্ষিপ্ত জীবনী’ নামক নিবন্ধেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই লেখায় তিনি বলেন,
নির্মল লালা টেগরার সমবয়সী। মাস্টারদা এবং আরো কয়েকজন বিপ্লবী ছাড়া বিপ্লবী দলের কেউ তাকে চিনতো না কেননা তিনি বিপ্লবী গ্রাম সংগঠনের কর্মী।’
চট্টগ্রাম বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগে মাস্টারদা সূর্যসেন যারা ছোট, যাদের নাম পুলিশের খাতায় এখনো উঠেনি তাদের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন কিন্তু তাতে সর্বকনিষ্ঠ সৈনিক নির্মললালাসহ অনেকে যুদ্ধ ময়দানে শরিক হওয়া ছাড়া কোথাও যাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
জামাল উদ্দিন তাঁর ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মাস্টারদা সূর্যসেন ও তার সাথীরা’ গ্রন্থে (২২৯ পৃষ্টায়) লিখেছেন-
‘এক সময় মাস্টারদা কাছে ডেকে সস্নেহে বলেছেন- ‘তোমরা যারা ছোট, পুলিশের খাতায় নাম নেই তারা বাড়ি ফিরে যাও’। কিন্তু সাথীদের ছেড়ে যেতে সে (নির্মল লালা) রাজী নয়। দৃঢ়সংকল্পে সে বলেছে- ‘মাস্টারদা, মরতে এসেছি, ফিরে যাওয়ার জন্য তো আসি নি।’
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্যসেন (১৮৯৪-১৯৩৪) সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন। চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহীরা বৃটিশদের হাত থেকে বীর চট্টলাকে ১৮-২২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৪ দিন মুক্ত এবং স্বাধীন রাখে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে একদল যুব বিদ্রোহী চট্টগ্রামে বৃটিশ পতাকা (ইউনিয়ন জ্যাক) নামিয়ে সর্ব ভারতীয় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। ওই সময় কক্সবাজারের নির্মল লালাও উপস্থিত ছিলেন। বিপ্লবী সৈনিক হিসেবে তিনি পুলিশ লাইন আক্রমণে অংশ করেছিলেন।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বৃটিশ বিরোধী চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ (অনেক ধর্মাণ্ড লোকেরা এ ব্রিদোহকে হিন্দু যুবকদের দ্বারা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বলে থাকেন)’র অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম পুলিশ হেডকোয়ার্টার অস্ত্রাগার আক্রমণ এবং ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নির্মল লালা। ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের পর তারা ১৯ এপ্রিল ভোর হওয়ার আগেই পুলিশ লাইন ত্যাগ করে পাহাড় জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়ে। সারা দিন উচু নিচু পাহাড় অতিক্রম করে শহর থেকে কয়েক মাইল দুরে এক নিভৃত স্থানে সবাই স্থিত হলো। সঙ্গে রসদ না থাকায় ২০ এপ্রিল এক রকম অনাহারে কাটালেন তিনিসহ সবাই। ২২ এপ্রিল ঐতিহাসিক জালালাবাদ পাহাড়ে একটি উপযুক্ত স্থান বেছে নিয়ে বিশ্রাম নেয়ার সময় এক রক্ষীর মাধ্যমে বিকালের দিকে বিপ্লবীরা খবর পান ‘দূরে মিলিটারী দেখা যাচ্ছে’। রক্ষীর হুঁশিয়ারী সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই প্রস্তুত হয়ে গেল। বিকেল প্রায় ৫টায় ইংরেজ কর্ণেল ডলাস স্মিথ, ক্যাপ্টেন চার্লস টেগার্ট টেট এবং চট্টগ্রাম ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (পুলিশ বিভাগের) মি. ফারমারের নেতৃত্বে সুর্মাভ্যালি লাইট হর্স (এসভিএলএইছ) ও ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল এবং মিলিটারির ফৌজ নিয়ে জালালাবাদস্থ বিপ্লবীদের উপর আক্রমণ শুরু করে। এ সংঘর্ষে মিলিটারি বাহিনির মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী সোজাসুজি আক্রমণ চালিয়ে পাহাড় দখল করে বিদ্রোহীদের বন্দী করার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় এবং ওই সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হওয়ায় কর্ণেল ডলাস স্মিথের নেতৃত্ব মিলিটারি ফৌজ পৃষ্টপ্রদর্শন