ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ১১ : ২৯ মিনিট

শহীদ জননী জাহানার ইমামের সঙ্গে লেখক। ছবি : লেখকের সৌজন্যে

শহীদ জননী জাহানার ইমামের সঙ্গে লেখক। ছবি : লেখকের সৌজন্যে

তাঁর এলিফেন্ট রোডের বাসা কণিকার সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে রেলিং থেকে হাত সরাবার আগেই, সুশৃঙ্খল বসার স্পেসে পা দেবার আগেই রুমির লাইফ সাইজ ছবির সাথে দেখা হয়ে গেলো। এমন সুদর্শন যুবক আমি অনেকদিন দেখিনি। এতো মায়াভরা, দীপ্তিময় চাওয়া! তিনি পাশের বেড রুমে। ভেতরের ফ্যানের হাওয়ায় পর্দা দুলছে। রেডিওতে কি যেন একটা গান চলছে এতোদিন পর মনে করতে পারছি না।

রুমির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাতে গোছা করে আমার তাঁতের শাড়ি একটু তুলে পা থেকে স্যান্ডেল ছাড়াচ্ছিলাম। হাওয়ার ভেতর থেকে আহ্বান এলো, শামীম আমি একটু শুয়েছি। এসো মা ভেতরে এসো।

আমি তাতেই কেঁপে উঠলাম, ‘আমি শহীদ রুমির মা’কে দেখবো।’ আমি এক্ষুণি দেখব, লেখক, বিচিত্রার দূর্দান্ত টিভি ক্রিটিক, নারী আইকন এবং আমাদের সূচিত্রা সেন জাহানারা ইমামকে। স্টাইল, বিদ্যা, বুদ্ধি, সংযম, শিক্ষা, দয়া, আধুনিকতার আকঁড় এই নারী। আর এই সব জেনেছি রুমির সহযোদ্ধা, বন্ধু এবং আমার তখনকার বন্ধু ফতেহ, বাদল, আলম, শা চৌ এদের কাছ থেকে। তারা সবাই এখন তার এক একজন রুমি। সবাই তাকে মা ডাকে। তাদের স্ত্রী কবিতা, নায়লা, তোহিদা, সেলিনা তার পুত্রবধূ। তিনি সপ্তাহে একদিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মাকে দেখতে যান। যুদ্ধের সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানো বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তাঁকে দেখতে আসে কত নতুন মানুষ। আমি তার একজন।

আমি তখন উঠতি গদ্যকার। টিভিতে রেডিওতে উপস্থাপনা ও আবৃত্তি করি। ঈশিতা পাঁচ বছরের প্রজাপতি, সজীব পৃথীতে মাত্র এসে ঘন পাপড়ি ভরা চোখ নিয়ে এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে। আর আজাদ বাংলাদেশ টোব্যাকোর এক গম্ভীর এ্যাকাউট্যান্ট। বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত শাহাদত চৌধুরী তখন আমার সদ্য বস হয়েছেন। মাত্র কিছু দিন হল ঢাকার ফাটাফাটি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টিভি রিভিউ লিখছি। আমার আগে জাহানারা ইমাম লিখতেন। হঠাৎ করে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় তাঁর পুত্র জামি ও পুত্রবধূ ফ্রিডার কাছে গেলে তাঁর কলামটি লেখতে শুরু করেছি আমি। বলা বাহুল্য, আমার সেই প্রথমদিককার টিভি জার্নালিজম নিয়ে আমি কোনো দিন গর্বিত ছিলাম না। কারণ নিজেই জানতাম তাঁর সেই চনমনে হিউমার সমৃদ্ধ কলামের গোড়ায় পড়ে আমার লেখা গোঙ্গাচ্ছে। কিন্তু এমন এক রোল মডেল আইকনের অনুপস্থিতিতে অনাহুত হয়ে আমি তাঁর অপেক্ষায় বসেছিলাম। চিকিৎসা শেষে ক্লান্ত খালা ফিরে এসেছেন। সেখানেই থেকে গেলে তাঁর জন্য ভালো হতো, ফোনে অনেক কথা হয়েছে। আজ তাঁকে দেখবো।

রুমি এই সেই মেলাঘরের রুমি! ওর গায়ে সেনা পোশাক কেন? ঘরের সবদিক যেনো এই মাত্র কেউ শিল্প ও সংস্কৃতির পালকে পরিষ্কার করে গেছে এমন। নামী শিল্পীর অরিজিনালের পাশে কাঠ ও বেতের আসবাব, বইর র‍্যাক। ডান দিকে তাকিয়ে মনে হল ওঠা  খাবার ঘর হবে। আর তার সঙ্গে এই বেড্রুমের প্যারালাল নিশ্চয়ই তার সেই স্মার্ট কিচেন। ফ্রিজের হাতল সুন্দর কাপড়ে ঢাকা। সিংকের কাছে ছোট ছোট হাড়ী ধরার বালিশ! আর বাঁদিক দিয়ে ছাদে ঊঠে গেলেই দেখতে পাব পৃথিবীর সব চেয়ে সুগন্ধী বেলি। সে বেলি তুলে নিলে অর্ধেক করতল ভরে যাবে। কণিকার ছাদের চিলেকোঠা নাকি পৃথীবির তাবত সুন্দর বই এর তাকে ঠাসা। একটা ছোট চৌকি আর চেয়ার পাশে চেয়ার!

