ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ২১ মিনিট

April 10th, 2016

মোহাম্মদ সুলতান

21_Feb_15952_just_before_breaking_Curfew

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৪৮ সালে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলো, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সে সময় থেকেই ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গণপরিষদে প্রথম এবং পরে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন উর্দুর পক্ষে বক্তব্য রাখলেন, তখন সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন বিশেষ করে ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদ করে এবং তখন থেকেই আন্দালনের সূত্রপাত। জিন্নাহ সাহেবের উক্তির প্রতিবাদের ঢেউ রাজশাহী গিয়েও পৌঁছল। আমি ঢাকা আসার পূর্বেই ’৪৮ সাল থেকেই বাংলা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করি। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ ’৪৮-এর ১১ মার্চ ধর্মঘট পালন করে। তখন আমি রাজশাহী কলেজে বিএ ক্লাসের ছাত্র।

১১ মার্চ রাজশাহীতে আমরা মিছিল, সভা ও ধর্মঘট করেছিলাম। প্রধানত রাজশাহী কলেজ-স্কুলের ছাত্ররাই এসব মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। সেদিন কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আমরা কোনো রকম সাহায্য, সমর্থন পাইনি। একরামুল হক, আতাউর রহমান, তাওয়াব (পরবর্তীকালে এয়ার ভাইস মার্শাল) প্রমুখই রাজশাহীতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমি নিজেও আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলাম। ’৪৮ সালে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিলাম না। তবে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আমার একটা মোহ বরাবরই ছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তানে মোটামুটিভাবে রাজনৈতিক দল বলতে পাকিস্তান মুসলিম লীগকেই বোঝাত। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম তখনো হয়নি। আমি যেহেতু কোনো দিন সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করিনি, সেহেতু এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মতো কোনো কারণও ঘটেনি। ’৪৮ সালে রাজশাহীতে আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলাম। এ সংগঠন কিছুটা রূপও নিয়েছিল। এ সময় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাজশাহীতে এলে আমরা তাকে কালো পতাকা দেখিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করি। আমাদের প্রধান স্লোগান ছিল—গো ব্যাক লিয়াকত আলী। আমরা ক’জন যেহেতু বামন্থী রাজনীতির প্রতি দুর্বল ছিলাম, সে জন্যই বোধ হয় পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই স্লোগান তুলেছিলাম, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’

১৯৪৮ সালের প্রথমদিকে অসাম্প্রদায়িক যুব সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক যুব লীগ’-এর জন্ম হয়। ঢাকার মতো রাজশাহীতেও অসাম্প্রদায়িক ও সাম্র্রাজ্যবাদবিরোধী যুব সংগঠনটির প্রসার ঘটে। রাজশাহীতে আমাদের নেতৃত্বে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ বেশ তত্পর ছিল। জনাব আতাউর রহমান ও এশরামুল হক, এ দুজন প্রতিনিধি রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য। সরকারি চরম নির্যাতনের মুখে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ এক বছরের বেশি টিকে থাকতে পারেনি। এর পরে ১৯৫১ সালে যুব সংগঠনের আর একটি রূপ দেখা দেয় ‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’-এর জন্মের মধ্য দিয়ে। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগকেই বলা যায় পূর্ব পাকিস্তানে সর্বপ্রথম একটি বামপন্থী যুব সংগঠন। এ সংগঠনের প্রধান বক্তব্য ছিল, পাকিস্তান সৃষ্টিটাই হচ্ছে একটি সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র।

১৯৪৮ সালে আমি ঢাকায় আসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। ১৯৪৮ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ ছিল। এর জন্ম হয় ’৪৮ সালেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আমি এসে আবদুল মতিনকে এর আহ্বায়ক হিসেবে দেখতে পাই। ১৯৫১ সালে অর্থাত্ পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের জন্মলগ্ন থেকেই আমি একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে অংশগ্রহণ করি। আমিই প্রথম এ সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক মনোনীত হই। বাংলা ভাষা আন্দোলনে অসাম্প্রদায়িক ও সাম্র্রাজ্যবাদবিরোধী এই যুব সংগঠনটির অবদান অনন্য। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ যখন সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করে যে, একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি হলে আমরা তা ভাঙব না, তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’ই প্রথম এর বিরোধিতা করে। সভায় যুবলীগের প্রতিনিধিত্ব করেন অলি আহাদ এবং মোহাম্মদ তোয়াহা। অলি আহাদ প্রথমেই প্রস্তাব রাখেন যে, এ প্রস্তাবের সঙ্গে ‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’ একমত নয়। অপরদিকে জানা গিয়েছিল যে, আওয়ামী মুসলীম লীগ যে সিদ্ধান্ত নেবে কমিউনিস্ট পার্টি তার বিরোধিতা করবে না। যেহেতু আওয়ামী মুসলীম লীগ সিদ্ধান্ত নেয় তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে না, সেহেতু কমিউনিস্ট পার্টি ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত যথাযথ নয় মনে করে আমরা ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে যুবলীগ অফিসে একত্র হই। সেক্রেটারি অলি আহাদ, যুগ্ম সম্পাদক ইমদাদুল্ল্লাহ ও আমি একত্র হয়েছিলাম। যুবলীগ অফিসে আমরা তিনজন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, যুবলীগের সিদ্ধান্ত হবে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে। যুবলীগের অফিস ছিল ৪৩/১ যুগীনগর লেনে। দুপুরের দিকেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের এই সিদ্ধান্ত প্রতিটি হলসহ সর্বদলীয় কর্মপরিষদকেও জানিয়ে দেওয়া হয়।