সাজোয়া ট্রেনে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান। বেশ কিছুক্ষণ নালার ভিতর কোণঠাসা হয়ে থাকার পর মিলিটারি বাহিনী বাধ্য হয়ে তাদের পূর্ব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নতুন কৌশল হিসেবে জালালাবাদেরই দুটো উচু পাহাড় বেছে নিয়ে মেশিন গান খাটিয়ে বিদ্রোহীদের অবস্থানস্থল জালালাবাদের পাহাড় চূড়ায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে দেয় বৃটিশ বাহিনী। দেখতে দেখতে লুটিয়ে পড়ে বিদ্রোহীদের দশ জন। আহত অম্বিকা চক্রবর্তী, অর্ধেন্দু শেখর দস্তিদার, বিনোদ বিহারী চৌধুরী, সুরেশ সেনসহ আরো কয়েকজন। যুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর মেশিন গানের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথমে বিপ্লবী হরিগোপাল বল (টেগরা) মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হরিগোপালের লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলের সর্বকনিষ্ঠ সৈনিক নির্মল লালাও লুটিয়ে পড়েন। নির্মল লালা যেখানে যুদ্ধ করতে লাগলেন তার পাশেই জিওসি লোকনাথ বলও মাটিতে শুইয়ে রাইফেল চালাচ্ছিলেন। হয়তো তার (লোকনাথ বলের) পিপসা পেয়েছে বলে মনে করে নির্মল বলল- ‘ লোকদা, আমার সঙ্গে একটি কাঁচা আম আছে। খেয়ে নিন’- বলেই আমটি এগিয়ে দিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে তিনি দৃঢ়চিত্তে উত্তেজনাবশত দাঁড়িয়ে পড়লো। শত্র“পক্ষকে নিশানা করে একের পর এক গুলি ছুঁড়তে লাগলো। এমনি সময়ে লুইসগানের গুলি গলায় লাগল, গলার আর মুখের একপাশ উড়ে গেল। তারই রক্তমাখা সবুজ আমটি লোকনাথ বল খেয়ে নির্মলের সবুজ মনের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন এবং পিপাসা নিবারণ করলেন।
এ সময় অপরিচিত সহযাত্রীরা চিৎকার কলে উঠল, ‘মাস্টারদা, একটি ছোট ছেলের গলায় গুলি লেগে পড়ে গেল। ’
জালালাবাদ যুদ্ধের সেই দিনের স্মৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ওই সময়ের বিপ্লবী আনন্দ প্রসাদ গুপ্ত (চট্টগ্রামের প্যারেডস্কোয়ার নিবাসী যোগেন্দ্রমোহন গুপ্তের পুত্র, যাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বৃটিশ সরকার ৫০০ টাকার পুরষ্কার ঘোষণা করে সরকারি ইস্তাকার করে প্রত্যেক থানায় প্রেরণ করেছিলেন) ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের কাহিনী ’ গ্রন্থে (৫৪ পৃষ্টায়) বলেন-
‘মাত্র ১৪ বছর ছিল তার বয়স ! গুলি লাগতেই সে হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল- মাত্র অল্প একটুক্ষণের জন্যে সে দাঁড়াতে পেরেছিল।… সবার দৃষ্টি পড়লো নির্মলের ওপর-‘শুয়ে পড়, শুয়ে পড়, দাঁড়িয়ে থেক না গুলি লাগবে’।- শুয়েই সে পড়ল, আর উঠল না ! বন্দেমাতরম’-শেষবারের মতো তার তরুণ কণ্ঠের জয়ধ্বনি শুনতে হল সবাই…. তারপর তার রক্তাক্ত কিশোর দেহ জালালাবাদের মাটি আঁকড়ে পড়ে রই- চিরদিনের জন্য।’
বাস্তবায়ন হয় নির্মল লালার দেশ রক্ষায় প্রাণ দেয়ার বাসনা এবং সত্যি সত্যি তিনি আর কক্সবাজারে আসেন নি। দেশকে বৃটিশ কবল থেকে মুক্ত করতে প্রাণ দেন।
পরদিন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মি. উইকিলসন এর নির্দেশে ডিআইজি মি. ফারমার, যুদ্ধবাজ লে. কর্নেল ডলাস স্মিথ, সিভিল সার্জন মি কিচিং, পুলিশ কমিশনার মি. জনমন, সার্জেন্ট মোরশেদ, পুলিশ কর্মচারী হেমগুপ্তসহ জালালাবাদ পাহাড়ে যান। তারপর এসডিও, সিভিল সার্জন, একজন ফটোগ্রাফার ও আঙ্গুলের ছাপ নেওয়ার বিশেষজ্ঞ ও দুইজন ডিআইবি অফিসারের উপস্থিতিতে জালালবাদ যুদ্ধে নিহত দশ বিপ্লবী এবং জালালাবাদ যুদ্ধে আহত যোদ্ধা অর্ধেন্দু শেখর দস্তিদারসহ এগার জনের ফটো তোলে এবং তাদের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে তাদের দাহ করা হয় বলে ওই সময়ের ব্রিটিশ পদলেহিত পুলিশ কর্মকর্তা হেমগুপ্ত এর বিবরণে পাওয়া যায়।

কালাম আজাদ: কবি ও গবেষক

 

Comments

comments