ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১২ : ০৫ মিনিট

masudur-rahman-jpg1সেই সময়টা ছিল বাংলাদেশের গৌরবের দিন। পাকিস্তানিদের শোষণ ও শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পুরা বাঙালি জাতি এই প্রথমবারের মতো একত্র হয়েছে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর পুরো দেশে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানি প্রসাশন যন্ত্র কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই অচলায়তন ভাঙার জন্য পাকিস্তানি বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক জান্তা গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বাঙালিদের একটি উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তারা বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার ছলে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের সামরিক শাক্তি বৃদ্ধি চালিয়ে যেতে থাকে।

২৫ মার্চ ১৯৭১। শুরু হয় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। এদেশের মানুষের রক্ত জল করা পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ দিয়ে কেনা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নরঘাতকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ নিরস্ত্র শান্তিপ্রিয় ঘুমন্ত মানবনিধনের হীন চেষ্টায়। পাকিস্তাানের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ফলাফলকে নস্যাত্ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয় হানাদার বাহিনী। কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাঙালি জাতি হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এহেন অতর্কিত ও অভূতপূর্ব কর্মকাণ্ডে। প্রাথমিক বিমূঢ়তা কাটিয়ে ওঠার পর তারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ‘যার কাছে যা কিছু আছে’ তা-ই নিয়েই শত্রুর মোকাবিলায় নেমে পড়ে।

১০ এপ্রিল ১৯৭১। গঠিত হয় প্রবাসী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং তাদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য এই বাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়—নিয়মিত বাহিনী ও গেরিলা বাহিনী। নিয়মিত বাহিনী গঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআাার, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে। গেরিলা বাহিনী গঠিত হয় ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত কর্মক্ষম ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুবকদের নিয়ে। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা সম্মুখ সমরে পাকিস্তাানি বাহিনীর মোকাবেলা করে তাদের ধ্বংস করবে এবং গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে গুপ্তভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর সদ্যদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করবে এবং তাদের মনোবল ভেঙে দেবে।

যুদ্ধের কৌশলগত কারণে সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। ৬ নং সেক্টরের আওতাধীন এলাকা ছিল তত্কালীন বৃহত্তর রংপুর জেলা এবং তত্কালীন দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন বিমানবাহিনীর অফিসার উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার (মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার, বীর উত্তম)। তিনি তাঁর যুদ্ধ এলাকাকে ৫টি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করেন। তারই একটি সাব-সেক্টর তেঁতুলিয়া, যার নং ৬এ।

৬ নং এ সাব সেক্টরের যুদ্ধরত সৈনিকগণ ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থিত তত্কালীন ৯ উইং ইপিআরে কর্মরত বাঙালি সদস্যগণ। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক ২৫ মার্চ ’৭১ রাতে ইপিআরের সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানা ও অন্যান্য স্থানে ইপিআর সদস্যদের ওপর আক্রমণের সংবাদ পেয়ে এরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশ বাহিনীতে যোগদান করে। বিমানবাহিনীর অফিসার স্কোয়ার্ড্রন লিডার সদরুদ্দীন আহমদের (সাবেক বিমানবাহিনীর প্রধান) নেতৃত্বাধীন এই সাব সেক্টরের সৈনিকগণ এবং অত্র এলাকার গেরিলা কমান্ডার ছাত্র মাহবুবের নেতৃত্বাধীন গেরিলা কোম্পানি ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় ক্রমান্বয়ে অমরখানা জগদলহাই বোঁদা পঞ্চগড় (২৯/১১/৭১), ঠাকুরগাঁও (০৩/১২/৭১), বীরগঞ্জ (০৬/১২/৭১) দখল করে। তারা সর্বশেষ যুদ্ধ করে নীলফামারীর খানসামা থানায় (১২/১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সৈয়দপুর সেনানিবাসে পাকিস্তাানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এই রণাঙ্গনের যুদ্ধের সমাপ্তি হয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাহিনী পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক কারণে অর্ধেক সদস্য ঠাকুরগাঁওয়ে এবং বাকি অর্ধেক দিনাজপুরে অবস্থান করেন। দিনাজপুরে অবস্থানরত সৈনিকগণ বিভিন্ন কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে মহারাজা স্কুল পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে তাদের জন্য পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। মহারাজা স্কুলে অবস্থানরত সৈনিকদের বেশির ভাগই ছিল গেরিলা বাহিনীর সদস্য। তাঁরা দৈনিক রুটিনমাফিক সকালে পিটি, নাস্তাা খাওয়ার পর ড্রিল, অস্ত্র, রণকৌশল ইত্যাদির ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন। বিকাল বেলা খেলাধুলার পর যার যার কক্ষে বিশ্রামের জন্য চলে যেতেন।

যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী  (যৌথ বাহিনী) যখন একের পর এক বিভিন্ন এলাকা দখল করে সামনের দিকে অভিযান পরিচালনা করছে, তখন তাদের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার জন্য পাকিস্তাানি বাহিনী বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এদের মধ্যে ছিল কামান ও সর্টারের সাহায্যে গোলাবর্ষণ।

এই গোলা বেশির ভাগ বিস্ফোরিত হলেও অনেক সময় যান্ত্রিক কারণে অথবা নরম মাটিতে পড়ার কারণে অবিস্ফোরিত অবস্থায় থেকে গেল। যৌথ বাহিনীর আক্রমণ ঠেকানোর জন্য তারা আরেকটি কৌশল অবলম্বন করতেন তা হলো সম্ভাব্য চলাচলের পথে এন্টি পারসোনেল ও এটি ট্যাঙ্ক মাইন পুঁতে রাখা। যুদ্ধের পরে দেখা গেল পাকিস্তাানি বাহিনীর এসব অবিস্ফোরিত গোলা ও মাইনে অনেক লোক হতাহত হচ্ছে। তখন সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশ দেওয়া হলো যে, এই সমস্তা ক্ষতিকারক গোলা ও মাইন বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করে দিনাজপুর মহারাজা স্কুলে ডাম্পিং করা হবে। নির্দেশ মোতাবেক স্কুলের খেলার মাঠের এক কোনায় একটি বিরাট গর্ত করা হলো। প্রতিদিন সকালবেলায় একজন জেসিওর নেতৃত্বে একটি উদ্ধারকারী দল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সারা দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে গোলা ও মাইন সংগ্রহ করে বিকেলে এসে এই সকল দ্রব্যাদি ডাম্পে সংরক্ষণ করে।

সেদিন সম্ভবত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের কোনো এক অভিশপ্ত দিন। রুটিন মাফিক ওই দিনের গোলা ও মাইন উদ্ধারকারী দল তাদের কাজ শেষ করে ক্যাম্পে ফেরত এসেছে এবং ট্রাক থেকে গোলা ও মাইন নামিয়ে ডাম্পে সাজিয়ে রাখছে। ঠিক ওই সময়ই স্কুলে অবস্থানরত সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা বৈকালিক খেলাধুলা শেষ করে মাথা গুনটির জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। গোলা উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা যখন গাড়ি থেকে গোলা ও মাইন অপসারণে ব্যস্তা, তখন হঠাত্ করে অতর্কিতে কারও হাত থেকে পড়ল একটি অবিস্ফোরিত মাইনের গোলা। অমনি মাটিতে জমায়েত গোলা ও মাইনগুলি একত্রে বিস্ফোরিত হয়। পুরা দিনাজপুর শহর প্রকম্পিত হয়; একটি বিশাল ধারায় কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠে যায়। গোলা নিষ্ক্রিয় কাজের জন্য তখন স্কুলের মাঠে ১৫০ থেকে ২০০ জন সৈনিক ও মুক্তিবাহিনীর সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফোরণের ফলে প্রায় সবাই নিহত অথবা আহত হন। অনেকের হাত ও পা ছিন্নভিন্ন হয়ে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়, যা পরবর্তী সময় উদ্ধার করা হয়। বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, যে ট্রাকে করে এসব গোলা ও মাইন নিয়ে আসা হয়েছিল সে ট্রাকটির কয়েকটি লোহার টুকরা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। দিনাজপুর শহরের বাড়ির কোনো জানালার কাচ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। মহারাজা স্কুলের খেলার মাঠে একটি পুকুরসমান গর্তের সৃষ্টি হয়। ১০ ইঞ্চি পুরু স্কুল বিল্ডিংটিতে বিভিন্ন জায়গায় চিড় ধরে যায়।

পরবর্তী সময় বেসামরিক প্রশাসন ও স্থানীয় লোকদের সহায়তায় এই শহীদদের দেহাবশেষ উদ্ধার করে জানাজার মাধ্যমে চেহেল গাজীর মাজার-সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বিজয়ের এই মাসে সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই আন্তরিকভাবে সশ্রদ্ধ সালাম।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব) মাসুদুর  রহমান, বীর প্রতীক ও মুক্ত আসরের প্রধান উপদেষ্ঠা।

Comments

comments