ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৬ মিনিট

March 25th, 2016

1

২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক অভিযানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। ছবি : রশীদ হায়দার

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ । ১৯৭১ সালের এই দিনের শেষে যে রাত নেমে এসেছিল, ইতিহাসে তা এক বর্বর গণহত্যার সাক্ষী হয়ে আছে। এই রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক অভিযানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। উদ্দেশ্য বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেওয়া।
রাতটি ছিল কৃষ্ণপক্ষের ঘন অন্ধকার। ঢাকা সেনানিবাস থেকে গোপনে শ্বাপদের মতো বেরিয়ে আসে ট্যাংক আর সাঁজোয়া গাড়ির সারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল আর ইকবাল হলে (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সেনারা মেতে ওঠে নির্বিচার গণহত্যায়। গোলা ফেলা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে। পথের পাশের বস্তিবাসীরাও রক্ষা পায়নি গণহত্যা থেকে। যত্রতত্র ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। হামলা চালানো হয় পুরান ঢাকার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাতেও। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনারা হামলা চালায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তরে। বাঙালি পুলিশ ও ইপিআর (পরে বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি) সদস্যরা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের মুখে তাঁদের পিছু হটতে হয়।
এক রাতে এত বিপুল গণহত্যার নজির ইতিহাসে বিরল। এই গণহত্যার সূত্র ধরে পরদিন থেকে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে।
২৫ মার্চ মধ্যরাতের পরপরই পাকিস্তানি সেনা কমান্ডোদের হাতে গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আগে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বার্তা পাঠান তিনি। হানাদারদের বিরুদ্ধে দেশজোড়া প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়, যা দ্রুত রূপ নেয় জনযুদ্ধে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে সাত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হয় আরো তিন হাজার লোককে। ঢাকায় এ ঘটনা ছিল কেবল শুরু। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা চালিয়ে যায় হত্যাযজ্ঞ। সে সঙ্গে তারা জ্বালিয়ে দিতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট। লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুনতাড়িত শ্মশানভূমিতে।’

2কলকাতা থেকে ডোনাল্ড সিম্যান লন্ডনের ‘সানডে এক্সপ্রেসে’ লেখেন, ‘২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর হাতে ২০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।’ একাত্তরের ২৮ মার্চ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র এখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে শেখ মুজিবের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানের নিয়মিত বাঙালি সৈন্য, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে।

একই তারিখে ব্রিটিশ সাংবাদিক সিডনি এইচ সহনবার্গ ‘সানডে টাইমস’-এ ‘বিগ গানস ব্লাস্ট আনআর্মড বেঙ্গলিজ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে লেখেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিয়েছে। প্রদেশের ৭০ মিলিয়ন জনতার স্বায়ত্তশাসন লাভের সংগ্রাম বন্ধ করার জন্য আর্টিলারি ও মেশিনগান নিয়ে অস্ত্রহীন জনতার ওপর হামলা শুরু করেছে। রিপোর্টের প্রায় শেষ অংশে বলা হয়, ট্রাকে করে সামরিক বাহিনীর পাহারায় এয়ারপোর্টের রাস্তা দিয়ে আসার সময় স্বাধীনতা-সংগ্রামের কঠিন সমর্থক পথের ধারে বসবাসকারী গরিব বাঙালির কুঁড়েঘরগুলোতে সৈন্যদের আগুন জ্বালিয়ে দিতে দেখা গেছে। একজন পাকিস্তানি সৈন্য এয়ারপোর্টে এ সময় গর্ব করে বলেছে, বহু মানুষ মারা গেছে এবং বাংলাদেশ শেষ হয়ে গেছে।

এর আগে ৩৫ বিদেশি সাংবাদিককে বহিষ্কার করা হয়, যার মধ্যে সিডনিও একজন।

বার্তা সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একাত্তরের মার্চে এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সংকট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয় : ‘১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানি জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালি বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সব সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা।

সেদিন দুপুরের পর থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। সকাল থেকেই সেনা কর্মকর্তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। হেলিকপ্টারযোগে তারা দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস পরিদর্শন করে বিকেলের মধ্যে ঢাকা সেনানিবাসে ফিরে আসে।

ঢাকার ইপিআর সদর দপ্তর পিলখানায় অবস্থানরত ২২তম বালুচ রেজিমেন্টকে পিলখানার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিতে দেখা যায়।

এদিন মধ্যরাতে পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেত এলাকায় আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনারা। হানাদার বাহিনী ট্যাঙ্ক ও মর্টার নিয়ে নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখল নেয়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে, ট্যাঙ্ক-মর্টারের গোলায় ও আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়।

পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের নয়জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সব পদক্ষেপ চূড়ান্ত করে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে করাচি চলে যান।

সেনা অভিযানের শুরুতেই হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যেকোনো মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

Comments

comments