শামীম এসো এসো, এখানেই! আমি প্রবেশ করলাম সেই প্রার্থনা লয়ে। সেই শহীদ জননীর ঘরে। এক মহা ব্যক্তিত্বর শোবার ঘরে। পাখার শব্দ বড় হয়ে গেল। ঘরের ঠিক মধ্যে তার বিছানা। মাথার কাছে তাকময় সাইড বোর্ড। বই, কলম পট, লেখার জন্য ছোট ছোট চিরকূট, একটা চা কাপ, সাদা লেসের ঢাকনা দেয়া পানির গ্লাস। লেসের প্রান্তের পুতি গুলো হাওয়ায় রিন রিন করছে। নাকি সে শব্দ আমার মনে বেজেছিলো। আজ আর তাঁর স্মৃতি থেকে সেই রিন রিন শব্দ থেকে তাকে আর আলাদা করতে পারি না।

ওমা! বিছানায় যে নরম  তাঁতের শাড়ি পরা নারী, বহুযুগের অহংকার নিয়ে বালিশে লেপ্টে আছেন- তাকে যে দেখতে একদম আমার মা’র মতই লাগছে। যেনো কত দেখেছি, কত চেনা! একটু উঠে বসলেন। আমার মনে হল পুরো ঘর ফুটে উঠলো। এতক্ষণে চারপাশ দেখলাম। আমি তার পাশে বিছানায় বসলাম। বললেন, ডায়েরীর নোট দেখে দেখে গাজীর জন্য লিখছি। সে ছিল তার একাত্তরের ডায়েরী লেখার কাল। ঝাকড়া চুলের গাজী ভাই তখন সে সময়ের অন্যতম সাহিত্য সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক ও সন্ধানী প্রকাশনীর স্বত্তাধিকারী। সেখানে আমার এক আধটা লেখা ছাপা হচ্ছে।

দেখলাম চিকিৎসাত্তর ক্লান্তির পাশে তার অবয়বে লেখার অনন্য প্রত্যয়। উঠে বাঁদিকের লেখার টেবিলের উপর থেকে একটি ডায়েরী নিলেন। যেকোনো স্থানে খুললেন। তারপর তার সাংকেতিক নোটগুলো থেকে গল্প করতে শুরু করলেন।

এখনকার দিনে আমরা যাকে বুলেট পয়েন্ট বলি সে রকমই। তারিখের নিচে এমন করে আকারে ইঙ্গিত লেখা যাতে সে সময় আর্মির হাতে ধরা পড়লেও তাদের বাবার সাধ্য নেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তার দৈনন্দিন যোগাযোগ বোঝে! আমরা দুজন হেঁটে রান্নাঘরে গেলাম। গ্যাসের বা ইলেকট্রিক সাদা চুলা। কেটলীটার হাতলটা এলিয়ে পড়ে আছে। চারদিকে কিচেন ওয়ার্কিং স্পেস। বাইশ বা চব্বিশ ফুট উঁচু হবে। তারই মধ্যে রূপালী সিংক। চুলোর উল্টো দিকে সেই কাপড় ঢাকা ফুলতোলা হাতলের বিশাল ফ্রিজ। কি আধুনিক! অথচ কত আগে তার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী শরীফ খালুর করা।

এতক্ষণে মনে হল তিনি একটু টেনে কথা বলছেন। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো স্মৃতি কাতরতা, হয়তো মন খারাপ দেশের কথা ভেবে। তবু কি সুন্দরীরে বাবা। রাহমান ভাই, হুমায়ূন ভাই তারা তাকে দেখেছেন তখন।  এতক্ষণে তিনি কবার আমাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। আমি তাঁর সুগন্ধ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে যেনো আমার কোন জনমের সখি। তাঁর ত্বকের লাবণ্যে অবাক হয়ে বলি এত তারুণ্য কি মাখেন? এবার কিশোরীর মত কল কল করে বলেন, শুধু গ্লিসারিন আর গোলাপ জল।

সেই ছিল আমার সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের প্রথম রোজ ওয়াটার। তারপর তারই সঙ্কেত ও সাহায্যে আমি গড়ে উঠতে থাকি। থাকি এই বিলেতে চাকুরি করতে আসার আগে পর্যন্ত।

শামীম আজাদ :  কবি ও লেখক

আরও পড়ুন: 
জয় আমাদের হবেই : জাহানারা ইমাম
কী ছিল আম্মার মধ্যে? : সাইফ ইমাম জামী
রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বিছানায় উঠে বসে থাকি : জাহানারা ইমাম

Comments

comments