মোহাম্মদ তোয়াহা এবং অলি আহাদ কর্মপরিষদে যুবলীগের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি ২০ তারিখের সর্বদলীয় কর্মপরিষদের সভায় ছিলেন না, কেননা তখন কমিউনিস্ট পার্টি খোলাখুলিভাবে তাদের কর্মতত্পরতা চালাতে পারছিল না। শহীদুল্ল্লা কায়সার এবং মোহাম্মদ তোয়াহা কাগজে-কলমে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব না করলেও সবাই জানতেন তারা দু’জন  কমিউনিস্ট পার্টিরও আপন লোক। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মহলটার সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক ভালো ছিল, সুতরাং তাদের কোনো কথায় সেদিন কেউ বাধা তো দেয়নি বরং ধৈর্য সহকারে তাদের বক্তব্য শোনার চেষ্টা করেছে। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন, ইব্রাহিম তাহা যদিও একটি প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের (ইসলামিক ব্রাদারহুড) প্রতিনিধি ছিলেন, তথাপি তিনি ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সে সভায় মত দিয়েছিলেন। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে দুটি কণ্ঠ সেদিন সোচ্চার হয়েছিল, জনাব অলি আহাদ ও জনাব ইব্রাহিম তাহা। জনাব মতিন ওই সভায় তেমন কোনো মতামত সেদিন দিতে পারেননি সত্য, তবে আগামীকাল অর্থাত্ (একুশে ফেব্রুয়ারি) ছাত্রদের সভায় যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, সে সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে বলে মত দেন। দীর্ঘ আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক শেষে ওই সভা ২১ তারিখে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে অলি আহাদের আনা একটি প্রস্তাব গৃহীত ও সংযোজিত হয়। তার প্রস্তাব, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসভা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পথে নেমে পড়ে, তাহলে উক্ত কমিটির সিদ্ধান্ত বাতিল বলে গণ্য হবে এবং ওই কমিটিও বাতিল বলে ধরে নেওয়া হবে।

২০ তারিখের সভায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আতাউর রহমান ও গোলাম মাহবুব উপস্থিত ছিলেন। জনাব শামসুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে জনাব মতিন, বিভিন্ন হলের ছাত্র প্রতিনিধি, যুবলীগ সদস্য, তমদ্দুন মজলিসের কর্মী প্রমুখও উপস্থিত ছিলেন। ৯৪ নম্বর নবাবপুর রোডে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা আনুমানিক পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে রাত আটটা পর্যন্ত চলে। এ সভার সিদ্ধান্ত আমরা পূর্বেই অনুমান করেছিলাম। কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাবও আমরা জানতাম। এ সভার প্রস্তাব ও অন্যান্য সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই আমরা ছাত্রদের সংগঠিত করতে শুরু করি। এখানে উল্ল্লেখ করা দরকার, ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত একচেটিয়াভাবে বামপন্থী ছাত্ররাই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রসংসদ দখল করে থাকে। সুতরাং আমাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্ররাও আমাদের সঙ্গে ছিল। এই হলে জনাব আব্দুল মতিন থাকতেন। ঢাকা জগন্নাথ হল কেবল হিন্দু ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এ দুটো হলের হিন্দু ছাত্ররাও আমাদের প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গেই ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি এতটুকু বুঝি যে, ঢাকার ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তুত।

একুশের কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন এবং আন্দোলনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য আমরা কয়েক জন ছাত্র ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে কতকগুলো সিদ্ধান্ত নিই। সে সিদ্ধান্ত এবং কর্মসূচিকে ঐতিহাসিকভাবে সঠিক বলে মনে করি। আমরা এগার জন ছাত্র ঢাকা হলের পুকুরের ঘাটে (বর্তমানে শহীদুল্ল্লা হল) এবং ফজলুল হক হলের মাঝানে যে পুকুরটি আছে সেখানে রাত একটার সময় ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এগারোজনের মধ্যে জনাব গাজীউল হক, জনাব হাবিবুর রহমান শেলী, এম আর আক্তার মুকুল, এস এ বারী এটি, জিল্ল্লুর রহমান, আবদুস সামাদ (আজাদ), কমরুদ্দিন সহুদ এবং আমি নিজে ছিলাম। বাকি ছাত্রদের নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। পূর্বেই আমাদের বিশ্বাস জন্মেছিল, ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’-এর সদস্যরা ২১ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠেয় সভাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করবে। ইতিপূর্বে ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে পুনরায় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা—ঘোষণা করলে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ আমতলায় খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদে এক ছাত্রসভা আহ্বান করে। আমরা ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক ধর্মঘট পালন করি এবং আমতলার সভায় নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। ওই সভায় ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশব্যাপী সাধারণ ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান জানানো হয়।

তদানীন্তন সরকার ২১ তারিখ পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের সভা আহবান করেছিল। আইন পরিষদের সম্মুখে বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে কালো দিবস ও প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। একুশের ভোরবেলা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছলাম। পূর্বের রাতের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ তখন মাত্র গড়ে উঠেছে, ঢাকা কলেজের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ স্থাপন করি। মেয়েদের সঙ্গেও যোগাযোগ করি। সুফিয়া খাতুনসহ অন্যরাও মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এদিকে ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার মধ্যেই সমস্ত ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ রমনা এলাকাতেই পুলিশ পেট্রোলিং শুরু হয়।

ওই দিন সন্ধ্যায়ই পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়েছিল বিকেল তিনটায়। বর্তমান জগন্নাথ হলের মাঝখানে যে ছোট্ট পুলটি আছে সেইটি ছিল তখনকার দিনের আইন পরিষদ ভবন। পরিষদ ভবনের ঠিক উল্টো দিকে জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস একবারে সঙ্গেই ছিল। মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ কলেজের উল্টোদিকে, সলিমুল্ল্লাহ মুসলিম হলের পাশে। সুতরাং তত্কালীন মুসলিম লীগ ঘোষিত শত্রু পরিবেষ্টিত এলাকাতেই আইন পরিষদ সভা ২১ তারিখেই অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দেয়া হলো। সুতরাং আমরা পরিষ্কার ধারণা করেছিলাম যে সরকার কোনো অবস্থাতেই আমাদের ১৪৪ ধারা ভাঙতে দেবে না। ২০ তারিখের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত সমগ্র ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি বলব, এ সিদ্ধান্ত ছিল অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর মানসিকতার বিরুদ্ধে। এখানে আর একটি কথা না বলে পারছি না তাহলো, সমস্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও আমাদের গুটিকয়েক ছাত্রের পক্ষে গোটা ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দান, ধর্মঘট বাস্তবায়িত করা এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গকরণ একটি সুকঠিন পদক্ষেপ ছিল। সেদিক থেকে ২০ তারিখের গভীর রাতে আমাদের ১১ জন ছাত্রের একান্ত সভা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বৈকি।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল নয়টার দিকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্ল্লা কায়সার, মোহাম্মদ তোয়াহা এদেরকে আমাদের রাতের সিদ্ধান্ত এবং আমাদের কর্মসূচির কথা জানিয়ে দিই। আমরা যে ১৪৪ ধারা ভাঙতে যাচ্ছি, এ কথাও পরিষ্কারভাবে তাদের জানিয়ে দিই। শহীদুল্ল্লা কায়সার ও তোয়াহা আধঘণ্টা পর তাদের মতামত জানাবেন বললেন। ইতিমধ্যে রাতভর লেখা বহু পোস্টার সকাল থেকেই লাগানো শুরু করা হয়। পোস্টারে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সকল শ্রেণীর ছাত্র-জনতাকে এগিয়ে আসার আহ্বান ছিল। আর্টস কলেজের এমদাদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর প্রমুখের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তারা সেদিন ওই সব পোস্টার জোরালো বক্তব্য দিয়ে ভরে তুলেছিলেন, সারা রাত ধরে কাজ করেছিলেন তারা।

