ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৬ মিনিট

March 28th, 2016

খুলনার একমাত্র বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা খিজির আলী। গত ২৪ মার্চ ছিল তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে খুলনার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান । সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে সে সময় তাঁর চিকিৎসার খরচ চালানো হয়। পরিবারের অভিযোগ, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের না হওয়ায় খিজির আলীর পরিবারের আজ এই দশা। দারিদ্র্যের কারণে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা গেছেন।

বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা খিজির আলীর পরিবার এখন দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত। শুধু সম্মানী ভাতাতেই চলে পরিবারটি।  খিজির আলীর স্ত্রীও অসুস্থ। মানুষটি মানসিক বিকারগ্রস্ত। আর্থিক সংকটে তাঁরও চিকিৎসা হচ্ছে না।

খিজির আলীর সর্ম্পকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৮, ৯, ১০ বই থেকে জানা যায়- খিজির আলী যুদ্ধ করেন ৯ নম্বর সেক্টরের হিঙ্গলগঞ্জ সাব-সেক্টর এলাকায়। ১৯৭১ সালে ছিলেন মেকানিক। তখন তাঁর বয়স ৩৭। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। ২৬ মার্চ খুলনা মহানগরের বৈকালি এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে খিজির আলী অসম সাহস প্রদর্শন করেন। তাঁর অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ ছিল না। সামান্য বন্দুক দিয়ে তিনি অনেকক্ষণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বৈকালিতে প্রতিরোধ করেন। খুলনার পতন হলে ভারতের টাকিতে যান। সেখানে কয়েক দিন প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার টাউন শ্রীপুরে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে সফল অপারেশন করেন। তাঁরা ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধা একযোগে গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ শেষে প্রথম অংশ নেন অপারেশন জ্যাকপটে। ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে একদল নৌ-কমান্ডো মংলা বন্দরে লিমপেট মাইনের সাহায্যে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেন। খিজির আলীর দলের ওপর দায়িত্ব ছিল নৌ-কমান্ডোদের স্থলে নিরাপত্তা প্রদান ও গাইড করা। তাঁদের রেকি করা তথ্যের ভিত্তিতেই নৌ-কমান্ডোরা সফলতার সঙ্গে অপারেশন করেন। পরে আরও কয়েকটি অপারেশনে তিনি নৌ-কমান্ডোদের সঙ্গে অংশ নেন। এর মধ্যে আশাশুনি থানা দখল উল্লেখযোগ্য।

আশাশুনি সাতক্ষীরা জেলার অন্তর্গত। জেলা সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। আশাশুনিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটি ছিল। তাদের সঙ্গে ছিল বিপুলসংখ্যক রাজাকার। অক্টোবরের মাঝামাঝি মুক্তিযোদ্ধা ও নৌ-কমান্ডোরা যৌথভাবে সেখানে আক্রমণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের নেতৃত্ব দেন খিজির আলী। দুদিন ধরে সেখানে যুদ্ধ হয়। প্রথম দিন সারা রাত যুদ্ধ চলে। পরদিন মুক্তিযোদ্ধারা পুনর্গঠিত হয়ে আবার পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করেন। এ দিন তাঁরা পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের ফাঁকি দিয়ে থানার ঘাটে ভাসমান ফেরি পন্টুনে কয়েকটি মাইন লাগান। মাইন বিস্ফোরণে গোটা ফেরিঘাট তছনছ হয়। শব্দে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে পড়ে। লোহার পাত বিভিন্ন দিকে ছিটকে পড়ে। পানি ছোটখাটো পাহাড়ের রূপ নিয়ে ৩০-৪০ ফুট ওপরে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের মধ্যে তীব্র ভীতি সৃষ্টি হয়। এ সময় দুঃসাহসী খিজির আলী দুই হাতে দুটি এলএমজি নিয়ে ঝড়ের বেগে গুলি করতে করতে থানার ভেতরে ঢুকে পড়েন। এ দৃশ্য দেখে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা বিস্মিত ও হতভম্ব হয়ে পড়ে। তাঁর ভয়াল রণমূর্তি দেখে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা এতই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে যে তারা নিজ অস্ত্রশস্ত্র ফেলেই পালাতে থাকে। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই আশাশুনি থানা দখল করেন। ১১ জন পাকিস্তানি সেনা ও ৪০ জন রাজাকার তাঁদের হাতে নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অবশ্য বেশিক্ষণ আশাশুনি থানার দখল ধরে রাখতে পারেননি। পরদিন পাকিস্তানি হেলিকপ্টার বৃষ্টির মতো গুলি ও বোমা ফেলতে থাকে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যান।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য মুক্তিবাহিনীর গণবাহিনীর যোদ্ধা খিজির আলীকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে।

পরিচয়

খিজির আলী
পৈতৃক বাড়ির জেলা:  বাগেরহাট
উপজেলা : সদর
গ্রাম : কার্তিকদিয়া।
(সেখান থেকে ১৯৬০ সালে তিনি স্থায়ীভাবে খুলনায় আসেন। এখানে তাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। ২০১৫ সালে ২৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।  বর্তমানে খুলনার শহরের তুঁতপাড়ায় একটি ভাড়াবাড়িতে তাঁর পরিবার পরিজন বসবাস করছেন।)

Comments

comments