ঢাকা, সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ | ১১ : ০৯ মিনিট

April 13th, 2016

মীর রবি

ভাষা সংগ্রামী মীর আনিসুল হক পেয়ারা। জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। রংপুর শহরের মাহিগঞ্জে জন্মেছেন তিনি। শহরের আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে মাধ্যমিক ও কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। ১৯৭১ সালে করেছেন মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ সময় মাহিগঞ্জের আফানউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি আজও ছুটে চলেছেন দেশের কাজে। সংগঠন ও সমাজসেবায় একজন পরিচিত মুখ। আলাপচারিতায় ভাষা সংগ্রামের সেই উত্তাল দিনগুলির কথা নিয়ে তাঁর সাথে অনেক কথা।

মীর আনিসুল হক পেয়ারা।

ভাষা আন্দোলন না ভাষা সংগ্রাম ? সে যা-ই হোক, আমার কাছে এখনো ভাষার জন্য লড়াইটা ভাষা আন্দোলন ও সংগ্রামের একত্রীয় একটা অনুভূতি। এই ভাষাভিত্তিক চেতনা বোধটা কিন্তু বাঙালি সমাজে ধীরে ধীরেই গড়ে উঠেছিল। বারবার যখন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা উত্থাপন করে তখনই কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দি ক বাঙালি চেতনা বোধটা তীব্রভাবে উজ্জীবিত হয়, যা একটা আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। তাই আমার জীবনসায়াহ্নে এসেও মনে হয়, ভাষা আন্দোলন শেষ হলেও সংগ্রামটা কিন্তু শেষ হয়নি। সংগ্রাম মনে হয় গতিশীলই। কেননা এখনো বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে চালু করার একটা সংগ্রাম চলছেই। কথাগুলো স্মৃতি আর আবেগ নিয়ে বললেন ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা মীর আনিসুল হক পেয়ারা দাদু, যিনি শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া অঙ্গনের একজন উজ্জ্বল মানুষ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বললেন, পাকিস্তানিরা যখন বাঙালির ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করল তখন থেকেই বাংলার জনসাধারণের মাঝে প্রবল একটা ক্ষোভ জন্ম নেয়। আর ক্ষোভটাকে আরও উসকে দেয় পাকিস্তানি শাসকদের দম্ভোক্তি। খাজা নাজিম উদ্দিন, নুরুল আমিনের বক্তব্যে ঘুরেফিরে যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণের প্রতিধ্বনি হয়, তখন তা ভাষা আন্দোলনটাকে আরও বেশি বেগবান করে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এতে শুধু ঢাকা নয়, এর প্রতিবাদে ঢাকার বাইরেও একটি প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দাবি ওঠে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার।

দাদুভাই স্মৃতিকাতর হয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, তখন (১৯৫২) আমি কারমাইকেল কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। তখন জিন্নাহর ভাষণ আমাদেরকে শিহরিত করে তোলে। কবি সুকান্তের ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতার মতোই। বয়সের কারণেই শুধু নয়, বিবেকের তাড়নায় ভাষার প্রেমে আবেগী হয়ে উঠি। আর আমি এটাও বুঝতে পেয়েছিলাম যে এটা আমাদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গু করার একটা পাঁয়তারা। বাঙালি চেতনায় উজ্জ্বীবিত আমরা চরম আঘাত অনুভব করি। আর এই বোধ থেকেই ঢাকার মতো আমরাও রংপুরের রাজপথে আন্দোলনে নামি। সেটা ওই ২১ তারিখই। আমাদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন শাহ্ আব্দুর রাজ্জাক, সুফি মোতাহার হোসেনসহ অনেকে। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই দিনটার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিনের অনুভূতিটা যে কেমন ছিল, তা আজ বলে বোঝানো যাবে না। ভাষায় প্রকাশ করা তা অসম্ভব। আমরা কিন্তু সে সময়টায় চরম একটা ক্ষোভের মাঝে ছিলাম। তোমরা এখন যারা নতুন প্রজন্ম, আমাদের কাছে যখন এসব ঘটনা শুনছো তখন এটা তোমাদের কাছে গল্লগু মনে হবে। কিন্তু, এটাকে কখনো গল্প ভাবা যাবে না। এটা ইতিহাস এবং চিরন্তন সত্য।
আমাদের কৃতী সন্তান, পেয়ারা ভাইখ্যাত এই ভাষাসৈনিকের কাছে বাংলা ভাষা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য লড়াই এটাই প্রথম। এটা বাঙালির জন্য গৌরবের, অহংকারের। এটাকে শুধু গৌরব গৌরব বলে ইতিহাসের পাতায় ফেলে রাখলে চলবে না। এর চেতনাকে কিন্তু লালন করতে হবে। এর জন্য নতুন প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে। সম্ভাবনাময় তারুণ্যের শক্তি দিয়ে একে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য দরকার বেশি বেশি বাংলা ভাষার বই পড়া ও সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করা। শুদ্ধ করে বাংলা বলা ও লেখা । বিশেষত বলব বর্তমানে যে তরুণেরা রেডিও, টেলিভিশন বা অন্যান্য গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কাজ করছে, তাদের কিন্তু বাংলা ভাষায় অনেক অনেক যত্নশীল হতে হবে। বাংলিশ বলা বা লেখা যাবে না। বাংলা শব্দের বিকৃত উচ্চারণ করা যাবে না। আর এ জন্য পাঠাভ্যাসও গড়ে তোলা দরকার। সেই সঙ্গে শিক্ষকদেরও উচিত শিক্ষার্থীদেরকে বাংলায় শুদ্ধভাবে পাঠদান করা।

রংপুরের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের কথায় বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল শহীদ মিনার নির্মাণ। কিন্তু ওই সময় নানা কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এক রাতেই শহরের পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় ইট ও কাদামাটি দিয়ে। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি এই শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় এই শহীদ মিনারটিও ভেঙে ফেলা হয়। ওই স্থানেই শহীদ মিনার নির্মাণ করেন পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ আফজাল।
তার আরও অন্যান্য কথায় ফুটে ওঠে বাংলা ভাষার সংগ্রাম থেমে নেই, এখনো সেই সংগ্রাম চলছে। সর্বস্তরে বাংলা চালু না হওয়া পর্যন্ত এটা চলবেই। সর্বোপরি তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা করেন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিস্তা বোধের শক্তির। তিনি মনে করেন ভাষার জন্য ত্যাগ সেদিনই সার্থক হবে যেদিন বাঙালির চেতনাবোধকেন্দি ক চিস্তা ও চেতনাবোধের পূর্ণ জাগরণ হবে, জন্ম হবে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের নতুন প্রজন্মের।

* লেখাটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১ এর একুশে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে প্রকাশিত হয়।

Comments

comments