 

শহীদুল্ল্লা কায়সার এবং তোয়াহা সাহেব ফিরে এসেছিলেন এবং তারা বললেন, কমিউনস্টি পার্টি মনে করে ১৪৪ ধারা ভাঙা ঠিক হবে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যদি ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েই নেয়, তাহলে যেন তা সত্যাগ্রহীর আকারে করা হয়। অর্থাত্ আমরা যে মিছিল করতে যাচ্ছি, সে মিছিল ১০-১১ জনের একেকটি দল যেন একে-একে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হই। ১৪৪ ধারা জোর করে ভেঙে সমস্ত আন্দোলনটি যাতে বিশৃঙ্খল-বিক্ষিপ্ত রূপ না নেয়, তার জন্যই আমরা প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়েছিলাম।

পুলিশ বহু ট্রাক, বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি জমা করে রেখেছে দেখলাম। ওই দিন পুলিশি জুলুমের পক্ষে তত্কালীন ডিআইজি মি. ইদ্রিসের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগ্ন। এ সময় ঢাকার ডিএম ছিলেন আজীজ আহমদ। জনাব আহমদ পরবর্তীকালে পাকিস্তান সরকারের উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। জনাব আজীজ আহমদ এবং জনাব ইদ্রিস একুশের মিছিলকে বানচাল করার পুরো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সকাল সাতটা থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জমায়েত হতে থাকে। বেশকিছু রাজনৈতিক নেতৃবর্গও সকাল ৯-১০টা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছে যান।

বেলা ১১টার দিকে সভা শুরু হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সভাপতি হিসেবে গাজীউল হকের নাম প্রস্তাব করা হলো। সমর্থন করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা। প্রথম বক্তা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের জনাব শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে বক্তব্য রাখলেন, কিন্তু উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের সংগ্রামী চৈতন্য সেটাকে কার্যকর হতে দেয়নি। সভা সিদ্ধান্তনিতে বাধ্য হলো, ১৪৪ ধারা ভাঙতেই হবে। জমাটবদ্ধ বরফ আমাদের গুঁড়িয়ে যেতেই হবে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিছিল শুরু হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক জনাব হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে প্রথম ১০ জনের দলটি বিশ্ববিদ্যালয় গেট অতিক্রম করে এগিয়ে গেল। তারপর একটির পর একটি করে দশজনী মিছিল বেরিয়ে যেতে লাগল প্রচন্ড প্রতিযোগিতা করে—আগে কে যাবে।

ইতিমধ্যে দেখা গেল আগে থেকে মোতায়েন পুলিশ বাহিনী দশজনী দলগুলোকে ঘেরাও করে জোর করে বাস বা ট্রাকে তুলে নিচ্ছে। হঠাত্ করে পুলিশ মিছিলকারীদের ওপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করে। ইতিমধ্যে মেয়েদের দশজনী মিছিল বের হতে শুরু করেছে। পুলিশ বাহিনী কোনোমতেই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো সংগ্রামী মিছিলকারীদের ঠেকাতে পারছিল না। শুরু করলো কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ। এর আগেও পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে দেখেছি। কিন্তু এরূপ নারকীয় প্রস্তাব আর কোনো দিন দেখিনি। পুলিশ বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের দিকে বুকে হেঁটে এগিয়ে (আমার দায়িত্ব ছিল গেট দিয়ে যেসব দল বের হবে, তাদের নাম-ঠিকানা লিখে রাখা) আসছে, আর মনে হলো একসঙ্গে শত শত টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে চলেছে। ক্ষণিকে সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় মাঠ, ক্লাসরুম, শিক্ষকদের বিশ্রামাগার কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন গাজীউল হকসহ কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী। একটি টিয়ার গ্যাসের শেল গাজীউল হককে আঘাত করে আহত করলো। আরও অনেকে আহত হলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও ঠাঁই নেওয়ার জায়গা নেই। শত শত ছাত্র পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে টিয়ার গ্যাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য, মেয়েরা ছোটাছুটি করছে, কেউবা জীবন রক্ষায় শিক্ষকদের বিশ্রামাগার বা নিচের তলার পাঠাগারে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলেছে, রেহাই কোথাও নেই। কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল কলেজের সমস্ত ওয়ার্ড।

প্রায় আধঘণ্টা পর আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবর্গ কালো ধোঁয়ার আন্তরণ ভেদ করে নিচে নেমে এলেন। মধুর রেস্তোরাঁ ও প্রক্টরের বাড়ির মধ্যবর্তী স্থান থেকে সরকারি কর্তৃপক্ষে সাথে কথা বলতে চাইলেন তারা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঢাকার জেলা ম্যজিস্ট্রেট জনাব আজিজ আহমদ। তাকে ডেকে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী (তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর ছিলেন তখন) ও অন্য শিড়্গকম্ললী পুলিশি নারকীয় অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। আমার বেশ মনে আছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আজিজ আহমদ সেদিন বলেছিলেন, ‘তোমাদের মতো অনেক লোক আমার পকেটে ঘুরে বেড়ায়।’ দুপুর প্রায় সাড়ে ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জনাব এম হোসেন শিক্ষকদের মাঝে এলেন। কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি জুলুমের এবং নিরীহ মিছিলকারীদের ওপর অমানুষিক অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় তিন দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করলেন।

মিছিলকারীরা কতজন গ্রেফতার হলেন, কতজন আহত হয়েছিলেন তার হিসাব দেওয়া আর সম্ভব নয়। তবে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী সেদিন গ্রেফতার হয়েছিল। পুলিশ ভ্যানে, ট্রাকে বা বাসে তাদের তুলে নিয়ে গেছে। টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের সময় বিশ্ববিদ্যালয় গেটও মুক্ত থাকেনি। শেলের আঘাতে আমার হাতের খাতা-কলম কখন কোথায় উড়ে গেছে, তা নিজেও জানি না। সেদিন দেড় ঘণ্টায় অন্ত্মত দুই হাজার ছাত্রী পুলিশের উ”ত সঙ্গিনের খোঁচা ও লাঠির আঘাতে রমনার রাস্তা অভিশাপমুক্ত করতে চেয়েছিলেন, যে দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারি না। ভোলারও নয়। ভুলতে পারি না বরকতের কথা। সকাল নয়টায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শেষ বর্ষের দীর্ঘদেহী ছাত্র আবুল বরকত মধুর রেস্তোরাঁর বারান্দায় বগলে একতাড়া পোস্টার নিয়ে ছোটাছুটি করছে। তখনো সে কেন পোস্টার নিয়ে ঘুরছে, জানতে চাইলে উত্তর দিয়েছিল, ‘আর কটাই তো পোস্টার রয়েছে, এই বেলা লাগিয়ে দিই। কাজে লাগবে।’ এটাই ছিল তার সাথে আমার শেষ সাক্ষাত্। জনারণ্যে মিছিলকারীদের মাঝে সে মিশে গিয়েছিল। বিকেল চারটায় জানতে পারলাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রবাসের ১ নম্বর শেডের বারান্দায় তলপেটে গুলি খেয়ে বরবত মারা গেছে। বরকত যেখানে শহীদ হয়, ঠিক সেখানেই এখন গর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শহীদ মিনার। এর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন আর এক শহীদের মতো।

আমার মনে পড়েছে সাড়ে ১২টায় ভেঙে যাওয়া মিছিলকারীরা মেডিকেল কলেজের ছাত্রবাসের গেটে জমা হতে থাকে। তাদের সাথে যোগ দেয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররাও। এবার কিন্তু খ্লযু” আর ছাত্র-পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না, সমগ্র ঢাকা শহরে খবর ছড়িয়ে পড়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রমনার রাস্তায় পুলিশের অত্যাচারের কাহিনী। দলে দলে জনতা এসে বিক্ষোভকারীর দলে যোগদান করতে থাকে। মেডিকেল কলেজের পেছন ও পাশের রাস্তা দিয়ে জনস্রোত এসে মিলছে মেডিকেল কলেজ ছাত্রবাসে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস নিড়্গেপ আর লাঠিচার্জের মাত্রা বেড়েই চলছে। কিন্তু পুলিশের সংখ্যা জনতার তুলনায় ক্রমেই কমে আসছিল।

বেলা গড়িয়ে চলেছে। কারও সময়ের দিকে খেয়াল নেই। বেলা দুটো থেকে আইন পরিষদের সদস্যবর্গ আসতে শুরম্ন করলেন তাদের বৈঠকে যাওয়ার জন্য। গণ-আদালতে তাঁদের বিচার শুরু হলো। সেদিন আইন পরিষদের কত সদস্যকে ধরে নিয়ে এসে কানমলা দেওয়া হয়েছিল, তার হিসাব নেই। সবার কাছ থেকেই কথা আদায় করা হয়েছিল, বাংলা ভাষার সপক্ষে তারা ভোট দেবেন।

তখন বেলা তিনটা। ছাত্র-জনতা আর পুলিশের সংঘর্ষ তীব্রতর হয়ে চলেছে। উভয় পক্ষ থেকে ঢিল, ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু হয়েছে। পুলিশ দল হটে গেছে তখনকার মেডিকেল ছাত্রবাসের প্রধান ফটকের উল্টো দিকে যে পেট্রল পাম্পটা ছিল তার চত্বরে। এমন সময় কোনোরূপ সর্তক সংকেত না জানিয়েই গুলি শুরু হয়ে যায়। গুলি চলে ছাত্রাবাস, মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের দিকে। গুলির নেতৃত্বে দিয়েছিল ডিআইজি ইদ্রিছ। কত রাউন্ড গুলি চলেছিল আজো জানা যায়নি। তবে গুলি বর্তমান নার্স হোস্টেলের গেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেক মাঠ এবং বর্তমান মেডিকেল কলেজের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কোণা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। শহীদ হলেন একজন রিকশাচালক। শহীদ হলেন বরকত, জব্বার, সালাউদ্দিন প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বা রাস্তায় যারা শহীদ হলেন পুলিশ বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে তাদের লাশগুলো নিয়ে গাড়িতে তুলল। কত  যে আহত হয়েছিলেন তার হিসাব নেই। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমস্ত বারান্দা ও অধিক সংখ্যক ওয়ার্ড আহতদের জন্য খালি করে দেওয়া হয়েছিল। সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডাক্তার, ছাত্র ও সেবিকাদের কি অক্লান্ত পরিশ্রম! তাদের প্রাণঢালা সেবায় বহু আহত বেঁচে উঠেছিল।

১৪৪ ধারা আর রইল না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ আর তার ছাত্রাবাস মহান তীর্থস্থানে পরিণত হলো। ঢাকার সমস্ত অফিস-আদালত, কলকারখানা, রেডিও, রেলগাড়ির চাকা বন্ধ হয়ে গেল। হাজার হাজার লোক মেডিকেল কলেজে এসে জমায়েত হতে থাকল। কান্নার রোল পড়ে গেল চতুর্দিকে। পুলিশ বাহিনী সরে পড়েছে। ঢাকার রাস্তার কোথাও একটি পুলিশও নেই।

তিনটায় আইন পরিষদের সভা বসেছিল। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন, কে গুলি করেছে, কার নির্দেশে গুলি হয়েছে? সবাই নিরুত্তর। প্রতিবাদ করে বেরিয়ে এলেন রংপুরের খয়রাত হোসেন, ঢাকার মিসেস আনোয়ারা বেগম (জনাব ইকবাল আনসারী খান হেনরীর মা), দৈনিক আজাদের সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন আর মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ।

পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল চত্বর ছেড়ে পালিয়ো যাওয়ার সময় যে টিয়ার গ্যাস নিড়্গেপ করেছিল, তা রাত পর্যন্ত কালো ধোঁয়ার আস্তারণ ছড়িয়ে রেখেছিল। ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা উদ্যোক্তাদের সভা বসল মেডিকেল ছাত্রাবাসের ৩ অথবা ৪৯ নম্বর রুমে। নতুন করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠিত হলো। অলি আহাদ আহবায়ক নির্বাচিত হলেন। আন্দোলন পরিচালনার জন্য কতগুলো কেন্দ্র ঠিক করা হলো। নতুন ঢাকার জন্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক হল ও জগন্নাথ কলেজ আমাদের সকল আন্দোলন পরিচালনার সেক্রিটারিয়েট রূপে চিহ্নিত হলো। মেডিকেল কলেজ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক হল ও জগন্নাথ কলেজ থেকে ঘোষিত হলো আগামীকাল ২২ ফেব্রুয়ারি সব বাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। শহীদ ভাইদের মৃতদেহ ও তাদের রক্তরঞ্জিত পতাকা শোভিত মিছিল প্রথম শহীদ বরকতের যেখানে গুলি লেগেছিল সেখান থেকে বের হবে। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত এ কর্মসূচি প্রচার হতে থাকল। আর রাত ১২টার মধ্যে মেডিকেল ছাত্রাবাসের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পাশেই আমরা ছাত্ররা একটি পাকা শহীদ মিনার নির্মাণ করে ফেললাম। এটি ২৪ ফেব্রম্নয়ারি বিকেল চারটা পর্যন্ত্ম টিকে ছিল।

রাতে সমগ্র ঢাকায় কারফিউ জারি হলো। সামরিক বাহিনীর হাতে সমগ্র ঢাকা শহর ছেড়ে দেওয়া হলো। মন্ত্রীরা সেদিন পালিয়ে বেঁচেছিলেন কুর্মিটোলা সামরিক আস্তানায় গিয়ে। একুশে ফেব্রুয়ারি রাতে সমগ্র ঢাকা শহর পোস্টার আর দেয়াল পত্রিকায় ছেয়ে গেল। ২২ তারিখ ভোরবেলা ঢাকার রেলওয়ে লোকোশেডে ধর্মঘট সফল করার দায়িত্বে আমি নিয়োজিত ছিলাম। একটি গাড়িও সেদিন ঢাকা স্টেশন থেকে ছাড়েনি। একটিও বাস, রিকশা চলাচল করেনি ঢাকার রাস্তায়। কোনো কর্মচারী অফিসে যাননি। রেডিও বন্ধ ছিল সেদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষে প্রথম কালো পতাকা উড্ডীন হলো সকাল আটটায়। আমি আজ গর্বিত যে, সেই কালো পতাকা আমরা চারজন উত্তোলন করেছিলাম। শহীদ মিনারের কাজ মূলত ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই করেছিলেন। অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল ভোরবেলা নবনির্মিত শহীদ মিনারে। ঢাকা শহরের হাজার হাজার মানুষ উত্তাল তরঙ্গের মতো শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকেন। অসংখ্য মেয়ে তাদের হাতের, কানের অলংকার খুলে দিতে লাগলো সংগ্রাম পরিচালার জন্য। টাকা, সোনায় ভরে গেল।

২২ ফেব্রুয়ারি সকালে আমার দায়িত্ব ছিল রেলওয়ে কলোনি ফার্মগেটের কাছে কৃষি কলেজে পিকেটিংয়ের ব্যবস্থা করা। পিকেটিংয়ে অংশ নেয়ার পর আমি লিফলেট নিয়ে দুটি স্থান ঘুরে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি, তখন শুনলাম গুলি হয়েছে। দুপুর ১২টার দিকেও গুলি হয়। এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন। ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি গ্রামে ছিলেন ঢাকা শহরে গুলি হয়েছে, এ সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি যেকোনো সভা হবে, সভায় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ইমদাদল্লাহ (মরহুম) সভাপতিত্ব করবেন। সেখানে আর একটি প্রস্তাব ছিল যে, মওলানা ভাসানী ঢাকা আসছেন সুতরাং তিনিই সভাপতিত্ব করবেন। আরো একটি মত ছিল যে, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের বাবা-মা বা কোনো আত্মীয়কে পাওয়া গেলে তাকেই সভাপতিত্ব করার অনুরোধ জানানো হবে।

আমি ওই সভায় উপস্থিত ছিলাম না। আমি এসে শুনলাম সভায় সভাপতিত্ব করেছেন ইমদাদল্লাহ। শহীদ মিনারের পাশে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। বাইরে সকালেই শোনা গেল, মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে গভীর রাতে পুলিশ শহীদদের মৃতদেহগুলো জোর করে নিয়ে গেছে। লাশ নিয়ে আমাদের মিছিল করার কথা ছিল, কিন্তু একটি লাশও পাইনি। আমরা জানলাম, লাশগুলো ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু একটি মৃতদেহ, বরকতের মৃতদেহ, তাঁর ভগ্নিপতি তখন ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে ফিরে পান। পুলিশের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল তাই বরকতের কবর দেওয়ার ঘটনা আমরা বেশ কিছুদিন পর্যন্ত জানতে পারিনি। ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে শহীদদের রক্তাক্ত কিছু কাপড় দিয়ে পতাকা তৈরি করে কালো পতাকার সঙ্গে রক্তাক্ত পতাকাও সলিমুল্লাহ হলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

শহীদ মিনারে জানাজার পর কালো পতাকা এবং শহীদের রক্তাক্ত কাপড় নিয়ে প্রায় দুই লাখ মানুষের শোক মিছিল বের হয়। মিছিলটি পূর্বতন হাইকোর্ট এবং কার্জন হলের মধ্যবর্তী স্থানে উপস্থিত হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তারা বেপরোয়া লাটিচার্জ করে, ফলে ঘটনাস্থলেই বহু লোক আহত হয়। এই মিছিলের একটি অংশ ঘুরে নাজিমুদ্দীন রোডের দিকে এগোতে থাকে, অপরটি এগোতে থাকে তোপখানার দিকে। পুরাতন হাইকোর্টের সামনে যে আইল্যান্ড এখনো আছে, সেখান থেকেই পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। গুলিতে হাইকোর্টের কর্মচারী মতিউর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। গুলি চলা সত্ত্বেও মিছিল পুনরায় এগোতে থাকে।

এখানে আর একটি কথা বলা দরকার তাহলো, ২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদ’ এবং ‘পাকিস্তান অবজারভার’ ঢাকায় গুলি হয়েছে, বহু লোক হতাহত হয়েছে বলে ব্যানার হেডলাইনে সংবাদ পরিবেশন করে। কিন্তু সেদিন ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘সংবাদ’ আন্দোলনবিরোধী সংবাদ পরিবেশন করলো। মিছিলকারীরা সিদ্ধান্ত নিল ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘সংবাদ’ জ্বালিয়ে দেবে। বর্তমান গুলিস্তানের রেলগেটের নিকট নবাবপুর রোডের মুখের ক্রসিংয়ে যখন মিছিল পৌঁছাল তখন পুনরায় পুলিশ গুলি চালায়। এখানে বেশ কিছু লোক হতাহত হয়। এই মিছিলের একটি অংশ বংশালে ‘সংবাদ’ অফিস আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে যায়। বংশালের মোড়ে তখন পুনরায় গুলি হয়। মিছিল টুকরো টুকরো হয়ে সদরঘাট এসে পৌছায়। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় ‘মর্নিং নিউজ’ অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু ‘সংবাদ’ অফিসে আমরা কিছু করতে পারিনি। কারণ তখন সংবাদের মালিক ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন। ওখানে পুলিশ এবং মিলিটারি মোতায়েন ছিল এবং নির্বিচারে গুলিও চালিয়েছিল। এভাবে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর লোকেরা মিছিলের ওপর ৭/৮ বার গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে যারা আহত হয়েছিলেন তাদেরকে পাওয়া গেলেও নিহতদের সংখ্যা এবং মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। বেলা তিনটা পর্যন্ত এভাবে চলল। আমার ধারণা, গত দু’দিনে পুলিশ দেড় হাজার লোককে গ্রেফতার করে। অনেককে তেজগাঁও কুর্মিটোলায় ট্রাকে বা বাসে করে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়।

একুশ তারিখেই হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে পুলিশের গুলি চালনার তদন্তকরতে হবে বলে দাবি জানিয়েছিলাম। ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিদেশি বিচারপতির নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি সরকার গঠন করে। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল শহীদ পরিবারের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কমিটিতে ছাত্র, শিক্ষক এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গকে নিতে হবে। সরকার আমাদের দাবি না মানায় আমরা ইনকোয়ারি কমিটি বয়কট করি। এই বয়কটের ঘোষণা ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ থেকেই করা হয়েছিল।

২৪ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে হঠাত্ দেখা গেল সামরিক বাহিনী সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, মেডিকেল কলেজ, ফজলুল হক হল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি স্থান ঘিরে ফেলেছে। আমি ইকবাল হলে ছিলাম। দেখা গেল পুলিশ হলগুলোর গেট ভেঙে এসব এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট ছিলেন ওসমান গনি। পুলিশ গনি সাহেবকে ডেকে এনে গেট খোলার ব্যবস্থা করেন। পুলিশ হলে ঢুকে রুমে রুমে ছাত্রদের ওপর অত্যাচার চালায়। সমস্ত হলটিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ওসমান গনি সাহেব পুলিশি তত্পরতার বিরোধিতা করেছিলেন বলে জেনেছি; কিন্তু সামরিক বাহিনী জোর করেই সবকিছু তছনছ করে। সেদিন বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে তারা। এরপর ঠিক যুদ্ধ যেভোবে করে, সেভাবেই তারা পূর্ণ সামরিক সম্ভার নিয়ে মেডিকেল কলেজে ঢোকে এবং শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। এই দমন অভিযানে কয়েক হাজার সামরিক বাহিনীর লোক নিয়োগ করা হয়।

শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার পর আলাউদ্দিন আল আজাদ সাহেব একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছো তোমারা/ ভয় কি বন্ধু?/ আমরা এখনো চার কোটি পরিবার/ খাড়া রয়েছি তো।’ ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী সকলের ওপর ২৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এ ছাড়া এখানে-ওখানে নির্বিচারে বহু লোককেই গ্রেফতার করা হতে থাকে।  ২৪ তারিখ রাতে পুলিশ-মিলিটারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শিক্ষকদের বাসগৃহ আক্রমণ করে এবং বহু অধ্যাপককে গ্রেফতার করে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, অজিত গুহ প্রমুখ গ্রেফতার হলেন। আবুল হাশেম সাহেব তার বাসা থেকে গ্রেফতার হন। ওই সময় মূল ভাষা আন্দোলনের নতুন কমিটির কাউকেই তখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। আমরা ২৫ তারিখ পর্যন্তসারা দেশে পুলিশ নির্যাতনের বিরুদ্ধে হরতাল আহ্বান করেছিলাম। ঢাকা শহরে এই ক’দিন প্রায় পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়।

২৭ তারিখ রাতের বেলা শান্তিনগরে আমাদের বন্ধু হাসানের চাচার বাড়িতে ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদে’র গোপন বৈঠক বসে। পুলিশ-মিলিটারি সে বাড়িটা ঘেরাও করে এবং সব সদস্যকে গ্রেফতার করে। সেখানে তোয়াহা, অলি আহাদ, এস এ বারি এটি, মতিন প্রমুখ গ্রেফতার হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মুজিবুল হক সেদিন পুলিশকে এ গোপন খবরটি জানিয়েছিলেন বলে পরে আমরা জানতে পারি। তিনি পাকিস্তান আমলে প্রভাবশালী অফিসার ছিলেন। এখনো একজন প্রভাবশালী সরকারি কর্মচারী। অধিকাংশ নেতা-কর্মী বন্দী হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। আমরা যারা তখনো বাইরে ছিলাম, তারা সারা দেশে যোগাযোগ করে আন্দোলনের গতি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করি। আমি রাজশাহী গিয়েছিলাম, গাজীউল হক বগুড়া গেলেন, খন্দকার ইলিয়াস চট্টগ্রামে। এইভাবে অনেক জেলায় আমরা ছড়িয়ে পড়েছিলাম।

মার্চ মাসে চকবাজারের বড় কাটারায় আতাউর রহমান খান সাহেবের বাসায় আমরা নতুন করে একত্র হই। আন্দোলন তখন স্তিমিত হয়ে গেছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। আবারো ভাষা আন্দোলন কমিটি গঠিত হলো। এবার জনাব আতাউর রহমান খান হলেন ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’-এর আহ্বায়ক। ’৪৮ সালের আন্দোলন ছিল প্রকৃতপক্ষে একাডেমিক আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় বা কিছুসংখ্যক কলেজের মধ্যেই আন্দোলন সীমিত ছিল। বৃহত্তর জনমানসে এর বিস্তৃতি ছিল না বললেই চলে। আপামর জনসাধারণ ওই আন্দোলনকে নিজের আন্দোলন বলে মনে করতে পারেনি। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যখন মিছিল করে বেরিয়ে আসে, পুলিশের আগেই নাজিমুদ্দিন রোডের লোকেরা মিছিলকারীদের দিকে লাঠি হাতে নিয়ে তেড়ে আসে, মিছিলকারীদের বাধা দেয়, তাদের পেটাতে থাকে এবং বলতে থাকে, এরা কমিউনিস্ট, ভারতের দালাল, পাকিস্তানকে খতম করতে চায়। সুতরাং আমার মতে, ’৪৮-এর আন্দোলন গুটিকয়েক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমিত ছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকার বিমানে করে সারা দেশে লিফলেট ছড়িয়েছিল। লিফলেটের সারমর্ম ছিল, ভাষা আন্দোলন যারা করছে তারা কমিউনিস্ট, ভারতের দালাল, পাকিস্তানকে তারা ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু সেদিনের প্রচারণা এ দেশের মানুষকে উত্সাহিত করেনি। সরকারের বক্তব্য কেউ গ্রহণ করেনি। ১৯৪৮ সালে সচেতনতার অভাব ছিল। আর বায়ান্ন ছিল সংগ্রামী চেতনায় ভরা।

তা ছাড়া সামগ্রিক বামপন্থী আন্দোলন ’৪৮-এ তেমন গড়ে ওঠেনি। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের মতো সংগঠনও তখন গড়ে ওঠেনি। এককালের ছাত্র জেনারেশন দেশ বিভাগের কারণে খণ্ড-বিখণ্ড  ছিল। সুতরাং সংগঠন এবং সাংগঠনিক তত্পরতার অভাব ছিল, ছিল চেতনার অভাব। ১৯৪৮ সালে জনগণ পুলিশি নির্যাতনকে উপভোগ করেছে; কিন্তু ’৫২ সালে শারীরিক ও মানসিক শক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করেছে, বিরোধিতা করেছে, আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, গুলি খেয়েছে। আন্দোলনে জনসাধারণের যে অংশগ্রহণ, ১৯৫২ সালে তা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ। এই পূর্ণাঙ্গ চেতনার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৪ সালে নির্বাচন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলীম লীগ ও তার নেতাদের এ দেশের মানুষ সম্পূর্ণ বর্জন করে।

সেদিনের ‘গণপরিষদ’ সদস্যদের সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার। ‘গণপরিষদ’-এ রাজকুমার সিংহ, বসন্তকুমার দাস প্রমুখেরা বাংলা ভাষার প্রশ্নে মুভ করার চেষ্টা করেছেন। ‘গণপরিষদ’-এ কংগ্রেস দলীয় সদস্যগণ বাংলা ভাষার প্রশ্নে নানা প্রস্তাব তুলেছেন এবং এ জন্য বহু বিতর্কের সম্মুখীন তারা হয়েছেন। পাকিস্তানের শত্রু বলে তারা চিহ্নিত হয়েছেন। পরিষদে কুমিল্লার ধীরেন্দ্র দত্ত সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের যুগ থেকে এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে বরাবরের জন্যে অত্যন্তঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনে ‘গণপরিষদ’ এবং কুমিল্লা জেলায় তার তত্পরতা এ দেশবাসী ভুলতে পারে না। আমার ভালোভাবে মনে আছে, পাক সরকার যখন আরবির পক্ষে কিছু পুস্তিকা প্রচারপত্র প্রকাশ করা শুরু করে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর তীব্র বিরোধিতা করেন, প্রতিবাদ জানান, বিবৃতি দেন। প্রকৃত শিক্ষিত মহল সরকারের এই ঘৃণ্য প্রচেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিছু লোক সরকারের হয়ে কাজ করেছে। ড. হাসান জামান সাহেবের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৭১-এর যুদ্ধ চলাকালীন বিএনআর প্রধান হিসাবে ড. জামান ধর্মভিত্তিক অসংখ্য বইপুস্তক প্রকাশ করেন। ইতিপূর্বেও কিছু পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। বিএনআরের সমর্থক কিছু লোক আরবির পক্ষে কথা বলার চেষ্টা সেদিন করেছে। কিন্তু তারা তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিল। জনমনে এর কোনো প্রভাব আমরা লক্ষ করিনি। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদেরও তত্কালীন সদস্যরা আরবির পক্ষে প্রস্তাব পাননি। আরবির পক্ষ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের কিছু পেটুয়া লোক কাজ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু সারা বাংলাদেশে আরবিকে রাষ্ট্রভাষা এবং আরবি হরফে বাংলা লেখার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র এ দেশের মানুষ নস্যাত্ করে দেয়। আমাদের দেশের মানুষ আরবিকে ধর্মীয় ভাষা, নামাজ কালামের ভাষা ছাড়া অন্য কোনোভাবে এ ভাষাকে গ্রহণ করেছে বলে আমার আজো ধারণা নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে চেষ্টা হয়েছে, কিছু লোক টাকা-পয়সা পেয়েছে, কিছু বই-পুস্তিকা প্রকাশ করেছে—এ পর্যন্ত্তই। এর বেশি তারা এগোতে পারেনি। জনগণের মাঝে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

আমি মনে করি, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানে সরকারবিরোধী ‘গণ-আন্দোলনে’র প্রথম যে সুযোগ পেলাম, তার পূর্ণ ব্যবহার করা উচিত ছিল। রাজনৈতিকভাবেই আমরা চিন্তা করেছিলাম যে ১৪৪ ধারা যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে ভাঙতে হবে এবং আমরা দেখেছিলাম তত্কালীন আওয়ামী মুসলিম লীগ শুধু চেয়েছিল যে আমরা যদি ‘তীব্র গণ-আন্দোলন’-এ ঝাঁপিয়ে পড়ি তাহলে নির্বাচনে শূন্য আসনগুলো অর্থাত্ ‘আইন পরিষদ’-এর শূন্য আসনগুলো বানচাল হয়ে যাবে। নির্বাচন তারা দেবে না। মুসলিম লীগ চিরকালের জন্যে একদলীয় শাসন-ব্যবস্থা কায়েম রাখবে। এরূপ রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধিতা আমরা করি।

সুতরাং আমি বলব, ১৯৭০-৭২ সাল হতো না, যদি ১৯৫২ সালে তীব্র গণ-আন্দোলন না হতো। আমি বলব, ১৯৫২ সালের আন্দোলন একটি সফল আন্দোলন ছিল এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা একান্তভাবেই দরকার ছিল। সারা দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন আপনারা দেখেছেন। সে নির্বাচনে মুসলিম লীগ এ দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে গেল। আমি বলব, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলশ্রুতি ছিল ১৯৫৪-এর ফলাফল। আজকে বাংলা একাডেমির যে ভবন, সে ভবন সে সময় পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাসভবন ছিল। ১৯৫২ সালে আমাদের দাবি ছিল, নুরুল আমিনের ওই বাসভবনেই হবে বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমি সেই বর্ধমান হাউসেই হয়েছে। আজ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যে চর্চা হয়ে আসছে, তা হতো না, যদি সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না হতো। পাকিস্তানের ‘গণপরিষদ’-এর চেহারা বদলে গেল। আইন পরিষদের চেহারা পাল্টাল। পাকিস্তানের সংবিধান পাওয়া গেল। সুতরাং ১৪৪ ধারা ভাঙা সেদিন সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। শুধু আমাদের কথা নয়, পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর সমস্ত জায়গার লোক স্বীকার করেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রগতিশীল অংশ স্বীকার করেছে, তোমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলে বলেই আমরা পাকিস্তানে বামপন্থী আন্দোলন করতে পেরেছি।

প্রতিটি আন্দোলনেরই সূত্রপাত এবং পরিচালনা ছাত্রদের দ্বারা। সত্যিই রাজনৈতিক দলগুলোর দোদুল্যমানতা ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্দোলনবিমুখতাও লক্ষ করা গেছে। আসলে পাকিস্তান এবং হিন্দুস্তান—এ দুটো রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। ব্রিটিশ এ দেশে যে ভূমি ব্যবস্থা, যে অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, তা হচ্ছে সামস্তবাদী ব্যবস্থা।

সামস্তবাদী ব্যবস্থায় জমিদার, মহাজন, সুদখোর এরা সব সময় সাম্রাজ্যবাদ এবং ভূস্বামীদের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এখানকার সমাজ-ব্যবস্থার যারা ধারক, তারা সবাই প্রতিক্রিয়াশীল চিস্তা-চেতনার দ্বারাই পরিব্যপ্ত, পরিচালিত। ১৯৪৬ সালে যখন এখানে নির্বাচন হলো, তখন মুসলিম লীগের যারা এ অঞ্চলে নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তারা ছিল ভূস্বামী, জমিদার ইত্যাদি এবং নেতৃত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ১৯৪৭ সালের পরে পূর্ব পাকিস্তানের কথা আমি বিশেষ করে বলব। প্রথম এ অঞ্চলে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠতে শুরু করে। বাড়িতে জমিজমা কিছু আছে, বাবা ছোটখাটো চাকরি করেন। তাদের পরিবেশ গ্রামীণ সমাজ ইত্যাদি সামস্তবাদী কাঠামোতে আবৃত। চিস্তা-চেতনা নিছক সেই পর্যায়ের। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে যখন পড়তে আসল, তাদের চেতনা ও চিন্ত্তালোক কিছুটা আলোকপ্রাপ্ত হলো।

১৯৫২ সালেই এখানকার ছাত্ররা প্রথম বলল, পাকিস্তান বহু ভাষার দেশ। বহু ভাষাভিত্তিক অঞ্চল পাকিস্তানের আছে। প্রতিটি ভাষাভিত্তিক অঞ্চলের পরিপূর্ণ স্বাধিকারের জন্য আমরা সংগ্রাম করব। আমি বলব, এখানকার যতগুলো প্রগতিশীল আন্দোলন, বামপন্থী আন্দোলন, মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, শাস্তির পক্ষে আন্দোলন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষে আন্দোলন, সবকিছুর পেছনে এখানকার ছাত্রসমাজের ভূমিকা মুখ্য, ছাত্রসমাজই এর নেতৃত্ব দিয়েছে।

 

( তথ্যসূত্র :  প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমির ১৯৮০ সালের একুশে সংকলন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন’৭১ এর একুশে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ প্রকাশিত হয়।)

Comments

comments